সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ কিভাবে কাজ করে?
একটি সাধারণ জাহাজ ভেসে থাকে কারণ, জাহাজের ভিতরের নিচের দিকের অংশটা ফাঁপা থাকে বলে জাহাজ যে আয়তনের পানি অপসারণ করে তার ওজন জাহাজের ওজনের চেয়ে বেশী। এক্ষেত্রে পানি দ্বারা জাহাজের উপর একটি উর্ধবমুখি লব্ধি বল কাজ করে যাকে প্লবতা বলা হয়।
কিন্তু একটি সাবমেরিন বা ডুবোজাহাজ অন্যান্য সাধারণ জাহাজগুলোর থেকে আলাদা হয়। এর কারণ হচ্ছে, একজন সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন তার ইচ্ছে অনুযায়ী জাহাজটিকে ভাসিয়ে রাখতে পারেন এবং চাইলে প্রয়োজনে যেকোন সময় তা পানির নিচে ডুবিয়ে দিতেও পারেন।
আর এ কাজটি করার জন্য সাবমেরিনের ভেতর একটি বিশেষ ট্যাংক থাকে যা প্রয়োজন অনুযায়ী বাতাস কিংবা পানি দ্বারা ভর্তি করার মাধ্যমে জাহাজকে ডুবানো কিংবা ভাসানো হয়। এই বিশেষ ট্যাংকটিকে বলা হয় ব্যালেস্ট ট্যাংক।
যখন একটি সাবমেরিনকে পানিতে ভাসিয়ে রাখার প্রয়োজন হয় তখন এর ট্যাংটিকে বাতাস দ্বারা পূর্ণ করা হয়। ট্যাংকটি বাতাস দ্বারা পূর্ণ করা হলে সাবমেরিনটি বাইরে থাকা পানির তুলনায় অধিক হালকা হয়ে যায়। ফলে এটি সহজেই পানির উপরে ভেসে ওঠে।
আবার, ক্যাপ্টেন যখন জাহাজটিকে পানিতে ডোবানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন একটি নির্গমন নল দিয়ে ট্যাংকে থাকা বাতাস বের হয়ে যায় এবং একই সাথে ট্যাংকটি আবার পানি দ্বারা পূর্ণ হয়ে যায়। ট্যাংকটি পানি দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেলে, সাবমেরিনের ওজন এর বাইরে থাকা পানির চেয়ে বেশি হয়ে যায়। যার ফলে সাবমেরিনটি সহজেই ডুবে যায়।
সাবমেরিনের ট্যাংকে বাতাস ভরার জন্য একটি বিশেষ বায়ু সরাবরাহকারী যন্ত্রের ব্যবহার করা হয়। জরুরী পরিস্থিতিতে জাহাজকে পানির উপরে তোলার জন্য ট্যাংকগুলিকে অতি দ্রুতসম্ভব, উচ্চ-চাপ সমৃদ্ধ বাতাস দ্বারা পূর্ণ করা হয়।
চলুন এবার একটু সাবমেরিনের ভেতরে উঁকি দেয়া যাক। সাবমেরিনে বসবাস। ব্যাপারটি আপনার কাছে খুব রোমাঞ্চকর ও মজাদার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু পানির নিচে থাকা নাবিকদের প্রতিদিনই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। সাবমেরিনের ভেতর বসবাসের ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হয় সেগুলোর মধ্যে ৩টি বড় সমস্যা হচ্ছে- এর ভেতরে থাকা বাতাসের গুনগতমান, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ এবং তাপমাত্রার পরিমাণ বজায় রাখা।
আমরা বায়ু থেকে যে নিঃশ্বাস নেই তা আসলে ৪টি গ্যাসের সাথে সম্পর্কিত। সেগুলো হলো- নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, আর্গন এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড। আমরা যখন বড় করে শ্বাস নেই তখন আমরা নিঃশ্বাসের সাথে অক্সিজেন গ্রহণ করি। আবার যখন আমরা নিঃশ্বাস ছাড়ি, তখন আমাদের শরীরে থাকা দুষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে শরীর থেকে বের করে দেই।
কল্পনা করুন তো, আপনি আপনার বন্ধুদের নিয়ে একটি সীলগালা করা টিউবের ভেতর আবদ্ধ আছেন এবং টিউবটি বন্ধ করার সময়ে যে বায়ুগুলো ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছিল শুধুমাত্র সেটুকু বাতাসই এর মদ্ধে অবশিষ্ট আছে।
এখন সমস্যা একটাই। আপনাকে বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে, এর ভেতরে নতুন করে কোন বাতাস প্রবেশ করতে পারবে না এবং এর ভেতর থেকে কোন প্রকার বাতাস বের হতেও পারবে না। এইযে, এতোক্ষণ যে প্রক্রিয়াটি আপনি কল্পনা করলেন, ঠিক একইভাবে কাজ করে সকল সাবমেরিন।
একজন মানুষকে সাবমেরিনের ভেতর বেঁচে থাকতে হলে, ৩টি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, নাবিকদের নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য সাবমেরিনের ভেতরটা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন দ্বারা পরিপূর্ণ করতে হবে। এর জন্য সাধারণত প্রেশারাইজড ট্যাংকগুলি থেকে অক্সিজেন সরাবরাহ করা হয়। একটি কম্পিউটারাইজড সিস্টেম দ্বারা বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা পরিক্ষা করা হয় এবং নাবিকদের প্রয়োজন অনুসারে অক্সিজেন সরাবরাহ করা হয়।
দ্বিতীয়ত, নাবিকদের নিঃশ্বাস ছাড়ার পর বাতাসে যে কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরী হয় সেগুলোও বের করে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে বিষ্ক্রিয়ায় সবার মৃত্যু হতে পারে। “স্ক্রাবার মেশিন” নামক এক ধরনের যন্ত্র সোডা লাইমের মাধ্যমে বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডকে রিমুভ করে ফেলে।
অবশেষে, শ্বাস প্রশ্বাস থেকে তৈরি হওয়া আদ্রতার কারনে সাবমেরিনের অভ্যন্তরে বাতাসের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যার ফলে জাহাজের যন্ত্রাংশের ক্ষতি হতে পারে। Dehumidifier নামক এক পদ্ধতির মাধ্যমে সবশেষে এই সমস্যারও সমাধান করা হয়।
আমরা সবাই জানি যে, পানি ছাড়া মানুষ কেন, কোন প্রাণিই বেঁচে থাকতে পারে না। যেহেতু সাবমেরিনগুলোতে সিটি কর্পোরেশন কিংবা পৌরসভার পানি সরাবরাহ করা সম্ভব হয় না, তাই এক্ষেত্রেও জাহাজের নাবিকদেরকে ভিন্ন পদ্ধতিতে পানযোগ্য নিরাপদ পানি উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হয়।
বেশিরভাগ সাবমেরিনগুলোতে বিশেষ এক ধরনের যন্ত্র থাকে যা সমুদ্রের লবনাক্ত পানি থেকে লবনকে দূর করে বিশুদ্ধ পানযোগ্য জলে পরিণত করতে সক্ষম। আর এক্ষেত্রে যে পদ্ধতিতে পানি থেকে লবন দূর করা হয় সেই প্রক্রিয়াটিকে পাতন প্রক্রিয়া বলে। কিছু কিছু সাবমেরিন আছে যেগুলো প্রতিদিন ৪০ হাজার গ্যালনেরও বেশি পরিমান বিশুদ্ধ পানি উৎপাদন করতে সক্ষম। রান্না-বান্না, গোছল, খাওয়া-দাওয়াসহ সাবমেরিনের অভ্যন্তরীন সকল কাজের জন্য এই পানিকে ব্যবহার করা হয়।
এছাড়াও জাহাজের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং নাবিকদেরকে আরামদায়ক রাখার জন্য এর অভ্যন্তরীন বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ব্যবহার করা হয়।
যদিও একটি পারমাণবিক সাবমেরিন ২৫ বছর বা এরও বেশী সময় পর্যন্ত পানির নিচে থাকতে পারবে কিন্ত জাহাজের জ্বালানি কিংবা নাবিকদের খাদ্যর জন্য তাকে উপরে আসতেই হবে। সাধারণত সাবমেরিনে ৬ মাসের বেশী খাবার মজুদ রাখা যায় না। ৬ মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলে খাবারের মান আস্তে আস্তে নষ্ট হতে থাকে।
একটি সাবমেরিন সাধারণত ৫০-৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে। সাবমেরিনের এই গতির জন্য এর পেছনে শক্তিশালী প্রপেলার বসানো থাকে যা তরল পদার্থের গতিবিজ্ঞান ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত হয়। সাবমেরিন ভেদে একেকটি সাবমেরিন সমুদ্রের বিভিন্ন গভীরতায় যাতায়াত করতে পারে। নির্দিষ্ট রেঞ্জের আরো গভীরে চলে গেলে পড়তে হয় ভয়াবহ দূর্ঘটনায়। বর্তমানের আধুনিক সাবমেরিন গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী চাপ নিতে সক্ষম মার্কিন পারমাণবিক সাবমেরিন ও রাশিয়ান সাবমেরিনগুলো। কিন্তু তবুও মার্কিন সাবমেরিন গুলো সারে চার হাজার ফুটের নিচে যেতে পারে না। যদি যায় তবে পানির বিশাল চাপে সাবমেরিন চ্যাপ্টা হয়ে যাবে এবং একসময় ভেঙ্গে বিস্ফোরিত হবে।
১৬২০ সালে গ্রীক বিজ্ঞানী আর্কিমিডিসের “ব্যালাস্ট ট্যাঙ্ক থিওরি” এর ওপর ভিত্তি করে কর্ণেলিয়াস জ্যাকবসজুন ড্রেবেল নামের একজন ডাচ ব্যাক্তি প্রথম নৌযান হিসেবে সাবমেরিন আবিষ্কার করেন। সেটাই ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম কোন ডুবোজাহাজ।
২য় বিশবযুদ্ধের সময় সাবমেরিনই ছিল আমেরিকার প্রধান অস্ত্র। এই কারনেই মাত্র ২ শতাংশ আমেরিকান নেভি ৩০ শতাংশ জাপানিজ নেভিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এই ধ্বংসযজ্ঞের তালিকায় ছিল- ১টি যুদ্ধ জাহাজ, ৮টি বিমানবাহী জাহাজ এবং ১১টি ক্রসার।
