প্রাগৈতিহাসিক ম্যামথঃ এদেরকে কি আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

Ice Age সিনেমাটি যদি আপনি দেখে থাকেন তাহলে Manny নামের চরিত্রটির সাথে আপনি নিশ্চয়ই পরিচিত হয়ে থাকবেন। বিশালদেহী বড় বড় দাঁতওয়ালা হাতি দেখে নিশ্চয়ই আপনি একটুখানি অবাক হয়েছিলেন অথবা  ভেবেছেন হয়তো এনিমেশনের খাতিরেই হাতিটির এমন আকৃতি দেয়া হয়েছে। কিন্তু না, হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীতে এরকমই একটি  প্রাণীর রাজত্ব ছিল যে কিনা দেখতে আজকের দিনের হাতিদের মতোই ছিল। বলছিলাম প্রস্তর যুগের হারিয়ে যাওয়া দানবীয় প্রাণী ম্যামথের কথা।

ম্যামথ হচ্ছে ম্যামুথুস গণের একটি প্রজাতি যারা ৫ মিলিয়ন বছর আগে থেকে প্লায়োসিন যুগ এবং হলোসিন যুগের মাঝামাঝি সময়ে এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকায় বসবাস করত। এদের বেশির ভাগ প্রজাতি আজ থেকে ১০ হাজার বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায় যখন পৃথিবী থেকে সর্বশেষ আইস এইজের সমাপ্তি ঘটেছিল। ম্যামথদের অনেক প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ যে প্রজাতিটি পৃথিবীতে টিকে ছিল সেটি হচ্ছে লোমশ ম্যামথ। এই ম্যামথদের বিশেষত্ব হলো এদের গায়ের উপর আবৃত ৫০ সেন্টিমিটার লম্বা ঘন লোম। পূর্ব এশিয়ার ম্যামথ অঞ্চল থেকে চার লক্ষ বছর আগে এদের উত্থান ঘটে। এই প্রাণীটিকে আজকের দিনের হাতিদের পূর্বপুরুষ বলে মনে করা হয় এবং এরাও বর্তমানের হাতিদের মতোই দলবদ্ধ হয়ে সামাজিকভাবে বসবাস করতো। এদের বেশির ভাগ প্রজাতি বর্তমানের এশিয়ান হাতিদের মতই বড় হতো এবং এদের উচ্চতা আড়াই থেকে ৩ মিটার পর্যন্তই ছিল আর ওজন ছিল প্রায় ৫ টন পর্যন্ত। তবে বাচ্চা ম্যামথদের ওজন সাধারণত ৯০ কেজি হয়ে থাকে। কিছু কিছু ম্যামথ ছিল যাদের উচ্চতা এবং আকার অন্যসব ম্যামথদের থেকেও অনেক বড় হতো। উদাহরণস্বরূপ যদি কলম্বিয়ান ম্যামথের কথা ধরি,  তাহলে দেখতে পাব যে একটি কলম্বিয়ান ম্যামথের উচ্চতা ছিল ৪ মিটার এবং এর ওজন ছিল প্রায় আট থেকে ১২ টন পর্যন্ত । বেশিরভাগ ম্যামথদের চামড়া বেশ মোটা ছিল। সাধারণত একটি ম্যামথের ত্বক দের ইঞ্চি পর্যন্ত পু্রু হয়ে থাকে। তাদের এই মোটা চামড়া আইস এইজের সময়ে বরফের ঠান্ডা আবহাওয়া থেকে তাদেরকে রক্ষা করতো। হাতিদের তুলনায় ম্যামথদের বিশেষত্ব হচ্ছে এদের বিশালাকার দাত। একটা ম্যামথের দাত ১৬ ফিট পর্যন্ত লম্বা হতো। এদের এই গজদন্ত এক জীবনে প্রায় ছয় গুণ বড় হতো।  এই দাতের সাহায্যে তারা শত্রুদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করাসহ  জিনিসপত্র ধ্বংসের কাজে ব্যবহার করত। প্রাগৈতিহাসিক প্রাণী প্রজাতির মধ্যে লোমশ ম্যামথের প্রকৃতি ও আচরণ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা হয়েছে। সাইবেরিয়া ও আলাস্কায় এই ম্যামথের কঙ্কাল, দাত, পাকস্থলী, মল এমনকি দেহাবশেষ বরফে আচ্ছাদিত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এছাড়া বিভিন্ন গুহা্র দেয়ালেও চিত্রাঙ্কিত লোমশ ম্যামথের জীবনযাত্রা নিয়ে আভাস পাওয়া যায়। সতেরশো শতকের দিকে ইউরোপের ম্যামথের পরিচয় পাওয়ার আগে থেকেই এশিয়ান ম্যামথের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়।  বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও ১৭৯৬সালে  জর্ক ক্যুভিয়ে হাতির বিলুপ্তপ্রাপ্ত প্রজাতি হিসেবে ম্যামথকে তালিকাভুক্ত করেন। তাদের মোটা চামড়া এবং লম্বা লোমের কারণে শেষ বরফ যুগের ঠাণ্ডা পরিবেশে লোমশ ম্যামথ সহজেই মানিয়ে নিয়েছিল । এদের লোমের বহির্ভাগ অনেকটা চাদরের মতো শীত থেকে নিরাপত্তা দিত । একটি তৃণভোজী লোমশ প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকত। উত্তর ইউরেশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মত অঞ্চলে এদের বিচরণ ছিল বলে জানা যায়। 

লোমশ মেমোথেরা আদিম মানুষের সময় পর্যন্ত বসবাস করেছিল এবং তখনকার মানুষেরা এসব ম্যামথদের হাড় ও দাঁত অলংকার, সরঞ্জাম হিসেবে ও বাসস্থান নির্মাণের জন্য ব্যবহার করত এবং খাদ্যের জন্য শিকার করত। ম্যামথেরা এদের মূল ভূখণ্ড থেকে প্লাইস্টোসিন যুগের শেষে অর্থাৎ ১০০০০ বছর আগে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তবে এদের বিলুপ্তির কারণ নিয়ে বিভিন্ন মানুষের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।  সম্ভবত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, বাসস্থান সংকোচন, মানুষের দ্বারা অতিরিক্ত শিকার, অথবা এসব কারনের সংমিশ্রণের প্রভাবে এরা পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়। আবার যদি এদিক দিয়ে চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাবো যে ম্যামথেরা সাধারণত বরফ যুগের প্রাণী ছিল। বরফ যুগের সমাপ্তির ফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রার পরিমাণ বেড়ে যেতে থাকে।  অতিরিক্ত তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এরা পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছিল। যার  ফলে আইস এইজের সমাপ্তির সাথে সাথে এরাও বিলুপ্ত হয়ে যায়।ম্যামথ হাড়িয়ে যাওয়ার কারণ এটাও হতে পারে। এদের বিলুপ্তির পরেও মানুষ এদের দাঁত কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে যেতে থাকে, যার প্রচলন আজও অব্যাহত।

এই প্রজাতি কে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে বিজ্ঞানীরা একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হওয়া কোন প্রজাতি কে ফিরিয়ে আনা কি সম্ভব? হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানী জর্জ চার্জ এটা সম্ভব বলে মনে করেন।  ২০০৩ সালে স্পেন ও ফ্রান্সের গবেষকরা সর্বপ্রথম বুকার্ডো বা  পাইরেনিয়ান আইবেক্স নামে বিলুপ্ত হওয়া এক বুনো ছাগল প্রজাতির ক্লোন তৈরী করেছিলেন। যে প্রজাতিটি ২০০০ সালে লুপ্ত বলে ঘোষণা করেছিল ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড ফান্ড। যদিও ল্যাবরেটরীতে জন্ম নেওয়া ছাগলটি বেশিদিন বাঁচে নি। 

একটি প্রাণীর ক্লোন করার জন্য দরকার সেই প্রজাতির ডিএনএ এবং কোষের নিউক্লিয়াস। সুতরাং ম্যামথকে ক্লোন করতে হলেও প্রয়োজন হবে ম্যামথের প্রয়োজনীয় নিউক্লিয়াস। যার মধ্যে ম্যামথের জিনগুলো অক্ষত অবস্থায় থাকতে হবে।  সেই নিউক্লিয়াসটি আবার ম্যামথের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত প্রাণী বা হাতীর ডিম্বানুতে বসাতে হবে। তারপর কৃত্রিমভাবে তৈরী করা ভ্রূনকে মহিলা হাতির জড়ায়ুতে প্রতিস্থাপন করতে হবে।এভাবে নির্দিষ্ট সময় পরে জন্মগ্রহণ করবে ম্যামথের শাবক। তবে তৈরীকৃত ক্লোন ম্যামথটির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে লোমশ ম্যামথের মত নাও হতে পারে।

বন্ধুরা,  এবার আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন রইল। ম্যামথদের বাসযোগ্য আবহাওয়া, পরিবেশ এবং খাদ্য পৃথিবীতে কী আজ আছে? পৃথিবীর উষ্ণ আবহাওয়ায় এই বরফ যুগের প্রাণীরা টিকে থাকতে পারবে তো। আমরা যদি একটি প্রজাতীর পুনরুত্থান ঘটাই তাহলে এদের এই পৃথিবীর বুকে ঠাই দেওয়ার দায়িত্বটাও কিন্তু আমাদের। তাদেরকে ফিরিয়ে আনার সাথে সাথে তাদের বাসযোগ্য করে তোলার বিষয়টাও মাথায় রাখতে হবে।আমরা বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির দিকে যদি একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে, বর্তমানে বেঁচে থাকা প্রাণীরাই তাদের নিরাপদ আবাসস্থলের অভাবে আস্তে আস্তে পৃথিবী থেকে হাড়িয়ে যাচ্ছে। সবার আগে এদের কথা মাথায় আনতে হবে আমাদের।