ইসরায়েল - ফিলিস্তিন সংঘাতের ইতিহাস
১৯৪৪ সালের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল দেশটির কোন অস্তিত্বই ছিল না। ফিলিস্তিনের সাথে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দীর্ঘতম সংঘাতে জড়িয়ে আছে এই দখলদার দেশটি। কিন্তু কেন কীভাবে এ সংঘাতের সূত্রপাত তা আমরা অনেকেই জানি না। এটা জানতে হলে আমাদের কয়েক হাজার বছর পিছনে ফিরে দেখতে হবে।
দুই ধর্মের জাতির পিতা হিসাবে বিবেচিত হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর সাথে, প্রায় ৪,০০০ বছর পূর্ববর্তী অঞ্চলে ইহুদি ও মুসলিম উভয়েরই, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। হিব্রু বাইবেল এবং ইসলামী ধর্মীয় ইতিহাস মতে, নবী হযরত ইব্রাহিম (আ)-কে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দেন যে, পবিত্র ভূমি কেনান তার সন্তানাদিকে দেয়া হবে, যেটা বর্তমানের ইসরাইল-ফিলিস্তিন অঞ্চলকেই বোঝায়। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সালে রাজা তালুত ইসরাইলে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যা হযরত দাউদ (আঃ) ও তার পুত্র সুলাইমান (আঃ) পর্যন্ত অব্যহত ছিল। সুলাইমান (আঃ) এ রাজ্যকে প্রসারিত করেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন টেম্পল অব সলোমন বা বাইতুল মুকাদ্দাস। ঐতিহাসিকভাবে এই উত্তরাধীকার নির্বাচন সম্পর্কিত ঘটনাটি, ফিলিস্তিন ভূমিতে ইহুদীদের দাবির কারণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি প্রথম থেকেই ফিলিস্তিনিদের অধীনেই ছিল। এই অঞ্চলটিকে পার্সিয়ান, গ্রীক, রোমান, আরব, মিশরীয়, ফাতিমিড, সেলজুক, ক্রুসেডার, মামলুক এবং অটোমানরা প্যালেস্টাইন বা ফিলিস্তিন নামে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শাসন করে। এটি একই সাথে ইহুদি, মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৮৮০ এর দশকে ইহুদিরা ইউরোপে অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হলে, তারা অটোমান-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ফিলিস্তিনে শরনার্থীরূপে আসতে শুরু করে। যার ফলে ১৯১৪ সালের মধ্যে এই অঞ্চলে ইহুদি গোষ্ঠীর সংখ্যা ৭৫ হাজার এরও বেশি হয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে গ্রেট ব্রিটেন অটোমানদের কাছ থেকে ফিলিস্তিন এবং জর্ডানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ১৯২২ সালে লীগ অব নেশনস একটি ব্রিটিশ ঘোষণাপত্র অনুমোদন করে, যাতে ফিলিস্তিন নামক ভূখন্ডে একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী দ্বারা ৬মিলিয়ন ইহুদী নিহত হয় এবং সাথে বহু লোক বাসস্থানহারা হয়।
১৯৪৭ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে, জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভূখন্ডে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
ইসরায়েল এতে স্বাভাবিকভাবেই সম্মতি দেয় এবং দুটি দেশের মধ্যে সীমানা তৈরি করে ফেলে। তবে আরব বাসিন্দারা বুঝতে পারেন এটি অন্যায়ভাবে ইহুদি জনগণের পক্ষ নেওয়া হয়েছিল। যার ফলে আরব সমাজে অসন্তুষ্টি ছড়িয়ে পড়ে।
১৯৪৮ সালের ১৪ ই মে ডেভিড বেন-গুরিয়ন কে স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। আরবদেশগুলো নিয়ে গঠিত সংগঠন আরবলীগ, এই বিভক্তিকে কোনভাবেই মেনে নিতে পারে না। তাই তারা অবিলম্বে ইসরাইল আক্রমণ করে। শুরু হয় আরব ইসরাইল যুদ্ধ। যুদ্ধের ফলাফলস্বরূপ ফিলিস্তিন তার ভূখন্ডের বিশাল একটি অংশ হাড়িয়ে ফেলে। ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট অংশের মধ্যে গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ নেয় মিশর আর পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় জর্ডান। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের মূল পরিকল্পনাটি ধূলিসাৎ হয়ে যায়। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ইহুদীদের শক্তিমত্তার ভিত্তি তৈরী করে দেয়। ইহুদিরা ফিলিস্তিনিদের নিজ আবাসস্থল থেকে তাদেরকে উচ্ছেদ করা শুরু করে। যার ফলে ৭লক্ষ ২০হাজার ফিলিস্তিনি তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। এদের মধ্যে অনেকে গাজা উপত্যকায় এবং অনেকে পশ্চিম তীরে আশ্রয় নেয়। এ যুদ্ধ ছিল ইহুদীদের জন্য বিজয় আর আরবদের জন্য বিপর্যয়। রাষ্ট্র গঠনের পরেও ইহুদিরা এতে ক্ষান্ত হয় নি। অবৈধভাবে চলতে থাকে ফিলিস্তিনের অবশিষ্ট ভূমিটুকুও দখলের প্রক্রিয়া যা আজও অব্যহত রয়েছে।
এই অঞ্চলে ইহুদি এবং আরব মুসলমানদের মধ্যে উত্তেজনা চলতে থাকে কয়েক দশক পর্যন্ত। ইসরায়েল এবং প্রতিবেশি আরবদের মধ্যে থেমে থেমে লড়াই চলে পরবর্তী ৬০ বছর ধরে।
ফিলিস্তিনের ছোট ছোট গোষ্ঠীগুলোকে একত্রীকরণের লক্ষ্যে ১৯৬৪ সালে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অরগানাইজেশন নামে একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল বাহিনী- মিশর, সিরিয়া এবং জর্ডানের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং ফিলিস্তিনের আরো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। ১৯৮৭ সালে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে চারটি ফিলিস্তিনি শরণার্থী মারা যাওয়ার ঘটনার পরে, ফিলিস্তিনিরা একটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেয় যা প্রথম ইন্তিফাদা বা প্রথম গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। ইন্তিফাদার সময় ফিলিস্তিনিরা ছিল কার্যত নিরস্ত্র। ফিলিস্তিনি তরুণ এবং কিশোররা পাথর ছুড়ে ইসরায়েলি সশস্ত্র বাহিনীর মোকাবেলা করে। প্রথম ইন্তিফাদার পরে ইসরায়েল এবং পিএলও শান্তির জন্য একটি সময়সূচি তৈরি করে যা অসলো অ্যাকর্ড নামে পরিচিত।
জেরুজালেমের মর্যাদা, শরণার্থীদের অধিকার এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধভাবে ইহুদি জনবসতি বৃদ্ধির মতো ইস্যুতে সমঝোতা হতে না পারলে, ২০০০ সালে আরও একটি শান্তি আলোচনা করা হয় এবং তাও ব্যর্থ হয়।
সেই বছর ইসরায়েলের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী এ্যারিয়েল শ্যারন হাজার খানেক সৈন্যবাহিনী নিয়ে জেরুসালেম এর পুরাতন শহর এবং মসজিদ আল আকসা ভ্রমণ করতে আসলে শুরু হয় ২য় ইন্তিফাদা। তার এই ভ্রমণ ফিলিস্তিনিদের চোখে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ মসজিদের উপর ইসরাইলি দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসাবে প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয় ইন্তিফাদা প্রায় পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং এসময়ে তিন হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়। ২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজা থেকে সরে আসার পরে ইন্তিফাদার অবসান ঘটে।
২০০৬ সালে, ফিলিস্তিনির সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী দল হামাস আইনসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে। হামাস ও ইসরাইলের মধ্যকার সংঘাত এখনো চলছে। ২০১৭ সালে, হামাস ১৯৬৭ সালের নির্ধারণ করা সীমান্তের ভিত্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানায়। কিন্তু ইসরাইল ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সকল প্রস্তাবই বাতিল করে দেয়।
ফিলিস্তিনবাসীরা, আজও তার নিজ ভূমির জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আর ইসরায়েলিরা পশ্চিম তীরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন ও তার ভূমি দখল অব্যাহত রেখে, এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। ইসরায়েলিদের দাবি, সেই প্রাচীনকালেই তারা এখানে ছিল, মাঝে অন্যত্র চলে গেলেও এ জায়গার আসল অধিকার তাদেরই। কিন্তু তাদের ধর্মগ্রন্থ হিব্রু বাইবেল এর মতেই, ফিলিস্তিনিরা ইহুদীরা আসবার আগে থেকেই এ অঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দা ছিল। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ ফিলিস্তিনদের এ দাবীর পক্ষে সমর্থন দিলেও, মার্কিন মিত্র হওয়ায় ইজরায়েলের ক্ষমতা যে সুবিশাল, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। ফিলিস্তিনিদের উপর অবিরাম চলতে থাকা হামলাগুলো বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়ে যায়। তবুও অদূর ভবিষ্যতে এ সংঘাত মিটিয়ে, শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো আশা দেখছি না। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধান পাওয়া সম্ভব হয় নি, তবুও এই অঞ্চলটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ স্থান হিসেবেই রয়ে গেছে।