করোনাভাইরাসের আদ্যোপান্ত
করোনা ভাইরাস কি?
করোনা ভাইরাস এমন একটি ভাইরাস যা এর আগে মানুষের মধ্যে এতো দ্রুত গতিতে এমন ব্যাপকহারে ছড়ায় নি। ভাইরাসটির অন্য নাম “২০১৯-নভেল করোনা ভাইরাস” বা “২০১৯-এনসিওভি” যা সংক্ষেপে সবার কাছে করোনা ভাইরাস নামেই পরিচিত। মোট ৭ ধরনের করোনা ভাইরাস আছে যা নতুন করে তাদের মধ্যে জীনগত পরিবর্তন করে মানুষকে আক্রান্ত করছে। এটি মানুষের ফুসফুসকে আক্রান্ত করছে এবং সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো সংক্রমিত হচ্ছে। ভাইরাসটির জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে এর সাথে সার্স ভাইরাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ২০০২ সালের সেই সার্স ভাইরাসে তখন প্রায় ৮’শ র মতো মানুষ মারা গিয়েছিল।
উৎপত্তিঃ
করোনা ভাইরাস প্রথম আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯৬০ এর দশকে এবং পরবর্তীতে বিভিন্নভাবে তা প্রাণীকূলের দেহে উৎপটিত হয়েছে। এবং অবশেষে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে এই ভাইরাস বহনকারী একটি মাংশাসী প্রাণীর দেহ থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে যা বর্তমানে পুরো পৃথিবীজুড়ে মহামারী আকারে বিস্তার করেছে। এর পরিবারভুক্ত সকল ভাইরাসই ইতিহাসে মহামারী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিল।
করোনার ভয়াবহতাঃ
করোনা ভাইরাস মানুষের ফুসফুসের মাধ্যমে সংক্রমন ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ ফ্লু বা ঠান্ডা লাগার মতো করেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায় এবং এর কারনে অরগ্যান ফেইলর বা দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। এ পর্যন্ত আক্রান্তদের ছয় শতাংশ মারা গিয়েছে এবং দিনকে দিন এই মৃত্যুর হার ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। ধারনা করা হয়, এমন মৃত্যুও ঘটেছে যা সনাক্ত করা সম্ভব হয়ে উঠে নি। যতই দিন আগাচ্ছে পৃথিবীব্যাপি এই ভাইরাসটি ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ছে এবং বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১১০টি দেশে এটি তার আধিপত্য বিস্তার করেছে। পুরো বিশ্বে এই ভাইরাসটি সবার মনে ভীতিজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এবং এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৩৬৪৬ জনেরও বেশি।
করোনা ভাইরাস যেসব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের ক্ষতিসাধন করতে পারেঃ
করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের বলা হয় কভিড-১৯। এই ভাইরাসের আক্রমনে বিভিন্ন মানব অঙ্গ-প্রতঙ্গ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্থ বা বিকল হয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে ফুসফুস, কিডনি, রক্ত, লিভার উল্লেখযোগ্য।
ফুসফুসঃ ফ্লুর মতো করোনা ভাইরাসও শ্বাসযন্ত্রের রোগ হওয়াতে এটি সবার প্রথমে ফুসেফুসেই আক্রমন করে। সাধারনত হাঁচি, কাশির মাধ্যমে বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কণা অন্য কারো দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশের মাধ্যমে সেই ব্যক্তিকেও আক্রান্ত করে ফেলে এবং পরবর্তিতে জ্বর, কাশির মাধ্যমে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়। হঠাৎ করে কোন এক সময় নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে রোগীর অবস্থা ভয়াবহ রকমের খারাপ হয়ে যায়।
রক্তঃ হাইপারেক্টিভ ইমিউন প্রতিক্রিয়ার কারনে শরীরের অন্যান্য সিস্টেমেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। একটি সমীক্ষায় জানা যায় যে, মার্স ভাইরাসে আক্রান্ত ৯২ শতাংশ রোগীর ফুসফুসের বাইরে কমপক্ষে একটি হলেও করোনা ভাইরাস প্রকাশিত হয়েছিল। সাইটোকাইনস প্রোটিন ইমিউন সিস্টেম বিপদ আশঙ্কা হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং আমাদের শরীর সংক্রমণের জায়গায় প্রতিরোধক কোষকে নিয়োগ করে। শরীরের বাকী অংশগুলি সংরক্ষণ করার জন্য প্রতিরোধক কোষগুলি তখন আক্রান্ত টিস্যুগুলোকে হত্যা করে। কিন্তু করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সময় আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা কোন নিয়ম ছাড়াই ফুসফুসে সাইটোকাইন ঢেলে দেয়, তখন আক্রান্ত কোষের সাথে সুস্থ কোষগুলোও অবাধে ধ্বংস হতে থাকে। ব্যাপারটি এরকম যে বন্দুক দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করার পরিবর্তে আপনি যেন একটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছেন। যখন সমস্যা দেখা দেয় তখন আপনার দেহ কেবল সংক্রমিত কোষগুলোকে লক্ষ্য করে না বরং স্বাস্থ্যকর টিস্যুতেও আক্রমণ করে। এর ফলে রক্তনালীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
লিভারঃ যখন একটি শক্তিশালী করোনা ভাইরাস শ্বাসযন্ত্রের সিস্টেম থেকে ছড়িয়ে পড়ে তখন আপনার লিভারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চিকিৎসকরা সার্স, মার্স এবং কভিড-১৯ এর প্রভাবে লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ইঙ্গিত পেয়েছেন। একবার ভাইরাসটি আপনার রক্ত প্রবাহে এলে এটি আপনার শরীরের যে কোন অংশে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে ভাইরাসটি খুব সহজেই আপনার লিভারে প্রবেশ করতে পারে এবং মারাত্মক ক্ষতিসাধন হতে পারে।
শরীর যাতে সঠিকভাবে কাজ করতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য লিভার বেশ কঠোর পরিশ্রম করে। এর প্রধান কাজ রক্ত থেকে পেট ছাড়ার পরে প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিষাক্ত পদার্থগুলো ছাঁকা এবং শরীরের জন্য ব্যবহারযোগ্য পুষ্টি উপাদান তৈরি করা। এটি পিত্ত তৈরি করে যা আপনার ক্ষুদ্রান্ত্রের মেদকে ভেঙে ফেলতে সহায়তা করে। এছাড়া লিভারে এনজাইম রয়েছে যা শরীরে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে গতি দেয়।
আপনার রক্তে যখন অস্বাভাবিক উচ্চমাত্রায় এনজাইম থাকে তাহলে এটি মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে এবং এর ফলে লিভারে আঘাত হতে পারে বা লিভারের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করতে পারে।
কিডনিঃ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে আমাদের কিডনিও মারাত্মক ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। কারন, সার্স রোগীদের ছয় শতাংশ এবং মার্স রোগীদের এক চতুর্থাংশ মারাত্মক কিডনির সমস্যায় পড়েছিল।
করোনার লক্ষণঃ
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, করোনা ভাইরাসের প্রথম লক্ষন হলো জ্বর, অবসাদ, পেশীতে ব্যাথা, শুকনো কাশি, শ্বাসকষ্ট ও শ্বাসনালীর রোগ (যেমন- ক্লোমনালীর প্রদাহ তথা ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়া) ইত্যাদি। কদাচিৎ মাথাব্যথা বা কফসহ কাশি হতে পারে। রোগীদের রক্ত পরীক্ষা করে দেখা গেছে এই ভাইরাসের কারণে তাদের শ্বেত রক্তকণিকার সংখ্যা হ্রাস পায়। এছাড়া যকৃৎ ও বৃক্কের (কিডনি) ক্ষতি হয়। সাধারণত এক সপ্তাহের আগ পর্যন্ত উপসর্গগুলি ডাক্তার দেখানোর মত জটিল রূপ ধারণ করে না। কিন্তু ২য় সপ্তাহে এসে ব্যক্তিভেদে অবস্থার দ্রুত ও গুরুতর অবনতি ঘটতে পারে। যেমন ফুসফুসের ক্ষতিবৃদ্ধির সাথে সাথে ধমনীর রক্তে অক্সিজেনের স্বল্পতা (হাইপক্সেমিয়া) দেখা দেয় এবং রোগীকে অক্সিজেন চিকিৎসা দিতে হয়। এছাড়া তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত উপসর্গসমষ্টি পরিলক্ষিত হয়। ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ রোগীকে ICU তে রেখে যান্ত্রিকভাবে শ্বাসগ্রহণ করাতে হয় এবং কখনও কখনও কৃত্রিম ফুসফুসের ভেতরে রক্ত পরিচালনার মাধ্যমে রক্তে অক্সিজেন যোগ করতে হয়।
কিভাবে ছড়ায় এই ভাইরাস?
চীনের উহান প্রদেশ থেকে আবিষ্কৃত হওয়া এই করোনা ভাইরাসটির আকার অপেক্ষাকৃত বড় আকারের। এর আকার প্রায় ১২৫ ন্যানোমিটার (অর্থাৎ ১ মিটারের প্রায় ১ কোটি ভাগের এক ভাগ)। আকারে বড় বলে এটি বাতাসে কয়েক ঘণ্টার বেশি ভাসন্ত অবস্থায় থাকতে পারে না এবং কয়েক ফুটের বেশী দূরত্বে গমন করতে পারে না। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের মতো এটিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শের মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে। বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের সময় মুখের হাঁচি, কাশি, লালা বা থুতু থেকে সরাসরি ভাইরাসটি এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে সংক্রামিত হতে পারে। অন্যদিকে জনসাধারণ্য স্থানে কোনও আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে বা ভাইরাসযুক্ত হাত দিয়ে ধরলে এবং সেখানে কোন সুস্থ ব্যক্তি স্পর্শ হলে তাহলে ওই সুস্থ ব্যক্তিও সংক্রমিত হয়ে থাকে। এভাবে এই ভাইরাসটি একজনের দেহ থেকে অন্যের দেহগে সংক্রমিত হয় এবং পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে।
করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা বা প্রতিষেধকঃ
যেহেতু এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর জন্য কোন প্রতিষেধক বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি সেহেতু চিকিৎসকেরা প্রাথমিকভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলেছেন এবং সেই সাথে বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাস থেকে বাচার জন্য কিছু প্রাথমিক ধাপ অনুসরণ করার পরামর্শ দিয়েছেনঃ
ক) মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।
খ) বার বার সাবান দিয়ে হাত ধৌত করতে হবে।
গ) হাত, নাক-মুখে বারবার নেয়া যাবে না বা ঘষাঘশি করা যাবে না।
ঘ) পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে এবং জনাকীর্ণ এলাকা এরিয়ে চলতে হবে।
ঙ) আক্রান্ত ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির সবকিছু ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে।
চ) জ্বর বা কাশি বেশি হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
চীনসহ পুরোবিশ্বের প্রায় ১১০টি দেশে করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে এবং এ তালিকায় বাংলাদেশও কিন্তু বাদ নেই। গত কয়েকদিন আগেই বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ৩জনের সন্ধান মিলেছে। যেহেতু এর কোন প্রতিষেধক এখনো আবিষ্কার হয়নি তাই সবাইকে উপরোক্ত পরামর্শগুলো মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।
