ভ্যাক্সিন কিভাবে কাজ করে?
![]() |
১৭৯৬ সালে, বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড জেনার কাউপক্স ভাইরাসের কিছু উপাদান নিয়ে একটি আট বছরের বাচ্চার শরীরে তা ইনজেক্ট করেছিলেন যেটি কিনা স্মলপক্স ভাইরাস সম্পর্কিত সকল মারাত্মক ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে তাকে সুরক্ষা প্রদান করতে পারবে। অবিশ্বাস্যভাবে এটা সফল হয়েছিল। ইঞ্জেকশনের পর বাচ্চাটির শরীর ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করতে পেরেছিল। যার ফলে জেনারের ইঞ্জেকশনটি পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভ্যাক্সিন বা টিকা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
কিন্তু এটা কিভাবে কাজ করেছিল?
ভ্যাক্সিন কিভাবে কাজ করে তা বোঝার জন্য, প্রথমে জানতে হবে, আমাদের শরীর কিভাবে সংক্রামক রোগগুলো থেকে আমাদেরকে রক্ষা করে।
যদি কোন অপরিচিত ভাইরাস বা জীবানু আমাদের আক্রমণ করে, তখন আমাদের শরীর এগুলোকে শনাক্ত করে এবং দেহ থেকে বাইরে বের করার জন্য আপ্রান চেষ্টা চালায়।
আমরা কখন ও কিভাবে বুঝবো যে, আমাদের শরীর কোন ভাইরাস বা জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে?
এক্ষেত্রে সাধারণ লক্ষনগুলোর মধ্যে হাচি, কাশি, প্রদাহ এবং জ্বর উল্লেখযোগ্য। এ লক্ষনগুলির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, ভাইরাস এবং ব্যাকটেরিয়াগুলো আমাদের শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
আমাদের শরীর এই সহজাত প্রতিরক্ষা প্রক্রিয়া ছাড়াও ২য় ধাপের প্রতিরক্ষা তৈরী করে যাকে Adaptive Immunity বলা হয়।
আমাদের শরীর B কোষ এবং T কোষ নামে বিশেষ কোষগুলোকে আগত জীবানুগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিযুক্ত করে। এবং সেই আক্রমনকারী জীবানুদের চেহারা কেমন, কে বেশি শক্তিশালী, কিভাবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা যায় পুরো বিষয়টা এই কোষগুলো আয়ত্ত করে এবং মনে রাখে। সেই সাথে জেনে নেয় এই জীবানুগুলো আবার কিভাবে শরীরে পুণরায় আক্রমণ চালাতে পারে।
আমাদের শরীরের এই অসাধারণ প্রতিক্রিয়া প্রক্রিয়া থাকা সত্তেও, রোগজীবাণু গুলোর বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করতে হবে এবং কিভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে সেটা শিখতে আমাদের ইমিউনো সিস্টেম অনেক সময় নিয়ে নেয়। যখন কোন ব্যক্তির শরীর খুব দূর্বল হয় কিংবা বাচ্চা বা বৃদ্ধদের শরীরে যখন ভাইরাসগুলো আক্রমন করে তখন তাদের শরীর এদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী থাকে না। এক্ষেত্রে ভাইরাসগুলো যদি খুবই পাওয়ারফুল হয় তাহলে তাদেরকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু কেমন হয় যদি আমরা অসুস্থ হওয়ার আগেই এসব শক্তিশালী ভাইরাস ও জীবানুগুলোকে আমাদের শরীর চিনতে পারে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারে?
আর ঠিক এ কাজটিই করে থাকে ভ্যাক্সিন। আমাদের ইমিউনো সিস্টেম আমাদেরকে যে পদ্ধতিতে রক্ষা করে, বিজ্ঞানীরা ঠিক একই পদ্ধতিতে শরীরের ভেতর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করার জন্য ভ্যাকসিনের প্রয়োগ করেন এবং সেটা আমরা রোগাক্রান্ত হওয়ার আগেই।
এ পর্যন্ত আমরা অনেক রোগেরই ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি। এই ভ্যাকসিন গুলো একেক সংক্রমনের জন্য একেকটি আলাদাভাবে কাজ করে থাকে।
আমাদের কাছে আছে “লাইভ অ্যাটেনিউটেড ভ্যাকসিন”। প্যাথোজেন থেকে নিজে নিজে তৈরি হওয়া এই ভ্যাক্সিনগুলো দূর্বল ও নিস্তেজ হয়ে থাকে।
আরো আছে, ইনএক্টিভ ভ্যাকসিন। যেটি দ্বারা রোগজীবানুকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে।
এই উভয় ধরণের ভ্যাকসিনগুলো নিশ্চিত করে যে রোগজীবাণুগুলো যাতে সম্পূর্ণ প্রস্ফুটিত হতে না পারে এবং তা যাতে বংশবিস্তার লাভ করতে না পারে। তবে প্রথমদিকে একে, রোগজীবাণু গুলোকে শনাক্ত করে এদের বিরুদ্ধে কিভাবে লড়াই করতে হবে এবং কিভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরী করতে হবে সেটার প্রস্তুতিপর্ব বলা চলে।
তবে দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে, লাইভ অ্যাটেনিউটেড ভ্যাকসিন তৈরি করা কঠিন একটি কাজ। তারমধ্যে দূর্বল রোগপ্রতিরোধক্ষমতা সম্পন্ন মানুষদের শরীরে এটিকে প্রয়োগ করা বিপদজনক হতে পারে। আবার এদিকে “ইনএক্টিভ ভ্যাকসিন” গুলো দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পারে না।
আরেক ধরনের ভ্যাক্সিন আছে যেগুলোকে “সাব-ইউনিট” ভ্যাক্সিন বলা হয়। এটি জীবানু থেকে এন্টিজেন নামক একটি অংশ নিয়ে তৈরী করা হয়। জীবানুতে থাকা এন্টিজেন নামক এই অংশটি আসলে শরীরে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরী করে।
আপনি জানেন কিনা জানি না, একটি ভাইরাস বা জীবানুর দুটি অংশ থাকে। একটি অংশ রোগ সৃষ্টি করে। অন্যটি দেহের অভ্যন্তরে ঐ একই রোগের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য এন্টিবডি তৈরী করে।
ভ্যাক্সিন তৈরীর সময় বিজ্ঞানীরা জীবানুর রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতাটিকে নষ্ট করে দেন আর অন্য বৈশিষ্ট্যটি ঠিক রাখেন। সহজ কথায়, রোগ সৃষ্টির ক্ষমতাহীন জীবাণুকেই ভ্যাক্সিন হিসেবে দেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলশ্রুতিতে এই জীবাণুগুলো দেহে রোগের কারণ হয় না, উল্টো রোগটি যেন না হয় তার জন্য এন্টিবডি তৈরী করতে থাকে। একইসাথে, এই জীবাণুগুলো “মেমরি সেল” গঠন করে যাতে পরবর্তীতে একই জীবাণু পুনরায় শরীরে প্রবেশ করলে সহজে সনাক্ত করতে পারে। এভাবেই ভ্যাক্সিন আমাদের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।
ভ্যক্সিন তৈরীর জন্য সবসময় জীবানু থেকে এন্টিজেন হিসেবে একটি নির্দিষ্ট জিনগত উপাদানকেই নেওয়া হয় এবং বাকি সকল উপাদানকে বাদ দেওয়া হয়। যার ফলে রোগীর দেহে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার কোন উপায় নেই, কিছু ক্ষেত্রে সাধারন কিছু উপসর্গ ছাড়া।
বিজ্ঞানীরা প্রতিদিনই নতুন নতুন ভাইরাসের এন্টিবডি সৃষ্টির লক্ষে ভ্যাক্সিন আবিষ্কারের চেষ্টায় আছেন। যদি তাদের এই মিশন সফল হয়, তাহলে আমরা ভবিষ্যতে সকল সংক্রামক রোগের জন্য আরও কার্যকরী চিকিত্সা পেতে চলেছি। আর এভাবে ভ্যাক্সিনের উন্নতি হতে থাকলে HIV, ম্যালেরিয়া, ইবোলা বা কভিড-19 জাতীয় রোগ পৃথিবী একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
