পর্ব-৯ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৯ ডিসেম্বর ১৯৭১)
![]() |
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার।মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী দেশের অধিকাংশ স্থানে বিজয়ের নিশান উড়িয়ে ঢাকা দখলের জন্য উদগ্রীব। রণাঙ্গনে তখন চারদিক থেকে অবরুদ্ধ অবস্থায় পাকবাহিনী। এদিন আন্তর্জাতিক রাজনীতিও ছিল প্রচন্ড উত্তপ্ত, আশংকা দেখা দেয় আরেকটি মহাযুদ্ধের।
একদিন আগেই বেতারে এবং বিমান থেকে প্রচুর লিফলেট ছড়িয়ে পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য আহ্বান করে মিত্রবাহিনী। যৌথবাহিনী দ্রুত ঢাকায় পৌঁছার জন্য চতুর্দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে। এদিন ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষনা দেন, যৌথবাহিনী এখন বড় ধরনের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন-পাকবাহিনী যদি মাটি কামড়ে পড়ে থেকে ঢাকায় লড়াই চালাতে চায় তখন আপনি কী করবেন? এ প্রশ্নের উত্তরে জেনারেল অরোরা জবাব দেন, ওরা কি করবে জানি না তবে আমরা বড় ধরনের যেকোন লড়াইয়ে নামার জন্যই প্রস্তুত। সাংবাদিকরা পুনরায় প্রশ্ন করলেন- ঢাকা শত্রুমুক্ত করার পথে আপনার সামনে সবচেয়ে বড় বাধা কোনটি? অরোরা জানালেন-যদিও বড় বাধা হচ্ছে নদী, তবে আমরা সে বাধা অতিক্রম করার সকল ব্যবস্থা করে ফেলেছি। আমাদের রসদ এবং পদাতিক সৈন্য পারাপারের ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে। আর ভারতের বিশেষ ধরনের পিটি-৬৭ জলচর ট্যাঙ্কগুলো নদী পেরিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে।
যৌথবাহিনী দ্রুত ঢাকাতে পৌঁছাবার জন্য নিয়ে চতুর্দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পূর্ব দিক থেকে একটি বাহিনী আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি ও চাঁদপুর হয়ে এগিয়ে আসছে। পশ্চিম দিক থেকে মধুমতি নদীর তীরে এসে পৌঁছেছে অপর একটি বাহিনী । অন্য একটি বাহিনী কুষ্টিয়া মুক্ত করে অগ্রসর হচ্ছে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। ময়মনসিংহের কাছাকাছি এসে পৌঁছে গেছে হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা একটি বাহিনী। এছাড়া বসে নেই বিমানবাহিনী ও। টাঙ্গাইলের নিকটে ৮০ টন সামরিক সরঞ্জাম সহ ৭শত ছত্রীসেনা সফল ভাবে অবতরন করেছে। কাজেই বাংলাদেশের বিজয় অর্জন এখন সময়ের ব্যাপার।
যৌথবাহিনী দ্রুত ঢাকাতে পৌঁছাবার জন্য নিয়ে চতুর্দিক থেকে অগ্রসর হচ্ছে। তিনি আরও জানান, পূর্ব দিক থেকে একটি বাহিনী আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি ও চাঁদপুর হয়ে এগিয়ে আসছে। পশ্চিম দিক থেকে মধুমতি নদীর তীরে এসে পৌঁছেছে অপর একটি বাহিনী । অন্য একটি বাহিনী কুষ্টিয়া মুক্ত করে অগ্রসর হচ্ছে গোয়ালন্দ ঘাটের দিকে। ময়মনসিংহের কাছাকাছি এসে পৌঁছে গেছে হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা একটি বাহিনী। এছাড়া বসে নেই বিমানবাহিনী ও। টাঙ্গাইলের নিকটে ৮০ টন সামরিক সরঞ্জাম সহ ৭শত ছত্রীসেনা সফল ভাবে অবতরন করেছে। কাজেই বাংলাদেশের বিজয় অর্জন এখন সময়ের ব্যাপার।
পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও যুদ্ধের অবস্থা সম্পর্কে সব খবরই রাখতেন। পরাজয় সুনিশ্চিত জেনেও তারা বন্ধুরাষ্ট্র আমেরিকার সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চালিয়ে যায় আমাদের স্বাধীনতা ঠেকানোর জন্য। এছাড়া তারা ঘৃন্য এক গোপন যড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় যার মূল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালী জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করা এবং দেশকে মেধাশূন্য করে দেয়া।
রাজশাহীতে হানাদার বাহিনী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে অতর্কিতে অনুপ্রবেশ করে শওকত রেজা ও তার চার সঙ্গীকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে যায়। ৩/৪ দিন তাদের বন্দী করে রাখা হয় একটি অন্ধকার কক্ষে। পরে রেজার সহপাঠী সাহাবউদ্দিন আহমদ গোপনে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শামসুজ্জোহা হলকে প্রায় ৯ মাস ধরেই সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট হিসাবে ব্যবহার করে আসছিল হানাদার সৈন্যরা। হলের পেছনে ১ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে তারা তৈরি করে বধ্যভূমি যেখানে নির্বিচারে হত্যা করা হয় হাজার হাজার নারী-পুরুষকে।
এদিন চীনের অস্থায়ী পররাষ্ট্রমন্ত্রী চি পেং ফি একটি ভাষণে বলেন- ভারত পাকিস্তানের ওপর পূর্ণাঙ্গ আক্রমণ শুরু করেছে। এমনকি তথাকথিত বাংলাদেশকে স্বীকৃতিও দিয়েছে ভারত। এদিন জাতিসংঘ অধিবেশনে পাকিস্তানী প্রতিনিধি দলের নেতা মাহমুদ আলী দেশে ফেরেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকার সমালোচনা করে বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের উচিত বিশ্ব শান্তির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া এবং ভারতের পাশ থেকে সরে দাঁড়ানো। চীন ও আমেরিকার সমর্থনের জন্য তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, পাকিস্তান তাদের নির্ভীক এবং ঐতিহাসিক সমর্থনের জন্য অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভা এবং আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের এক যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভুটান ও ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার পর এটিই ছিল উপদেষ্টা পরিষদের প্রথম বৈঠক। বৈঠকে স্বাধীন অঞ্চল গুলিতে বেসামরিক প্রশাসনের কার্যক্রম শুরু এবং খাদ্য, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়।
এদিন বিকালে জামালপুরের হানাদার ঘাঁটির ওপর টানা এক ঘণ্টা ধরে প্রায় কয়েক হাজার পাউন্ড বোমা নিক্ষেপ করে ভারতীয় বিমানবাহিনী। এই ভয়াবহ আক্রমণে পালাতে শুরু করে পাকসেনারা। এসময় পলায়নরত অবস্থায় যৌথ বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ৬শত হানাদার সেনা। তৎকালীন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ এদিন বাংলাদেশে অবস্থানরত পাকিস্তানী সৈন্যদের হুশিয়ারী দিয়ে বলেন, ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। বাঁচতে চাইলে যৌথবাহিনীর কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ কর, নতুবা সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হবে।
জেনারেল নিয়াজী গুরুতর পরিস্থিতি অবলোকন করে সরকারের কাছে আবেদন জানান যেন চীন অবিলম্বে ভারত আক্রমণ করে, নতুবা পরাজয় ঠেকানোর আর কোন উপায় নাই। হানাদার বাহিনীর মনোবল এদিন একেবারেই ভেঙ্গে পড়ে। তারা আত্মসমর্পণের পথ খুঁজতে থাকে। পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিন রেডিও পাকিস্তান থেকে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেন ঐক্যবদ্ধভাবে ‘ভারতীয় হামলা’ মোকাবেলা ও ‘দুরভিসন্ধি’ নস্যাত করতপ হবে। তিনি ভারতীয় বাহিনীর সমালোচনা করে বলেন, তাদের নগ্ন হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
পাকিস্তানের সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের ঘৃন্য প্রচেষ্টা থেমে থাকেনি এদিনও। সিআইএ মারফত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিশ্চিত হন যে চীন বাংলাদেশ প্রশ্নে ভারতের ওপর আক্রমণ করবে না। আমেরিকা এসময় পাকিস্তানের প্রতি সামরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ এ আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিক্সন অপেক্ষমাণ মার্কিন সপ্তম নৌ-বহরকে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে রওনা করার জন্য নির্দেশ দেন। আসন্ন ভারতীয় হামলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানকে রক্ষা করার জন্য সপ্তম নৌবহরকে করাচীর নিকটে আরব সাগরে না পাঠিয়ে প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার পূর্ব দিকে বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়। এ নির্দেশের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই প্রশান্ত মহাসাগরীয় সপ্তম নৌবহরের এখতিয়ার বঙ্গোপসাগর অবধি বাড়ানো হয় যেন ভারত শত্রুবেষ্টিত হয়ে পড়ে এবং পাকসৈন্যরা নিরাপদে বেরিয়ে আসতে পারে।
বাংলাদেশের মাটিতে বিধ্বস্ত পাকিস্তানী বাহিনীর যখন আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছুই করার নেই, ঠিক তখনই মার্কিন সপ্তম নৌ-বহর বঙ্গোপসাগরের দিকে আসতে থাকে । এই খবর পাওয়া মাত্র মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। আগ্নেয়াস্ত্র শূন্যে তুলে একের পর এক গুলি চালিয়ে তারা ক্রোধের বহিপ্রকাশ ঘটায়। এই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গেও, স্লোগান উঠতে থাকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে। এসময় কুড়িটি রুশ রণতরীও যাত্রা করে বঙ্গোপসাগরের পথে। পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাপারে ইন্দিরা গান্ধীর যুক্তি, দৃঢ়তা ও বিস্ময়কর আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ফলে বিশ্ব জনমত ততদিনে বাংলাদেশের পক্ষে চলে এসেছে। ফলে ব্যার্থতায় পর্যবাসিত হয় আমেরিকার শেষ কৌশলও। আমেরিকান নৌ-বহরের মূল উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর সর্বাত্মক পতন রোধ করা এবং পাকসেনাদের এই বিপদ থেকে উদ্ধার করা।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধারা বেলা ১১টায় শহরের চারদিক ঘিরে ফেললে পৌর এলাকায় কুন্ডুপাড়ায় ক্যাম্পের আল-বদর কমান্ডার ফিরোজ বাহিনীর সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ হয়। এ সংবাদে জেলা শহরে অবস্থানরত পাক সেনারা দ্রুত এসে শহর ঘিরে গণহত্যা শুরু করে। মুক্তিযোদ্ধারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে শহর ঘিরে রাজাকার পাক-হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে হামলা করলে তারা পালিয়ে যায়। এদিকে, কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার খবরে দাউদকান্দি এবং চান্দিনার মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিগুণ উৎসাহে পাকসেনাদের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গত রাতে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর এবং দক্ষিণ পাশ থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয়া পাক সেনাদের ওপর হামলা চালালে তারা পাল্টা জবাব দিতে দিতে পশ্চিম দিকে হাঁটতে থাকে এবং ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের এই দিনে যে জায়গাগুলো শত্রুমুক্ত হয়, তাদের অন্যতম হলো দাউদকান্দি, গাইবান্ধা, কপিলমুনি, ত্রিশাল, নকলা, ঈশ্বরগঞ্জ, নেত্রকোনা, পাইকগাছা, শ্রীপুর, অভয়নগর, পূর্বধলা, চট্টগ্রামের নাজিরহাটসহ বিভিন্ন এলাকা। ভারতের হাফলং এর বিএসএফ ট্রেনিং সেন্টার হতে ট্রেনিংপ্রাপ্তদের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল গ্রুপ কমান্ডার নাজিম উদ্দিনের নেতৃত্বে ৯ ডিসেম্বর কাউখালী উপজেলার বেতবুনিয়া ও বালুখালীতে গেরিলা অপারেশন পরিচালনা করে। এ যুদ্ধে গ্রুপ কমান্ডার নাজিম উদ্দিন এবং মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জাফর শহীদ হন। দাউদকান্দি শত্রুমুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত মেঘনার সম্পূর্ণ পূর্বাঞ্চল মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। এর আগে কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে দাউদকান্দির মুক্তিযোদ্ধারা দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিবাহিনীর হামলায় টিকতে না পেরে পাক হানাদার বাহিনী ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়।
