কি হতো যদি পৃথিবী সমতল হতো?
ছোটবেলা থেকে আমরা বই-পুস্তক সহ সবখানেই জেনে এসেছি যে, পৃথিবী দেখতে একটা কমলালেবুর মত গোলাকৃতির। কিন্তু হাজার বছর আগের মানুষেরা ভাবতো যে পৃথিবী সমতল এবং সকল গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্রসহ সবকিছুই এর চারপাশে ঘোরাফেরা করছে অর্থাৎ পরিক্রমণ করছে। আবার আপনি জেনে অবাক হবেন যে, এই আধুনিক পৃথিবীতেও এমন একটি সোসাইটি আছে যারা বিশ্বাস করে যে পৃথিবী সমতল। আর তাদের সেই সোসাইটির নাম হচ্ছে ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটি। এই ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা পৃথিবী যে সমতল এটা শুধু নিজেরাই বিশ্বাস করে না বরং অন্যদেরও বোঝানোর চেষ্টা করে । এই সোসাইটির মতে পৃথিবী দেখতে একটা প্লেট এর মত। যার চারপাশ অ্যান্টার্কটিকার বিশাল বরফের দেয়াল দ্বারা আচ্ছাদিত। এবং তাদের মতে সেই বরফের দেয়াল সব সময় নাসা দ্বারা নজরদারি করা হচ্ছে।কিন্তু কি হবে যদি তারাই সঠিক হয়? সমতল পৃথিবীতে কি দিন থেকে রাত এবং রাত থেকে দিনের পরিবর্তন, ঋতুর পরিবর্তন, মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করে কিনা? এবং কিভাবেই বা গাছপালার বৃদ্ধি ঘটে? এসব অনেক প্রশ্নই তৈরী হয় যখন আমরা গোলাকার পৃথিবীকে চ্যাপ্টা থালার মতো করে চিন্তা করি।
প্রথমেই আলোচনা করা যাক সমতল পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করবে কিনা। পৃথিবী যদি সমতল হয় বা যদি পৃথিবী গোলাকার নাও হয় তবুও সমতল পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ বল কাজ করবে। পৃথিবীকে যদি একটি থালার মত ধরা হয় তাহলে সেই থালার মধ্যবর্তী অংশে মাধ্যাকর্ষণ বল কেন্দ্রীভূত হবে। তাই আপনি যদি সেই থালার পৃথিবীপৃষ্ঠের মধ্যবর্তী অংশে অবস্থান করেন বা কেন্দ্রের অবস্থান করেন তাহলে অনেকটা গোলাকার পৃথিবীর মতই আকর্ষণ অনুভব করবেন । কিন্তু যখনই আপনি কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকবেন পৃথিবী সমতল হওয়ার কারণে মাধ্যাকর্ষণ বল আপনাকে ততো বিপরীত দিকে আকর্ষণ করতে থাকবে। অর্থাৎ কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করতে থাকবে। ফলে আপনার হাঁটতে কষ্ট হবে এবং মনে হবে যেন আপনি ঢালু কোন পাহাড় বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করছেন। কেন্দ্র থেকে যত বেশি দূরে যেতে থাকবেন আপনার কাছে বাড়িঘর পাহাড়-পর্বত সবকিছু তীর্যকভাবে তৈরি বলে মনে হতে থাকবে। অর্থাৎ সবকিছুই আপনার বাঁকানো বলে মনে হতে থাকবে। এর কারণ হচ্ছে, আমরা যখন কোন বিল্ডিং বানাই বা গাছপালা রোপন করি তাহলে সেটি মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে বিপরীতমুখী হয়ে বাড়তে থাকে। তাই সমতল পৃথিবীতে যদি কোন গাছপালা লাগানো হয় বা কোন বিল্ডিং বানানো হয় তাহলে সেটিকে অবশ্যই মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতমুখী করেই বানাতে হবে। তা না হলে সেই বিল্ডিংটির দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হবে না। আর গাছপালাগুলো এই ভিডিও ফুটেজটির মতো করে বাঁকানো অবস্থায় থাকবে। আর সমতল পৃথিবীতে কোন বিল্ডিংকে মাধ্যাকর্ষনের বিপরীতমুখী করে বানাতে হলে অবশ্যই তাকে সোজা করে বানানো যাবে না, কেন্দ্রের উল্টোদিক করে অর্থাৎ পৃথিবীর প্রান্তের দিকে মুখ করে বানাতে হবে। এ নিয়ে যদি ফ্লাট এ্যার্থ সোসাইটির কাছে প্রশ্ন করা হয় তাহলে তারা বলে যে পৃথিবীতে মাধ্যাকর্ষণ বলে কোন কিছুই নেই। আসলে পৃথিবী ৯.৮ মিটার পার সেকেন্ড স্পিডে উপরের দিকে যাচ্ছে। তাই কোনো কিছুকে উপরের দিকে ছুড়ে দিলে তা মহাকর্ষের জন্য নিচের দিকে নেমে আসে না বরং পৃথিবীর নিজস্ব গতির জন্যেই বস্তুটি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে এবং এই সংগঠনের মতে আমাদের চাঁদ ,সূর্য আমাদের পৃথিবী থেকে লক্ষ লক্ষ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত নয় । এরা আমাদের পৃথিবী থেকে মাত্র ৪৮০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। তাদের মতে, আমাদের পৃথিবী নিজ অবস্থানে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে এবং সূর্য চাঁদ আমাদের পৃথিবীকে পরিক্রমণ করছে।
এবার আপনি যদি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে হাটতে হাটতে একেবারে প্রান্তে যেতে থাকেন তাহলে সীমানার বাইরে গেলে কি আপনি পৃথিবী থেকে ছিটকে যেতে পারেন? পৃথিবীর শেষ প্রান্তে যাওয়া আপনার পক্ষে কঠিন হতে পারে তবে অসম্ভব নয়।কারণ আমি আগেই বলেছি যে, কেন্দ্র থেকে বিপরীতমুখী ক্রিয়ার ফলে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে প্রান্তে পৌছানোটা আপনার কাছে পাহাড় বেয়ে ওঠার মতো কষ্টসাধ্য মনে হবে।
তারপরেও যদি আপনি কোনভাবে পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে এসে পৌছান, তাহলেও আপনি বাইরের মহাশূণ্যে ছিটকে পরবেন না। বরং কেন্দ্রের দিকে ভূমির সমান্তরাল আকর্ষণ শক্তির প্রভাবে আপনি ভেতরের দিকেই পৌছে যাবেন। কোনভাবে যদি আপনি থালার মতো চাকতির প্রান্তে উঠে যেতে পারেন, তাহলে সেটিকেই স্বাভাবিক মাটি বলেই মনে হবে আপনার। অর্থাৎ গোলাকার পৃথিবীর মতোই আপনি সেখানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবেন।
যেহেতু থালার মতো পৃথিবীর চাকতিটি সবকিছুকে তার কেন্দ্রের দিক বরাবর আকর্ষন করবে, তাই পৃথিবীর সব সাগর মহাসাগর মিলে পৃথিবী কেন্দ্রে এক বড় মহাসাগরের সৃষ্টি করবে এবং বাকি অংশ মাটি দ্বারা বেষ্টিত থাকবে। অর্থাৎ বাকী অংশ পানিশূন্য হয়ে মরুময় হয়ে থাকবে।
আমাদের পৃথিবী গোলক হওয়ার কারনে নিজ অক্ষের উপর আবর্তের ফলে দিবারাত্রি সংঘটিত হয়। কিন্তু পৃথিবী যদি সমতল হয়, তাহলে দিন বা রাত বলে আলাদা কিছুই থাকবে না। পুরো পৃথিবী একসাথে আলোকিত হবে। আবার যদি এই ভিডিও ক্লিপটির মতো করে সূর্য পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে তাহলে, সম্পূর্ণ পৃথিবীতে একসাথে দিন এবং একসাথে রাত সংঘটিত হবে। মানে এই গোলাকার পৃথিবীতে যেভাবে বাংলাদেশে দিন হলে আমেরিকাতে রাত হয় এবং আমেরিকাতে রাত হলে বাংলাদেশে দিন হয় তখন আর এভাবে দুটি স্থানের মধ্যে রাত দিনের তারতম্য থাকবে না।
পৃথিবী তার অক্ষের উপর তীর্যকভাবে হেলে থাকা অবস্থায় সূর্যের চারদিকে আবর্তন করার ফলে দিবারাত্রির হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে এবং ঋতু পরিবর্তিত হয়। কিন্তু পৃথিবী সমতল হলে ঋতুর কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। পুরো বছর জুড়ে পৃথিবীর সকল স্থান একই রকম সূর্যের আলো পাবে। ফলে গ্রীষ্মকাল, বর্ষাকাল বা শীতকাল বলে আলাদা আলাদা কোনো ঋতু থাকবে না। সমগ্র পৃথিবীর তাপমাত্রা মোটামুটিভাবে একই রকম থাকবে। উত্তর এবং দক্ষিণ মেরু নামে কিছু থাকবে না । তাই পৃথিবীর কোথাও কোনো বরফের অস্তিত্বও থাকবে না।
সূর্য, চাঁদ এবং পৃথিবী যখন একই সমান্তরালে আসে, তখন পৃথিবীর ছায়া চাঁদের উপর পড়লে সেটাকে আমরা চন্দ্রগ্রহণ বলি। আর চন্দ্রগ্রহনের সময় আমরা চাদের উপর পৃথিবীর গোলাকার ছায়া ই দেখতে পাই।
কিন্তু যদি পৃথিবী সমতল হয়, তাহলে চাঁদের উপর গোলাকার ছায়া পড়ার ঘটনাটি, অর্থাৎ পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ এর ঘটনাটি আর চোখে পরবে না ।
আর যদিও দেখা যায় তাহলে চাদের উপর গোলাকার পৃথিবীর ছায়া না পড়ে কেবলমাত্র একটি সরু দাগ দেখা যাবে। আর যদি পূর্ণগ্রহণ ঘটেও থাকে তাহলে তখনই ঘটবে, যখন এদের অবস্থান একই সমান্তরালে অবস্থিত হবে এবং একইসাথে সূর্যের অবস্থান হবে পৃথিবীর উপরি পৃষ্ঠের ঠিক বিপরীত দিকে থাকবে। অর্থাৎ শুধুমাত্র মাঝরাত্রেই পূর্ণগ্রহণ হবে।
আবার সমতল পৃথিবীতে যদি কোন গোলাকার বস্তু যেমন ফুটবলকে নিক্ষেপ করা হয় তাহলে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে সেটি সবসময় পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকেই ছুটে যেতে চাইবে।
তাহলে আমরা বুঝতে পারলাম যে পৃথিবী যদি গোলাকার না হয়ে সমতল হতো তাহলে এর স্বাভাবিক যে প্রক্রিয়া, যা আমরা বিজ্ঞানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছি তার ব্যাহত হতো। আমরা যারা প্লেন জার্নি করেছি, তারা পৃথিবী যে গোলাকার তার অনেকটাই অনুমান করে ফেলেছি।
পৃথিবী গোল বলেই সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়ালে দূর থেকে কোনো পালতোলা জাহাজ যখন আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তখন আমরা প্রথমে তার মাস্তুলের চূড়াটি দেখতে পাই, এরপর পুরো জাহাজটির বিভিন্ন অংশ উপর থেকে নিচ পর্যন্ত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে। কিন্তু সমতল পৃথিবীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ জাহাজ একসাথে এবং একই সময়ে দেখতে পাবো।
ফ্ল্যাট আর্থ সোসাইটির সদস্যরা পৃথিবীকে চ্যাপ্টা বলার অনেক কারন দেখালেও বৈজ্ঞানিকভাবে হাজারটা থিওরী আছে এটা প্রমাণ করার যে পৃথিবী আসলেই গোলাকার ।তাই পৃথিবী গ্লোব না হয়ে চ্যাপ্টা থালার মতো হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীন।
