রহস্যে ঘেরা অ্যাজটেক সভ্যতার ইতিহাস

প্রায় ৮০০ বছর আগে মেক্সিকো উপত্যকার উত্তরে অবস্থিত আজলান নামক স্থানের মেক্সিকো হ্রদ এলাকায় বসবাস শুরু করে অ্যাজটেক নামের এক জাতি। তারা মেক্সিকোর স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে একসাথে “তেনোচতিৎলান” নামের এক নগরী প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী ২০০ বছরে তাদের এ রাজ্য মেক্সিকো উপসাগর থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। চলুন  অ্যাজটেক  নামের সেই সভ্যতার সন্ধান করা যাক জিওটেল বাংলার আজকের পর্বে।

ম্যাক্সিকো অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই অ্যাজটেক জাতির নাম শোনা যেত। এরা প্রথমে বসতি গড়েছিল আজলান অঞ্চলে। জায়গাটি ছিল মেক্সিকোর উত্তরে বা উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে। 

অ্যাজটেকরা প্রথম দিকে ছিল যাযাবর। বারো শতকের দিকে তারা নতুন বসতির সন্ধানে বেড়িয়ে পড়ে এবং তেরো শতকের শুরুতে বসতি স্থাপন করে মধ্য মেক্সিকো উপত্যকায়। কিন্তু সেখানে তারা খুব শান্তিতে থাকতে পারেনি। স্থানীয় ছোট ছোট গোত্রের সাথে তাদের সংঘাত বেধে যায় এবং ফলাফলস্বরূপ অ্যাজটেকরা বিতারিত হয়। 

১৩৪৫ সালে তারা নতুন করে বসতি স্থাপন করে লেক টেক্সকোকো’র এক ছোট দ্বীপে। এখানে ক্রমান্বয়ে তারা এক নগর গড়ে তোলে যার নাম ছিল “তেনোচতিৎলান”। সেখানে অ্যাজটেকরা স্থানীয় টোলটেকদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে। এই দুই জাতীর সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে উঠে এক উন্নত সভ্যতা। ১৩৭৬ সালে অ্যাজটেক সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক ছিলেন অ্যাকামাপিখটলি। ১৪০৯ সালে সে সভ্যতার অভিজাতগন নতুন শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসান অ্যাকামাপিখটলির পুত্রকে। তবে দুর্ভাগ্যবশত এ বংশের তৃতীয় এই শাসক প্রতিবেশী শহরের বাসিন্দাদের হাতে নিহত হন। তবে তেনোচতিৎলান এর অধিবাসীরা তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। 

১৪২৮ সালে নতুন শাসক হিসেবে সিংহাসনে বসেন “ইটজকোটল”। তার নেতৃত্বে সাম্রাজ্যের দ্রুত বিস্তার ঘটতে থাকে। তিনি তিনটি বড় শহর নিয়ে অ্যাজটেক রাজ্যকে সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।  এ তিনটি শহর হচ্ছে - তেনোচতিৎলান (পরবর্তীকালে যেটি মেক্সিকো নামকরণ হয়),  টেক্সকোকো এবং টিলাকোপান।  ইটজকোটল এর মৃত্যুর পর তার পুত্র প্রথম মক্টেজুমা  সিংহাসনে বসেন।  তিনি মেক্সিকো উপসাগর থেকে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের সীমানা পর্যন্ত রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করেন।  পরবর্তীতে তার উত্তরাধিকারী শাসকেরা সাম্রাজ্যের সীমা আরো বিস্তৃত করেন। অনেক নগররাষ্ট্র এসময় অ্যাজটেকদের আনুগত্য স্বীকার করে।  অন্তত ৪৮৯টি নগররাষ্ট্র অ্যাজটেকদের কর দিতে বাধ্য হয়েছিল। 

অ্যাজটেকরা “কালপুলি” নামে সামাজিক গোষ্ঠী গঠন করেছিল । তাদের সমাজে ছেলেদেরকে শিক্ষা প্রদান করা হতো।  প্রত্যেক কাল পুলির আওতায় আলাদা আলাদা মন্দির , অস্ত্রাগার এবং শস্য গুদাম থাকতো। কালপুলিতে বসবাসরত প্রত্যেক পরিবারের প্রধান কে তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী জমি দেওয়া হতো।

অ্যাজটেক সমাজে তিন শ্রেণীর অস্তিত্ব ছিল। প্রথম শ্রেণীতে অবস্থান করতো রাজা, পুরোহিত এবং অভিজাতরা। বণিক ও অবস্থাসম্পন্ন কৃষকদের অবস্থান ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীতে।  আর সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করতো সাধারণ কৃষক ও ভূমি দাসরা। 

অ্যাজটেক সভ্যতার অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল কৃষি। তারা কোকো, রাবার, টমেটো, ভুট্টা ইত্যাদির চাষ করত। এ সভ্যতার বিনিময়ের জন্য কোন মুদ্রা ছিলনা। কোকো গাছের বীজ, সুতিবস্ত্র বা লবণ মুদ্রার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হতো। 

অ্যাজটেকরা ছিল বহু দেবতায় বিশ্বাসী। তাদের একেকজনের কাছে একেক দেবতা সম্মানিত হয়ে থাকে।  যেমন-  যোদ্ধাদের কাছে সম্মানিত ছিল যুদ্ধ দেবতা “হুইটজিলোপচতলি”। কৃষকদের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত বৃষ্টির দেবতা “টিললিক”। চিত্রকলা ও কারিগরি শিল্পের জন্য ছিল “কোয়েটজালকুয়েটল” নামের  দেবতা । তবে তাদের প্রধান দেবতা ছিল সূর্য দেবতা।  এসব দেবতাদের উদ্দেশ্যে তারা প্রায়ই নরবলি দিত।  তারা বিশ্বাস করতো যে পৃথিবীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য নরবলির প্রয়োজন।  বলা হয়ে থাকে ১৪৮৭ সালে তেনোচতিৎলান নগরে সূর্য দেবতার উদ্দেশ্যে নির্মিত মন্দিরের উদ্বোধন উপলক্ষে পুরোহিতরা ৮০হাজার যুদ্ধবন্দীকে দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দিয়েছিল। 

অ্যাজটেকরা ছিল যুদ্ধপ্রিয় জাতি। তাদের দক্ষ সৈন্যবাহিনী যুদ্ধের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতো।  তবুও তাদের বিশাল এই সাম্রাজ্জ্য খুব বেশীদিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।  ষোল শতকের  শুরুর দিকে আমেরিকাতে স্পেনের বিজয় অভিযান শুরু হয়।  ১৫১৯ সালের ৮ই নভেম্বর স্প্যানিশ সেনাপতি নেতা হার্নান কোর্তেজ এর আক্রমণে অ্যাজটেক সভ্যতার চূড়ান্ত পতন ঘটে। এভাবেই পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে হাড়িয়ে যায় অ্যাজটেক নামের উন্নত এই সভ্যতা।