মঙ্গল গ্রহে আমরা কতদিন পর্যন্ত বেচে থাকতে পারবো?

আজকাল প্রায় সবার মনেই মঙ্গল গ্রহ শব্দটি গেঁথে গিয়েছে।  নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে চায়, আর স্পেস এক্স চায় তারও আগে মঙ্গলের বুকে মানব কলোনি স্থাপন করতে।  মঙ্গল গ্রহ শব্দটি হলিউডের মুভি গুলোতেও প্লট হিসেবে একটি জনপ্রিয় থিম।  এসব মুভিতে সাধারণত- মঙ্গল গ্রহ যাত্রা কিংবা মঙ্গলে প্রাণের খোঁজ এবং এ নিয়ে গবেষণা- ইত্যাদি বিষয়বস্তু দেখানো হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে প্রশ্নটির দিকে কেউ নজর  দিচ্ছেন না সেটি হচ্ছে- একবার সেখানে পৌঁছে গেলে আমরা কত দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারবো।

মার্কিন গবেষকেদের মতে, মঙ্গল গ্রহের প্রতিকূল পরিবেশ ও সেখানে তৈরি করা অবকাঠামো বিবেচনায় নিলেও মাত্র ৬৮ দিন পর থেকেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে পড়তে হবে মানুষকে। আমরা সবাই জানি যে, মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডলের বেশিরভাগই  কার্বন ডাই অক্সাইড।  গ্রহের উপরিভাগের  মাত্রাতিরিক্ত ঠান্ডা আবহাওয়া  মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য এবং সেই সাথে এই গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ বল পৃথিবীর মাত্র ৩৮ শতাংশ।  এছাড়াও মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাত্র ১ %।  এই ব্যপারগুলো  আমাদেরকে মঙ্গলের মাটিতে পৌঁছানো কঠিন করে ফেলে।  তাহলে নাসা কিভাবে সেখানে মানুষ পাঠাবে?  আর কিভাবেই বা আমরা এ রকম প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে বেচেঁ থাকার আশা করতে পারি?  

যখন মঙ্গল এবং পৃথিবী খুব কাছাকাছি চলে আসে তখন সেই দূরত্বে পৃথিবী থেকে মঙ্গল যাত্রা করতে সময় লাগবে সাত মাস । সাত মাসের যাত্রার পর যখন আমরা মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলের ভেতর ঢুকে পড়বো, তখন সেই গ্রহের মাটিতে অবতরণ করাটাই আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জের হয়ে দাঁড়াবে।

নাসা এবং স্পেস এক্স এই দুটি সংস্থা মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার জন্য মহাকাশযান তৈরি করছে।  এই মহাকাশযানগুলোর ওজন কম করে হলেও ২০ টনের অধিক হবে। তাই এই  ল্যান্ডারগুলোকে অবতরণ করার জন্য বর্তমানের অনেক প্রযুক্তি কাজে দিবে না।  যেমন- এয়ার ব্যাগ,  স্কাই ক্রেন,  অথবা প্যারাসুট প্রযুক্তি।  তবে এ ক্ষেত্রে অবদানের জন্য জেট বিমান গুলো কাজে দিতে পারে। অর্থাৎ জেট বিমানের মতো কোনো এয়ারক্রাফট কে যদি সাথে করে নিয়ে যাওয়া যায় তাহলে মঙ্গলের পৃষ্ঠে অবতরণের জন্য সহায়ক হতে পারে। 

যাই হোক, ধরুন আমরা কোনোভাবে মঙ্গলের মাটিতে অবতরণ  করলাম। এখন আমাদের এখানে বসতি তৈরী করতে হবে। মঙ্গলে বসতি বানাতে হলে প্রথমত অনেক সমস্যারই সমাধান করতে হবে আমাদেরকে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পানি এবং অক্সিজেনের প্রয়োজন অপরিহার্য। তবে মঙ্গল গ্রহে যথেষ্ট পানি রয়েছে। মঙ্গল গ্রহের উত্তর ও দক্ষিন মেরুতে প্রচুর বরফ জমে আছে। অর্থাৎ মঙ্গল গ্রহের একদম ওপরে এবং একদম নিচের মাঝখানের অংশে বরফ জমে রয়েছে। যা গলিয়ে মানুষের প্রয়োজনীয় পানির অভাব পূরণ করা সম্ভব। তাছাড়াও বিজ্ঞানীদের ধারণা মঙ্গল গ্রহের মাটির নিচেও রয়েছে পর্যাপ্ত পানি। বিজ্ঞানীদের মতে, মঙ্গলকে বসবাস উপযোগী বানাতে হলে চারটি বিশেষ পরিবর্তন আনতে হবে।

প্রথমত, এর তাপমাত্রা বাড়াতে হবে, যাতে ঠান্ডায় জমে না যায়। 

দ্বিতীয়ত, বায়ুমন্ডলের চাপ বাড়াতে হবে, যাতে লিকুইড পানি সেখানে ধরে রাখা যায়। 

তৃতীয়ত, বায়ু পরিস্কার করতে হবে এবং অক্সিজেনের মাত্রা বাড়াতে হবে, যাতে খোলা বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া সম্ভব হয় এবং 

অবশেষে, ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে হবে যাতে সোলার রেডিয়েশন বা ডীপ স্পেস রেডিয়েশন থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

মঙ্গলগ্রহের বায়ুমন্ডল আমাদের পৃথিবীর মতো না। এর বায়ুমন্ডল খুবই পাতলা হওয়ার কারণে সূর্যের ক্ষতিকারক রশ্মি থেকে শুরু করে উল্কাপিন্ড আছড়ে পড়ার ঘটনা হরহামেশাই ঘটে থাকে। এর থেকে বাঁচার জন্য মানুষ মঙ্গল গ্রহের মাটির নিচে বসতি বানাবে। অথবা মঙ্গল গ্রহ থেকে পাওয়া আয়রন এবং সিলিকা দিয়ে ছাদের নির্মাণ করবে। যা ক্ষতিকারক রশ্মি ও বহিরাগত সমস্যা থেকে বাচাবে। 

মঙ্গলগ্রহের মাধ্যাকর্ষণও আমাদের পৃথিবীর মতো না। এর মধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর তুলনায় বাষট্টি শতাংশ কম। তাই এরকম পরিস্থিতিতে সেখানে মানুষ থাকলে তাদের হাড়গোর ভেঙ্গে পঙ্গু হয়ে যাবে। তবে এর সমাধান করা সম্ভব সেন্টিফিউজ সিটি তৈরী করার মাধ্যমে। অর্থাৎ যদি মঙ্গলের সব বাড়ি ঘরকে অনবরত ঘোরানো যায় তবে মহাকর্ষের মতই অনুভূতির সৃষ্টি হবে। তবে সেন্টিফিউজ সিটি থেকে মানুষ ওপরে তাকালে দেখবে আকাশ ঘুরছে আর এর ফলে অনেকের অনেক সমস্যার তৈরি হবে যেমন তারা বমি করা শুরু করবে। এ কারণেই এ সিটির ওপরে তৈরি হবে ছাদ এবং তার ফলে আকাশ ঘুরছে এটা আর দেখা যাবে না। 

মঙ্গলগ্রহে বসবাসের ক্ষেত্রে পরবর্তীতে যে সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হবে, তা হচ্ছে খাবার সমস্যা। পানি ও অক্সিজেন থাকার পরেও মানুষের খাদ্য তৈরির জন্য প্রয়োজন হবে সূর্যের আলোর। আর এই আলো পাওয়ার জন্য মানুষকে অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। এক্ষেত্রে মানুষকে গরমের সময় সোলার প্যানেল এর সাহায্যে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে রাখতে হবে এবং শীতকালে কৃত্রিম আলো দিয়ে ফুল ও ফলকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। 

মঙ্গল গ্রহে পৃথিবীর মতো নানান রকমের খাবার পাওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে যদি মঙ্গলগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপন সম্ভব হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে সেখানেই খাবার উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পৃথিবী থেকে বারবার রকেটের মাধ্যমে সেখানে খাবার পাঠানোটা অতিরিক্ত খরচের ব্যাপার।

সেখানে পানির খোজ পাওয়া গেলে কৃষিকাজ শুরু করে দেয়া যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে জীবাণু থেকে তৈরি করা হতে পারে খাবার। যে পদ্ধতিতে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে সবজি চাষের চেষ্টা চালানো হচ্ছে, সেই পদ্ধতি মঙ্গলেও ব্যবহার করা হতে পারে। মঙ্গলে বনায়নের জন্য, সিন্থেটিক বায়োলজি পদ্ধতি ব্যবহার করে- খাপ খাইয়ে নিতে পারে এমন বিশেষ গাছ তৈরি করে পারেন। কারণ সেখানে কম তাপমাত্রায় এবং কম সূর্যালোকে বেঁচে থাকতে হবে তাদেরকে। মঙ্গলের মাটিকে বিষমুক্ত করে উর্বর রাখার জন্য জীবানু ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে অনেক বছর আগে, মঙ্গলের তাপমাত্রা পৃথিবীর মতোই স্বাভাবিক ছিল। অর্থাৎ মানুষের বসবাসের উপযোগী ছিল। কিন্তু কোন এক কারনে এর বায়ুমন্ডল ধ্বংস হয়ে যায় আর এর তাপমাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন সংঘটিত হয়। তবে ব্যাপক পরিমাণে বোমাবর্ষনের মাধ্যমে আমরা মঙ্গলের সেই আগের তাপমাত্রা ফিরিয়ে আনতে পারি। অর্থাৎ আমরা আবার এর তাপমাত্রা মানুষের বসবাসের জন্য স্বাভাবিক করে তুলতে পারি। 

এছাড়াও যতদ্রুত সম্ভব মঙ্গলে অক্সিজেনের চাষ শুরু করে দিতে হবে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসার গবেষকেরা ইতিমধ্যে এমন একটি প্রকল্প নিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

কয়েক দশক ধরে মঙ্গল মানুষের কল্পনায় জায়গা করে নিয়েছে। এই মঙ্গল আমাদের মহাবিশ্ব ভ্রমনের প্রথম ধাপ মাত্র। একসময় আমাদের পায়ের আঙ্গুলগুলি সৌরজগতের বিভিন্ন জায়গায় ভর করে দাঁড়াবে। 

আমরা যারা আপোলো মিশন, স্পেস শাটল টেক অফ অথবা ফ্যালকন রকেটগুলিকে বায়ুমন্ডলে চড়তে দেখছি তারা সম্ভবত আমাদের জীবনকালে মঙ্গলে তৈরী করা একটি সফল উপনিবেশ দেখে যেতে পারবো না, তবে প্রত্যেকবার মহাকাশের উদ্দেশ্যে ছুটে যাওয়া রকেটগুলো আমাদের আশ্চর্যান্বিত করে, রোমাঞ্চিত করে। এগুলো কেবলমাত্র এক একটি রকেট নয়, আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস - যার মধ্যে একটি আমাদের নিয়ে মঙ্গল গ্রহের মাটিতে পা রাখবে।