উড়োজাহাজ আবিষ্কারের ইতিহাস
অনেক আগে থেকেই আকাশে পাখিদের উড়া দেখে মানুষের মনেও সাধ জেগেছিল যে আকাশে উড়বে। কিন্তু পাখিরা আকাশে ওড়ে ডানার সাহায্যে, মানুষের তো ডানা নেই। তবুও অনেক দুঃসাহসী মানুষ কৃত্রিম ডানা পিঠে বেঁধে আকাশে ওড়বার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু তাতে কি আর কাজের কাজ কিছু হয়? বরং এতে বাড়ল নানান দূর্ঘটনা। তারপর আকাশে ওড়ার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে পর্যায়ক্রমে আবিষ্কার করল বেলুন ও গ্লাইডারের। কিন্তু দুধের স্বাদ কি ঘোলে মিটে?
তাই অবশেষে সব অসম্ভবকে সম্ভব করে উইলবার রাইট ও অরবিল রাইট আবিষ্কার করেন উড়োজাহাজ। যেটির বদৌলতে পুরো বিশ্ব এখন আমাদের খুব কাছে এনে দিয়েছে।
এই দুই সহোদর রাইট ভ্রাতৃদ্বয় ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি নিয়ে মেতে থাকতেন। অফুরন্ত ধৈর্য ও নাওয়া খাওয়া ছেড়ে সবসময় লেগে থাকতেন নতুন কিছু তৈরী করার চিন্তায়। মাঝে মাঝে নিজেরা তৈরীও করে ফেলতেন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি।
ঠিক সে সময় অটো লিলিয়েনথাল নামের একজন জার্মানী ইঞ্জিনিয়ার উড়োজাহাজ নিয়ে গবেষণা করতেন। কিন্তু গবেষণার সময়কালে আনফরচুনেটলি তার মৃত্যু হয়ে যায়। এই ভদ্রলোকের মৃত্যুতে তার গবেষণার কাজ সেখানেই বন্ধ হয়ে যায়।
ঠিক তখনই রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তার এই অসমাপ্ত গবেষণাকে ঘিরে মনের মধ্যে জল্পনা কল্পনা বাঁধতে থাকলেন। খুজে বের করতে লাগলেন লিলিয়েনথালের রিসার্চের ঘাটতি ও ত্রুটিগুলোকে এবং আকাশে ওড়া নিয়ে সেপর্যন্ত যতো রিসার্চ হয়েছিল সবগুলোর নমুনা সংগ্রহ করলেন এবং অবশেষে তারা সেগুলোকে নিয়ে আবার রিসার্চ করতে থাকলেন। পরিক্ষা নিরীক্ষা করার পর বুঝতে পারলেন কেবলমাত্র বাতাসের গতির ওপর নির্ভর করে কোনো উড়োযান বেশিদূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়, দরকার শক্তিশালী ইঞ্জিনের।
তাই দুই ভাই মিলে শুরু করলেন ইঞ্জিনের বিষয়ে বিস্তর গবেষণা। প্রচুর রিসার্চের পর কোনভাবেই সফলতার মুখ দেখতে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে আশাও ছেড়ে দিচ্ছিলেন না। বরং নতুন উদ্যোগে, বিস্তর জ্ঞান অর্জন করে এ বিষয়ে পুনরায় রিসার্চ করতে থাকলেন। ভারসাম্য নির্ণয়ের পদ্ধতি, বাতাসের গতিবেগ, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এর চাপ এবং ইতিপূর্বে যে পদ্ধতিতে উড়োযান তৈরীর প্রচেষ্টা করা হয়েছিল তার সবকটি রিসার্চ নিজেদের রিসার্চে নিয়ে আসলেন। দীর্ঘ এক বছরের লাগাতার প্রচেষ্টায় তারা একটি বড় আকারের উরোযানও তৈরী করে ফেললেন।
এই সাফল্য তাদের নিজেদেরকে আরো অনুপ্রানিত করে তুলেছিল। তাই তারা অবশেষে একটি ছোটখাটো বিমান তৈরী করে ফেলে। বিমানটি কয়েক মিনিট ধরে আকাশে উড়তে সক্ষম ছিল। ভারসাম্য রক্ষার জন্য এলিভেটর নামের একটি ছোট যন্ত্র বিমানটির পেছনের অংশে জুড়ে দেয়া হয়। এই যন্ত্রটি গতি নিয়ন্ত্রণে পাইলটকে অনেক সাহায্য করবে।
বিমানটি আকাশে ওড়ানো হলো। আকাশে ওড়ানোর পর বুঝতে পারলেন যে তাদের স্ট্রাটেজি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন ধরনের ইঞ্জিন নিয়ে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে বুঝতে পারলেন যে, পেট্রোল চালিত হালকা ইঞ্জিনই বিমানের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী। বাজারে সে রকম ইঞ্জিন না থাকায় তারা নিজেরাই তৈরী করে ফেললেন বিমানের জন্য উপর্যুক্ত পেট্রোলচালিত হালকা ইঞ্জিন।
এরপর ১৯৩০ সালের ১৭ই ডিসেম্বর কেললিনা প্রদেশের কেটিহক শহরের এক মাঠে পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শনের জন্য বিমানটি উপস্থিত করা হলো। যেহেতু তখনো উরোযানের কোনো নাম দেয়া হয়নি তাই তারা উড়োযানটির নাম দিলেন রাইট ফ্লাইয়ার। অনেকে তাদের এই আবিষ্কারের কথা বিশ্বাস না করলেও কয়েকজন কৌতুহলী মানুষ নতুন এই আবিষ্কারটি দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিল।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি।
সর্বপ্রথম অরবিল রাইট বিমানে বসে প্রপেলার চালু করলেন। বিমানের দুপাশে দুটি বাধা দড়িকে ছেড়ে দিলেন উইলবার রাইট। তারপর পুরো শক্তি ব্যয় করে বিমানটিকে ঠেলতে আরম্ভ করলেন। সেদিন প্রথম বারের মতো ১২ সেকেন্ড আকাশে উড়েছিল ওই বিমানটি। আর ওই ১২সেকেন্ডই ছিল আজকের আকাশজয়ের নতুন গতির যুগের সূচণা। তারপর ২য় বারের মতো উইলবার রাইট বিমানে চড়ে বসলেন। এবার তিনি ঊনষাট সেকেন্ড ধরে আকাশে উড়েছিলেন। অতিক্রম করলেন ৮২০ফুট দূরত্ব। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে পৃথিবীর ঐতিহাসিক এই ঘটনাটি ওই কয়েকজন বাদে পৃথিবীর কোন মানুষই জানতে পারল না। তাই দুই ভাই মিলে চিন্তা করলেন আকাশে ওড়ার দৃশ্যটি এবার তা্রা আমেরিকার পত্রিকাগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়ে উপস্থাপন করবেন। এর জন্য তার বড় আকারের একটি বিমান প্রস্তত করলো। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সেদিন সকাল থেকেই আকাশের অবস্থা ভালো ছিলো না। এছাড়া তাদের নতুন ইঞ্জিনটিও ঠিকঠাক কাজ করছিল না। তাই ঝড়ো পরিস্থিতির মুখে সেদিনকার মতো তাদের এই পরিকল্পনা বাতিল করতে হলো। সাংবাদিকসহ অনেক মানুষই তাদের দুই ভাইকে মিথ্যুক ও অপপ্রচারকারী হিসেবে আখ্যা দিল।
তাই তারা এবার আর কাউকেই না জানিয়ে নিরবে তাদের পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করে যাচ্ছিলেন। একসময় তাদের এ কাজ করতে করতে দুই ভাই প্রায় নিঃস হয়ে পড়েছিল। তাই তারা কিছুদিনের জন্য ওড়াওড়ি বন্ধ রেখে অর্থ উপার্জনের দিকে মন দিলেন। কিছুদিন ব্যবসা করে অর্থ সঞ্চয় করে তারা আবার তা জনসম্মুখে উপস্থাপনের চেষ্টা করলেন। এবার আমন্ত্রণ জানানো হলো সাংবাদিকসহ কিছু বিশিষ্টজনদের।
এইবার আর কোনো বিপত্তি ঘটলো না। নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হয়ে দুই ভাই নিজেদেরকে পাখির মতো উড়িয়ে দেখালেন। যা এতোদিন অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব ছিল। মানুষের এই আকাশ বিজয়ের খবর আমেরিকা ছেড়ে ইউরোপসহ আস্তে আস্তে সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ল।
এই অসাধারন দুইজন বিজ্ঞানীদের মধ্যে একজন ১৮৬৩ সালে জন্মগ্রহন করা উইলবার রাইট মারা যান ১৯১২ সালে এবং অন্যজন ১৮৭১ সালে জমগ্রহন করা অরভিল রাইট মারা যান ১৯৪৮ সালে।
