প্যারাডক্স কী? টাইম ট্রাভেল করে কি অতীতে ভ্রমণ সম্ভব? (৩য় পর্ব)


টাইম ট্রাভেল করে কি অতীতে ভ্রমণ সম্ভব? 
২য় পর্বে আমরা, টাইম ট্রাভেল করা সম্ভব কিনা তার একটা পুর্ণাঙ্গ যুক্তিযুক্ত ধারণা দিয়েছিলাম এবং ১ম পর্বে দেখিয়েছিলাম টাইম ট্রাভেল করে এসেছে এমন কিছু লোকেদের প্রমাণ বা এভিডেন্স। গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম যে, অতি উন্নত প্রযুক্তির টাইম মেশিন এবং ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাকহোল দ্বারা টাইম ট্রাভেলিং করা সম্ভব, আবার এও বলেছিলাম ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেল করতে পারলেও অতীতে টাইম ট্রাভেল সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু কেন? 
কিছু প্যারাডক্স আছে যেগুলো অতীতে টাইম ট্রাভেল করতে বিরোধীতা পোষন করে।আর সেই প্যারাডক্সগুলোকে নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করবো।


সবার আগে, প্যারাডক্স কি এ ব্যাপারে আমাদের জানা উচিৎ। প্যারাডক্স শব্দটির বাংলা অর্থ দাঁড়ায়, “আপাতদৃষ্টিতে স্ব-বিরোধী” অর্থ্যাৎ কোনো সম্ভাবনা নাকচ করে দেয়া। অতীতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে টাইম ট্রাভেলাররা কার্যকরনের চক্রে গোলমাল বাধিয়ে ফেলতে পারেন। সময় ভ্রমণ বিষয়ক বিজ্ঞান কল্প-গল্পে এমন সমস্যা হরহামেশাই দেখা যায়। টাইম ট্রাভেলের কারণে অনেক ধরনের প্যারাডক্স তৈরি হতে পারে। একজন মানুষ অতীত ভ্রমণে গিয়ে নিজেরই মুখোমুখি যদি হয়, তাহলে একই সময়ে একই ব্যক্তির দু’টো আলাদা সত্ত্বা থাকে। একই মানুষের দু’টো আলাদা সত্ত্বা থাকে কীভাবে? আসলে এটাই সময় ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি। এছাড়া আরো কিছু প্যারাডক্স আছে সময় ভ্রমণে। হিটলার, বাটারফ্লাই, গ্র্যান্ডফাদার, ফার্মির ও ইনফরমেশন প্যারাডক্স এগুলোর মধ্যে অন্যতম।


হিটলার প্যারাডক্সঃ
ধরুন আমি আপনাকে একটি টাইম মেশিন বানিয়ে দিলাম, আপনি এই টাইম মেশিন ব্যবহার করে চলে গেলেন অতীতে। সালটা ছিল ১৮৮৯ সাল। এবং এ বছরের ২০শে এপ্রিল হিটলারের জন্ম। উনি জন্মানোর সাথে সাথেই আপনি তাঁকে গুলি করে হত্যা করলেন যাতে সে বড় হয়ে এসব যুদ্ধ-বিগ্রহ করতে না পারে। বেশ ভালো আইডিয়া। তবে চিন্তা করে দেখুন, এখানে সমস্যাটি হচ্ছে, আপনি অতীতে টাইম ট্রাভেল করে ফিরে গিয়ে হিটলারকে মেরে ফেলার মানে হচ্ছে, হিটলার বড় হয়ে এসব যুদ্ধ-বিগ্রহ করার আগেই আপনি তাকে এই পৃথিবী থেকে এবং ইউনিভার্স থেকে ডিলিট করে দিচ্ছেন। 
এর মানে, হিটলার এসব কিছুই করতে পারলো না। কারণ হিটলার তখন আর জীবিতই নেই। তাই পৃথিবীর ইতিহাসে তখন আর হিটলার নামের কেউ নেই এবং সে কি করেছে না করেছে সেসবও কিচ্ছু নেই। অর্থ্যাৎ, আপনারও হিটলার সম্পর্কে কিছু জানার কোন উপায় নেই। ভেবে দেখুন, হিটলার যদি জীবিতই না থাকলো, তাহলে হিটলার সম্পর্কে ভবিষ্যতে কোনো ইনফরমেশন পৃথিবীর ইতিহাসেই থাকলো না এবং আপনি আপনার জন্মের পর থেকে হিটলার নামে কেউ ছিল তাও জানলেন না। যেহেতু আপনি তার ব্যাপারে কিছু জানলেন না তাহলে আপনি হিটলারকে মারতে গেলেন কিভাবে? তাকে তো আপনি জানেন না চেনেন না এমনকি এই পৃথিবীতে তার অস্তিত্বও নেই। সুতরাং হিটলার প্যারাডক্স অনুসারে সময় ভ্রমণে করে অতীতে যাওয়া অসম্ভব।

বাটারফ্লাই ইফেক্টঃ
ধরুন একজন মানুষ সময় ভ্রমণ করে ডাইনোসরদের যুগে গেলেন ও একটি প্রজাপতির উপর পা রাখলেন। কাজটি ছোট্ট। কিন্তু এর ফলেই একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকলো, যা পাল্টে দিলো লক্ষ বছরের ইতিহাস। মানুষটা বর্তমান সময়ে ফিরে এলেন, কিন্তু আগের পৃথিবী আর নেই এখন। এই ছোট্ট পরিবর্তন যদি ভবিষ্যতকেই বদলে দেয়, তাহলে অতীতে সময় ভ্রমণ কতটা যুক্তিযুক্ত? এর প্রভাবের চমৎকার উদাহরণ দেখা যায়, রে ব্র্যাডবেরীর বাটারফ্লাই ইফেক্ট নামের একটি গল্পে। ব্যাপারটা শুধুমাত্র যে বাটারফ্লাই এর জন্য প্রযোজ্য তেমন না। এটা মানুষসহ যেকোনো মুভিং ম্যাটার এর জন্য প্রযোজ্য। টাইম ট্র্যাভেলে এই ‘বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ কেমন ভূমিকা রাখতে পারে- সেই আইডিয়ার উপর ভিত্তি করেই ২০০৪ সালে নির্মিত হয়েছে অনবদ্য একটি সিনেমা ‘দ্যা বাটারফ্লাই ইফেক্ট’ চাইলে দেখে নিতে পারেন।


গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্সঃ
দাদাজানের দোষ কি এখানে? দাদাজানকে টেনে আনছেন কেন? আছে বৈ কি। দাদাকে নিয়ে একটু এক্সপেরিমেন্ট করতে হবে আরকি…
এটা নিয়ে এক্সপিরেন্ট না করলেই নয়। কারন হচ্ছে এই দাদাজানই টাইম ট্রাভেলের সকল প্যারাডক্সের গুরু।


এই ছবিটি লক্ষ করুন, ধরুন এই পৃথিবীর আলো বাতাসে অন্য সকল প্রাণীর মতো আপনিও জন্ম নিলেন এবং বড় হয়ে একটা টাইম মেশিন আবিষ্কার করলেন। এবং সেই টাইম মেশিনে বসে আপনি চলে গেলেন আপনার দাদার আমলে। সেখানে গিয়ে আপনার দাদাকে মেরে ফেললেন। তাহলে আর আপনার বাবার জন্ম হবে না। আপনার বাবার জন্ম না হলে আপনারও জন্ম হবে না। আপনার জন্ম না হলে আপনি টাইম মেশিন ও তৈরী করবেন না। আপনি টাইম মেশিন তৈরী না করে থাকলে তাহলে আপনি আর অতীতেও যাবেনা না। আপনি অতীতে না গেলে আপনার দাদাজানও বেচে থাকলো। আপনার দাদাজান বেচে থাকলে আপনার বাবাও বেচে থাকবে। আর আপনার বাবা বেচে থাকলে আপনিও জন্মগ্রহন করবেন। আর আপনি জন্ম নিলে টাইম মেশিন তৈরী করবেন। তারপর সেটা দিয়ে আবার অতীতে ভ্রমণ করবেন। এভাবে চলতেই থাকবে...

এই প্যারাডক্সটা সত্যিই মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতো। এ চক্রটা দেখেই বোঝা যায় যে টাইম ট্রাভেল ভবিষ্যতে করতে পারলেও অতীতে করার ক্ষেত্রে ইউনিভার্সের নিয়মকে লঙ্ঘন করতে হবে। যেটা আসলেই সম্ভব না। 


ফার্মির প্যারাডক্সঃ
টাইম ট্রাভেল যদি সম্ভব হয় তাহলে টাইম ট্রাভেলার বা সময় পরিভ্রমণকারীরা কোথায়? এখনো আসেনি কেন?” –এটিই ফার্মির প্যারাডক্স নামে পরিচিত।
যেহেতু আমরা এখানে অতীতে ভ্রমণ সংক্রান্ত কিছু প্যারাডক্স নিয়ে আলোচনা করছি সেহেতু আমরা ভবিষ্যতে না যাই (ভবিষ্যতে টাইম ট্রাভেলিং নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ২য় পর্বে) 
ফার্মির প্যারাডক্স অনুযায়ী ভবিষ্যতে যদি কখনো টাইম মেশিন আবিষ্কার হয় এবং সেই টাইম ট্রাভেলাররা যদি অতীতে ভ্রমন করতে পারেন তাহলে  তারা এখন কোথায়? তাদেরকে আমরা দেখতে পারছি না কেন? তাহলে কি আসলেই কখনো অতীতে টাইম ট্রাভেলিং করা যাবে না? 

এই প্যারাডক্সগুলো সম্পর্কে জেনে ইতিমধ্যে হয়ত আপনি ধরেই নিয়েছেন অতীতে সময় ভ্রমণ সম্ভব নয়। কিন্তু এখন আপনার আশা ভরসা আরেকটু প্রজ্বলিত করার জন্য ২টি থিওরীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেব। 
একটা হলো "নভিকের আত্মরক্ষার থিওরি" আরেকটি হচ্ছে "প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি"। নভিকের আত্মরক্ষার থিওরি অনুযায়ী টাইম ট্রাভেল করে অতীতে ফিরে গেলেও কেউ এমন কোনো কাজের সাথে যুক্ত হতে পারবে না যেটা তার প্রকৃত বর্তমানকে প্রভাবিত করবে। ধরা যাক কেউ যদি অতীতে গিয়ে তার ছোটবেলার শিশু অবস্থায় নিজেকে হত্যা করার চেষ্টা করে, সে সেটা পারবে না। কারণ নিয়ম অনুযায়ী সে তার শিশু অবস্থাকে হত্যা করলে তার অস্তিত্বই অসম্ভব হয়ে যায়।
হয়তো সে ছোটবেলায় যেখানে থাকতো সেখানে গিয়ে শৈশবের নিজেকে খোঁজার চেষ্টা করে তাহলে দেখবে যে সেখানে তারা থাকে না। অন্য কোনো পরিবার সেখানে বসবাস করছে। জগতই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে দিয়েছে। এই থিওরি অনুযায়ী কেউ যতই চেষ্টা করুক না কেনো, এমন কোনো কাজ করতে পারবে না যা প্রকৃত বর্তমানকে পরিবর্তন করবে।
তার মানে এই থিওরি অনুসারে গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স, বুটস্ট্র্যাপ প্যারাডক্স ইত্যাদির একটি সম্ভাবনাময় সমাধান তৈরি হবে।


আরেকটি থিওরি হচ্ছে, প্যারালাল ইউনিভার্স থিওরি। এটি এমন একটি থিওরি যেখানে বলা হয়েছে মহাবিশ্বে একাধিক পৃথিবী রয়েছে এবং তারা একটি অন্যটির প্রতিরূপ। প্যারালাল ইউনিভার্স আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতো আরও একটি বা একাধিক ব্রহ্মাণ্ড যা ঠিক আমাদেরই মতো। সেখানকার প্রকৃতি, ভূমণ্ডল এমনকি প্রাণিজগৎও একেবারে আমাদেরই মতো। হুবহু আমাদেরই মতো দেখতে সবকিছু। একেবারে যেন আমাদের যমজ বিশ্ব। এবং সেখানে গিয়ে আপনার মতো মানুষগুলোকে আপনি মেরে ফেলতে পারেন। তাতে আপনার অস্তিত্ব বিপন্ন হবে না। এই থিওরি থেকেও ধারণা করা যায় যে আপনি অতীত ভবিষ্যত উভয় ক্ষেত্রেই টাইম ট্রাভেলিং করতে পারেন।

টাইম ট্রাভেল আসলে একটি কল্পবিজ্ঞান। বিজ্ঞানীদের গানিতিক তত্ব বা প্রমানের ভিত্তিতে একটি বৈজ্ঞানিক কল্পনামাত্র। তবে এই কল্পনা থেকেই বিশ্বে এ পর্যন্ত বহু বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। আগে যখন কেউ আকাশে ওরার কথা ভাবতো তাহলে তাকে পাগল বলে হাসাহাসি করতো। কিন্তু এই আকাশে ওরার ব্যাপারটা আমাদের কাছে পানিভাতের মতো হয়ে গিয়েছে। এভাবে অনেক বিস্ময়ের আবিষ্কার হয়েছে শেষ পর্যন্তু। এমনকি এই টাইম ট্রাভেলের রহস্যটাও একদিন সবার সামনে উন্মোচিত হবে বলে আশা রাখছি।

(লিখাটি বুঝতে কোন সমস্যা হলে উপর থেকে ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন)