পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ১০টি মসজিদ

ইসলামের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল কুরআনের ভাষ্যমতে পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র স্থান হচ্ছে মসজিদ। আরবী শব্দ মসজিদ এর অর্থ হচ্ছে সিজদাহ দেয়ার স্থান অর্থাৎ যেখানে সিজদাহ দেয়া হয়। ইসলামের আবির্ভাবকাল থেকেই মসজিদ নির্মান করা এবং এই নির্মানকর্মে অসাধারণ সব কারুকার্য, অলঙ্করণ ও নকশাকে প্রাধান্য দেয়া মুসলিম সমাজের  একটি বিশেষ ঐতিহ্য। আর বিশ্বের এইসব সেরা মসজিদগুলোর ইতিহাস ও নির্মাণশৈলী নিয়ে আমাদের মনে কৌতুহলও রয়েছে বটে। চলুন তাহলে আজ জেনে নেয়া যাক দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যময়তা ও নির্মানশৈলীর দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ১০টি মসজিদ সম্পর্কে। 

মসজিদ আল হারামঃ

মসজিদ আল হারাম

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদ হলো মসজিদুল হারাম। ইসলাম ধর্মের পবিত্র স্থান ‘কাবা’ কে ঘিরে সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে এর অবস্থান। এর ভিতরের এবং বাইরের নামাজের স্থানসহ এর আয়তন ৩ লক্ষ ৫৬ হাজার ৮০০ বর্গমিটার বা ৮৮.২ একর। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই মসজিদটিতে প্রায় নয় লক্ষ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়ে। তবে হজের সময় এর পরিমাণ বেড়ে ৩০ লাখে পৌঁছায়। ১৯৫৫ সালের পর সৌদি বাদশাহ আব্দুল আজিজ মসজিদটির ব্যাপক সংস্কারকাজে হাত দেন। তার পরে বাদশাহ ফাহাদ হারাম শরিফের বাহিরের দিকে সংস্কার করেন। এখন পর্যন্ত এর নির্মান ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের অধিক হওয়ায় এটি বিশ্বের সবচেয়ে দামী স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবার শীর্ষে রয়েছে। ৯টি সুন্দর ও সুউচ্চ মিনার এবং ভবনটির চুড়ায় ৪৩ মিটার ফ্রেমে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ঘড়ি মসজিদ আল-হারাম’-কে অনন্য দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। বৃহত্তম এই ঘড়িটি দিয়ে ১০০ কিলোমিটার দূর থেকেও সময় জানা সম্ভব হয়।

মসজিদে নববীঃ

মসজিদে নববী

হজরত মোহাম্মাদ (সা) নিজ হাতে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন। মসজিদে নববি বা আল-মাসজিদুন-নাবি’র অর্থ হচ্ছে নবির মসজিদ। এই মসজিদেই ছিল রাসুল (সা)  এর বাসস্থান। সৌদি আরবের মদিনা শহরে অবস্থিত এই মসজিদটিতে ছয় লাখ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারে। তবে মসজিদটি হজরত মোহাম্মাদ (সা) রওজা সংলগ্ন হওয়ায় হজের সময় প্রায় ১০ লক্ষ মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করার রেকর্ড আছে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্বিতীয় সুন্দর মসজিদ এবং অনেকে বলেছেন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মসজিদও এটি। মসজিদের ১০টি মিনারের মধ্যে সবচেয়ে উঁচু মিনারটির উচ্চতা ১০৫ মিটার। 

মসজিদে নববীর এক অংশে রয়েছে রাসুল (সা) এর রওজা মোবারক এবং অন্য অংশে রয়েছে ইসলামের প্রথম খলিফা হজরত আবু বকর (রা) ও হজরত ওমর(রা) এর রওজা মোবারক। ১৮৩৭ সালে প্রথম এই মসজিদের গম্বুজটিতে সবুজ রং করা হয়।

মসজিদে আল আকসা , জেরুজালেম, ফিলিস্তিনঃ

মসজিদ আল আকসা

এটি মুসলমানদের প্রথম কিবলা মসজিদ। ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদটি সৌন্দর্য ও পবিত্রতার দিক দিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এই মসজিদটির অপর নাম বায়তুল মোকাদ্দাস। পবিত্র কাবাঘর নির্মাণের ৪০ বছর পর হযরত ইয়াকুব (আ) জেরুজালেমে আল আকসা মসজিদ নির্মান করেন । তারপর হযরত সুলাইমান (আ) এর পূননির্মান করেন । আয়াতাকার আল-আকসা মসজিদ ও এর পরিপার্শ্ব মিলিয়ে আকার ১,৪৪,০০০ বর্গমিটার তবে শুধু মসজিদের আকার প্রায় ৩৫,০০০ বর্গমিটার  এবং মুসল্লি ধারণক্ষমতা ৫০০০জনেরও বেশি। বর্তমান গম্বুজটি আজ-জাহির নির্মাণ করেছিলেন এবং এটি সীসার এনামেলওয়ার্ক আচ্ছাদিত কাঠ দ্বারা নির্মিত। মসজিদটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে মোট চারটি মিনার রয়েছে। প্রথম মিনারটি আল-ফাখারিয়া মিনার নামে পরিচিত যা ১২৭৮ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণপশ্চিম অংশে নির্মিত হয়। উল্লেখ্য যে, রাসুল (সা.) এই মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে মিরাজের সফরে গিয়েছিলেন। 

গ্রান্ড মসজিদে হাসান (দ্বিতীয়), মরক্কোঃ

গ্র্যান্ড মসজিদে হাসান

মসজিদটির পুরো নাম গ্রান্ড মসজিদে হাসান (দ্বিতীয়)। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদের তালিকাতে এটি সপ্তম স্থানে রয়েছে। আর পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকাতে এই মসজিদটির অবস্থান চতুর্থ। মরক্কোর সবচেয়ে বড় শহর ক্যাসাবালাঙ্কায় আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে অবস্থিত মসজিদটি। মসজিদটির অংশবিশেষ সমুদ্রের পানিতে ভাসমান। সমুদ্রের পাশে হওয়ায় একে ভাসমান মসজিদও বলা হয়। অনেকটা মোঘল স্থাপত্যের ওপর ভিত্তি করে ১৯৯৩ সালে নির্মিত এই মসজিদটির অবস্থান প্রায় ২১ হাজার বর্গমিটার জমির ওপরে। এটি বিশ্বের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উঁচু। এই মসজিদের একমাত্র মিনারটির উচ্চতা ২১০ মিটার, যা প্রায় ৬০ তলা ভবনের সমান! মসজিদটির মুসল্লি ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার।

সুলতান ওমর আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ , ব্রুনাইঃ

সুলতান ওমর আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ

এটি মূলত ব্রুনাইয়ের রাজকীয় বা কেন্দ্রীয় মসজিদ। ব্রুনাইয়ের ২৮তম সুলতান ওমর আলি সাইফুদ্দিনের নামে মসজিদটির নামকরণ করা হয়েছে সুলতান ওমর আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ। আধুনিক ইসলামী স্থাপত্যের অপূর্ব এই নিদর্শনটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৫৮ সালে। এশিয়া মহাদেশের মাঝে সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ এটি। আর বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকাতে পঞ্চম স্থানে রয়েছে সুলতান আলী সাইফুদ্দিন মসজিদ।

জহির মসজিদ, কেদাহ, মালয়েশিয়াঃ

জহির মসজিদ

মালয়েশিয়ার অন্যতম পুরানো ও ঐতিহ্যবাহী একটি মসজিদ এই জহির মসজিদ। ১৯১২ সালে মালয়েশিয়ার কেদাহ প্রদেশে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতান তাজ উদ্দীন মুকারম শাহের ছেলে টুংকু মাহমুদ এই মসজিদটি তৈরি করেছিলেন। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকার ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে এই জহির মসজিদ। উল্লেখ্য যে, মসজিদটির ৫টি গম্বুজ তৈরি করা হয়েছে ইসলামের ৫টি ভিত্তির ধারণায়।

ফয়সল মসজিদ, ইসলামাবাদ, পাকিস্তানঃ

ফয়সল মসজিদ

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মসজিদের তালিকাতে চতুর্থ স্থান অধিকারী মসজিদ এই ফয়সল মসজিদ এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অবস্থিত ফয়সাল মসজিদ পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ মসজিদ। মসজিদটি দেখতে অনেকটা মরুভূমির বেদুইনদের তাবুর মতো। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই মসজিদটি পাকিস্তানের জাতীয় মসজিদ। ১৯৮৬ সালে সমাপ্ত হওয়া মসজিদটির নির্মাণ ব্যয় বহন করেন সৌদি বাদশাহ ফয়সাল। আর তার নাম অনুসারেই মসজিদটির নামকরণ হয় ফয়সাল মসজিদ। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এটিই ছিল বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। এটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১২০ মিলিয়ন ইউএস ডলার। মসজিদটির ভেতরে ৫৪ হাজার স্কয়ার ফিট জায়গা রয়েছে আর ধারণক্ষমতা দুই লাখ। ৩০০ ফিট উচ্চতার চারটি সুন্দর মিনার মসজিদটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে। 

তাজুল মসজিদ, ভুপাল, ভারতঃ

তাজুল মসজিদ

এশিয়ার অন্যতম সুন্দর মসজিদ এবং ভারতের সর্ববৃহৎ মসজিদ এই তাজ-উল-মসজিদ। ভারতের ভুপালে অবস্থিত এই মসজিদকে কেন্দ্র করে এখানে বিরাট ইসলামী শিক্ষালয় গড়ে উঠেছে। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকার অষ্টম স্থানে রয়েছে এই মসজিদটি। এশিয়ার বৃহৎ মসজিদের তালিকাতেও এই মসজিদটির নাম রয়েছে। মোঘল সম্রাট বাহদুর শাহ জাফর এর শাসনামলে নবাব শাহ জাহান বেগম কর্তৃক নির্মিত হয় তাজ-উল মসজিদ। কিন্তু তিনি পুরোপুরি নির্মাণ কাজ শেষ করে যেতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে তার মেয়ে সুলতানা জাহান বেগম তার জীবদ্দশায় এর কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৭১ সালে পুনরায় নির্মাণ কাজ শুরু করেন আল্লামা মুহাম্মাদ ইমরান খান নদভী আজহারি ও মাওলানা সাইয়্যেদ হাসমত আলী সাহেব এবং ১৯৮৫ সালে নির্মাণ শেষ হয়। মসজিদটিতে তিনটি গম্বুজ ও দুটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মসজিদের ভেতর ও বাহিরে মিলে এক লাখ ৭৫ হাজার লোক একসাথে নামাজ পড়তে পারে।

বাদশাহী মসজিদ, লাহোর, পাকিস্তানঃ

বাদশাহী মসজিদ

পাকিস্তানের লাহোরের রাজকীয় বা কেন্দ্রীয় মসজিদ হিসেবে খ্যাত এই বাদশাহী মসজিদ। সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৬৭১ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন। এই মসজিদটি পাকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ও এশিয়ার পঞ্চম বৃহত্তম মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত। আর বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকাতে নবম স্থানে রয়েছে এই বাদশাহী মসজিদ। সামনের বিশাল চত্বরসহ মসজিদটির আয়তন প্রায় দুই লক্ষ ৭৬ হাজার স্কয়ার ফিট। মসজিদটিতে ১৯৬ ফিট উচ্চতার সুদৃশ্য আটটি মিনার রয়েছে। আর রয়েছে ৩টি গম্বুজ। সিড়ির ২২টি ধাপ পেরিয়ে মূল ফটকে পৌছাতে হয়। মসজিদটিতে সর্বোচ্চ ১লক্ষ মানুষ একসাথে নামাজ আদায় করতে পারে।

সুলতান মসজিদ , সিঙ্গাপুরঃ

সুলতান মসজিদ

১৮২৪ থেকে ১৮২৬ সালের মধ্যে এই মসজিদটি নির্মিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয়, বড় এবং সুন্দর মসজিদ হিসেবে বেশ সুনাম রয়েছে। মসজিদটি নির্মানলগ্ন থেকে আজ অবধি অপরিবর্তিত অবস্থায়ই রয়েছে। অর্থাৎ এটি প্রথম যেমনভাবে নির্মান করা হয়েছিল এখনো এটি সেভাবেই রয়েছে। এর ডিজাইনে কোন মৌলিক পরিবর্তন আনা হয়নি। জুমাবারে এই মসজিদে নামাজ আদায় করার জন্য প্রায় সকল সিঙ্গাপুরী মুসলিমরা ভির জমায়। বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদের তালিকায় এই মসজিদের অবস্থান রয়েছে ১০ নম্বরে।