গণবিলুপ্তিঃ পৃথিবীর ৯৯% জীব-প্রজাতি বিলুপ্তির ইতিহাস
সাড়ে ৩ বিলিয়নেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে বহু জীব বৈচিত্রের আগমন ঘটেছে। সময়ের সাথে সাথে সেগুলো বিকশিত, বিবর্তিত ও বহুগুনে বৈচিত্রময় হয়েছে এবং ধীরে ধীরে সে সবের বিলুপ্তিও ঘটেছে। বর্তমান সময়ে আমরা পৃথিবীতে যত ধরনের প্রাণী দেখতে পাই, তারা এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া মোট প্রাণীদের কেবল মাত্র ১%। কারণ এখন পর্যন্ত, পৃথিবীতে যত প্রাণীর বিচরণ হয়েছে তার ৯৯ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই বিলুপ্তির প্রায় পুরোটাই হয়েছে বিভিন্ন গণবিলুপ্তির সময়ে। এছাড়াও, প্রতি ১ লক্ষ বছরে কেবল হাতেগোনা কিছু প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটে থাকে। কোনো প্রাণী পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলতে বোঝায়, ঐ প্রজাতির শেষ প্রাণীটিও মৃত্যুবরণ করেছে। আর যখন কোনো কারণে প্রকৃতিতে বড় আকারে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে, তখন তাকে গণ বিলুপ্তি বলা হয়।
পৃথিবীর কোটি বছরের ইতিহাসে এই পরিবর্তনের ফলে যেসব প্রজাতি বিলুপ্ত হয় সেসবের মধ্যে ডাইনোসরও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার কথা আমরা সবাই জানি। প্রায় ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই পৃথিবীতে অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেছিল, এবং এটি আমরা জীবাশ্ম রেকর্ডের মাধ্যমে দেখতে পাই। প্রাচীন শিলাস্তরে জীবাশ্মের অস্তিত্বই এই অস্বাভাবিক ঘটনার সাক্ষী। আর সে সময়েই বড় বড় ডাইনোসরগুলোর মৃত্যু ঘটে এবং ধ্বংস হয়ে যায় পৃথিবীর প্রায় সকল জীব বৈচিত্র। এ তো গেল ৬৫ মিলিয়ন বছর আগের কথা। কিন্তু পৃথিবীতে এরকমই পাঁচটি গণবিলুপ্তির ঘটনার কথা জানতে পারা যায়। আর ৪৪০ মিলিয়ন বছর ধরে চলা এই ৫ গণবিলুপ্তির ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন “বিগ ফাইভ” নামে। চলুন তাহলে আজ জেনে নেয়া যাক পৃথিবীর সেই পাঁচ মহা বিলুপ্তি সম্পর্কে এবং খুঁজে বের করা যাক কেন ঘটেছিল এই গনবিলুপ্তির ঘটনাগুলো।
ওর্ডোভিসিয়ান বিলুপ্তিঃ
পৃথিবীতে প্রথম গণবিলুপ্তির ঘটনাটি ঘটে ৪৪০ মিলিয়ন বছর আগে। এই গণবিলুপ্তির সময়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা প্রাণীর ৮৫ শতাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের সঞ্চার ঘটেছিল ওর্ডোভিসিয়ান যুগেরও ৩০০ কোটি বছর আগে। অর্থাৎ সে সময়ও পৃথিবীতে জীবজগত পুরোপুরিভাবে বিকাশ লাভ করতে পারেনি এবং সকল প্রাণী জগৎ তখন পুরোপুরি বিকশিত হবার পথে ছিল। কিন্তু হঠাত এক ভয়াবহ ‘কন্টিনেন্টাল ড্রিফট’ সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। জলবায়ুর এ রাতারাতি পরিবর্তন সকল প্রাণীকুলের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এই গণবিলুপ্তির ঘটেছিল দুটি ধাপে। প্রথমত, পৃথিবীতে শুরু হয় এক দীর্ঘ আইস এইজ বা বরফ যুগের- যখন পৃথিবীর সমগ্র আবহাওয়া অধিক শীতল হয়ে যায়। জলের অধিকাংশই বরফে পরিণত হয়ে যাওয়ায় পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এসময় সামুদ্রিক প্রজাতি সহ স্থলভাগের সকল প্রাণীর মৃত্যু হয়। এবং সকল বরফ গলে সমুদ্রের পানিতে মিশে পানির অক্সিজেনের মাত্রা অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে এবং তার ফলে সমুদ্রের প্রাণীকুলের অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে যায়।
ডেভোনিয়ান গণবিলুপ্তিঃ
ওর্ডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তি যে যুগে সংঘটিত হয়েছিল সেটির নাম ছিল পালেওজয়িক যুগ এবং ওর্ডোভিসিয়ান গণবিলুপ্তিই পালেওজয়িক যুগের শেষ জীব বিপর্যয় ছিল না। এই যুগে আরও দুটি বিপর্যয় সংঘটিত হয়েছিল। এর একটি ঘটেছিল এই ডেভোনিয়ান পর্যায়ে। আনুমানিক ৩৭৫ মিলিয়ন বছর আগে ঘটেছিল ডেভোনিয়ান গণবিলুপ্তির ঘটনা যা প্রথম বিলুপ্তির সময় থেকে ৬৫ মিলিয়ন বছর পরের সময এবং এই মহা বিলুপ্তির কারণে পৃথিবী থেকে ৮০% জলজ এবং স্থলজ প্রাণী ধ্বংস হয়ে যায়। প্রথম বিলুপ্তির মতই এই গণবিলুপ্তি টি দুটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে হঠাৎ করেই সমুদ্রের পরিবেশ সামুদ্রিক উদ্ভিদ এর জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই সকল উদ্ভিদ স্থল ভাগে অভিযোজিত হতে থাকে। অতিমাত্রায় স্থলভাগের অভিযোজন এর ফলে পৃথিবীতে উদ্ভিদের সংখ্যা বেড়ে যেতে থাকে এবং কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ কমে যেতে থাকে। আর এদিকে সমুদ্র থেকে উদ্ভিদ সমূহ অভিযোজিত হওয়ার ফলে সমুদ্রে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যেতে থাকে এবং অক্সিজেনের অভাবে অধিকাংশ সামুদ্রিক প্রাণী মারা যেতে থাকে। যার ফলে আবহাওয়া চরমভাবাপন্ন হয়ে ওঠে, পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যায় এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অধিকাংশ স্থল এবং জলজপ্রাণী সমূহ। কিন্তু এই পর্যায়ের দ্বিতীয় গণবিলুপ্তির কারণ আজও জানা সম্ভব হয়নি।
তবে অনেকে মনে করে থাকেন আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত কিংবা উল্কাপাতের জন্যই এই বিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল।
পারমিয়ান গণবিলুপ্তিঃ
পালেয়জয়িক যুগে ইতিমধ্যে দুটি গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এবং তৃতীয় গণবিলুপ্তির ঘটনাটি ঘটেছিল এই পালেওজইয়িক যুগেই। আজ থেকে ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে এ যুগের শেষ পর্যায়ে এসে আরেকটি মহা বিলুপ্তির সম্মুখীন হয় পৃথিবী যাকে বলা হয়ে থাকে পার্মিয়ান গণবিলুপ্তি। আর এই গণবিলুপ্তি পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মহা বিলুপ্তির ঘটনা। পার্মিয়ান গণবিলুপ্তি তে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পৃথিবীর সেসময়ে বেঁচে থাকা ৯৬ শতাংশ প্রাণী। তবে কি ছিল এই বৃহৎ সংখ্যক প্রাণীর মৃত্যুর কারণ বিজ্ঞানীরা আজও খুঁজে বের করতে পারেননি। তবে খুব সম্ভবত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত এবং বড় উল্কাপাত এতসংখ্যক প্রাণের মৃত্যুর প্রধান কারণ হতে পারে।
ট্রায়াসিক-জুরাসিক গণবিলুপ্তিঃ
তিনটি গণবিলুপ্তির ঘটনা দিয়ে শেষ হয় পালেয়জয়িক যুগের এবং এর পরেই আগমন ঘটে মেসোজোয়িক যুগ এর। ২০০ মিলিয়ন বছর আগে মেসোজয়িক যুগের ট্রায়াসিক পর্যায়ে ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটে। ট্রায়াসিক যুগে মূলত ছোট ছোট অনেকগুলো গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল এবং ইতিহাসের অন্যান্য গণবিলুপ্তির তুলনায় দীর্ঘস্থায়ী এবং কম ক্ষতি সাধন করেছিল। এ পর্যায়ের ১৮ মিলিয়ন বছর পর্যন্ত ট্রায়াসিক গণবিলুপ্তি ঘটতে থাকে। যদিও ট্রায়াসিক পর্যায়ে প্রচুর পরিমানের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটে কিন্তু অন্যান্য গণবিলুপ্তির তুলনায় এটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে ছোট গণবিলুপ্তির ঘটনা। এই গণবিলুপ্তির ফলে পৃথিবীর প্রাণীজগতের প্রায় ৫০ ভাগ প্রজাতি মারা গিয়েছিল। ধারণা করা হয় ব্যাপক পরিমাণে অগ্ন্যুৎপাতের কারণে বাতাসে মিথেনের পরিমাণ বেড়ে যায় এবং এঁর ফলে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটে। যার কারনে পানির পিএইচ লেভেল স্বাভাবিকের চেয়ে কোথাও বেড়ে যায় এবং কোথাও কমে যায়। তাই পরিস্থিতির এরকম প্রতিকূলতার কারণে বিরাট সংখ্যক প্রাণের অস্তিত্ব লোপ পায় এই গণবিলুপ্তির সময়ে।
ক্রিটেসিয়াস-টারশিয়ারি গণবিলুপ্তিঃ
এটি পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বশেষ গণবিলুপ্তি এবং খুব কাছের সময়ে ঘটা গণবিলুপ্তির ঘটনা। এটি ঘটেছিল আজ থেকে মাত্র ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বে। চতুর্থ বিলুপ্তির পর দীর্ঘ সময় বিরতিতে এই গণবিলুপ্তি সংঘটিত হয় এবং বিজ্ঞানীদের কাছে সর্বাধিক প্রমাণ সম্বলিত গনবিলুপ্তির ঘটনা এটি। মেসোজয়িক যুগের শেষ অধ্যায় অর্থাৎ ক্রিটেসিয়াস পর্যায় এবং সেনোজয়িক যুগের প্রথম অধ্যায় তথা টারশিয়ারি পর্যায়ের মাঝে এই গণবিলুপ্তির ঘটনাটি ঘটে বলে একে ক্রিটেসিয়াস-টারশিয়ারি গণবিলুপ্তি বলা হয়। এবং এই গণবিলুপ্তিতেই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় আমাদের অতি পরিচিত নাম ডায়নাসোরসহ পৃথিবীর ৭৫ ভাগ প্রজাতি। এ গণবিলুপ্তির কারণ অন্যান্য গণবিলুপ্তির তুলনায় অনেকখানি স্পষ্ট এবং প্রচুর পরিমাণে জীবাশ্মের অস্তিত্ব পাওয়া এই ঘটনার সাক্ষী। এক প্রচণ্ড উল্কাপাত কিংবা গ্রহাণুর আঘাতেই এই মহা বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণের ফলে জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে পরিণত হওয়া বিশাল বিশাল উল্কা কিংবা গ্রহাণুগুলো একদিকে যেমন জলজ প্রাণীদের হত্যা করেছে অন্যদিকে স্থলভাগের প্রাণীগুলোকেও নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। বিস্ফোরণ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকা প্রাণীগুলোও রেহাই পায়নি গ্রহাণুগুলো থেকে। কারন বায়ুমণ্ডলের ট্রপোস্ফিয়ারে বিষাক্ত গ্যাসে ভরে যায় যার ফলে পৃথিবী থেকে অধিকাংশ প্রাণীকুলের মৃত্যু হয়।
এভাবেই পাঁচটি মহাবিলুপ্তির মাধ্যমে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় পৃথিবীর ৯৯% প্রাণী ও জীব বৈচিত্র। এখন শুধু অপেক্ষা ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির। কিন্তু এই ষষ্ঠ মহাবিলুপ্তির কারণ কোনভাবে আমরা নই তো? জানা যাবে পরবর্তী আলোচনায়।
