পিরামিডের রহস্য


হাজার হাজার বছর ধরে মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম এক রহস্যময় নিদর্শন হলো পিরামিড। আজ থেকে প্রায় ৪৭০০ বছর আগে নির্মিত হলেও এটি এখনও বিজ্ঞানীদের মাথা ঘুরিয়ে দিচ্ছে। কীভাবে মিশরীয়রা এই অদ্ভুত সুন্দর ও রহস্যময় স্থাপনা তৈরি করল যা আধুনিক যুগে এসেও অসম্ভব বলে মনে হয়? হায়রোগ্লিফিক বর্ণে প্রাচীন মিশরের জীবনযাত্রা, সমাজব্যবস্থা, সংস্কৃতিসহ মিশরীয় সভ্যতার অনেক কিছুই পিরামিডের গায়ে লিখিত আছে। কিন্তু লিখিত নেই পিরামিড তৈরির পেছনের ইতিহাস নিয়ে কোন কথা। পিরামিড কেন তৈরী হলো? কিভাবে তৈরি হলো? এসবের কোন স্পষ্ট প্রমাণ রেখে যায়নি পিরামিড নির্মাতারা। এখন পর্যন্ত যেসব তথ্য ও তত্ব জানতে পারি তা শুধুমাত্র আমাদের আধুনিক প্রত্নতত্ত্ব গবেষকদের প্রচেষ্টা। আর সেসব তথ্য ও তত্ত্বগুলোকেই আমি আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব। 

মিশরকে নিয়ে কথা বলতে গেলেই সবার আগে চোখের সামনে ভেসে ওঠে পিরামিডের কথা। পিরামিড প্রাচীন পৃথিবীর সপ্তশ্চর্যের একটি। প্রাচীন মিশরে যারা শাসনকার্য পরিচালনা করতেন তাদেরকে বলা হতো ফারাও বা ফেরাউন। আর তাদের মৃত্যুর পর কবরের উপর নির্মিত সমাধিসৌধ গুলোকেই সাধারণত পিরামিড বলা হয়ে থাকে। মিশরীয়রা মনে করত, ফারাওরা মৃত্যুর পর মৃতদের রাজা হিসেবে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করে। তাই যতদিন তাদের দেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে ততদিন তারা স্বর্গে বাস করবে। তাই তাদের দেহকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে মমিকরন পদ্ধতির অনুসরণ করত। মৃত ফারাওদের দেহ মমি করার পর সেই দেহগুলোকে পিরামিডের ভেতরে সংরক্ষণ করে রাখত। এখন পর্যন্ত পিরামিড বানানোর উদ্দেশ্যকে এটাই ধারণা করা হচ্ছে। 

মিশরে ছোট বড় প্রায় ৮০ টি পিরামিড রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড়, আকর্ষণীয় ও রহস্যময় হচ্ছে গিজার পিরামিড যা খুফুর পিরামিড নামেও পরিচিত। আর এই পিরামিড টি তৈরী হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৪৭০০ বছর পূর্বে। 

খুফুর পিরামিডের উচ্চতা প্রায় ৪৮১ ফুট এবং ৭৫৫ ফুট জায়গার ওপর স্থাপিত। এটি নির্মাণ করতে এক লক্ষ শ্রমিকের প্রায় ২০ বছর সময় লেগেছিল এবং তৈরী করা হয়েছিল ২৩ লক্ষ বিশাল বিশাল পাথর খণ্ড দিয়ে যার প্রতিটি ব্লকের ওজন ছিল ৯০ টন করে। এই ব্লকগুলিকে প্রায় ৫০০ মাইল দূর থেকে পিরামিডের নির্মাণ স্থলে নিয়ে আসা হয়েছিল। খুফুর পিরামিডের আয়তন ৬টি ফুটবল মাঠের সমান এবং এর উচ্চতা একটি ৪২ তলা বিল্ডিংয়ের উচ্চতার সমপরিমাণ। এতো কিছুর পরেও ৫০০ মাইল দূর থেকে তারা কিভাবে ৯০ টন ওজনের পাথরের ব্লকগুলিকে টেনে আনলো আর কিভাবেই বা ৪২ তলা উচ্চতায় পাথর খন্ডগুলিকে ওঠালো তা আজও একটা রহস্য। তবে প্রত্নতত্ত্ব বিদরা এখন অনেক কিছুই অনুমান করে রেখেছেন যে কিভাবে তারা এটা সম্ভব করল যেখানে আজকের দিনে একটি বড়ো ক্রেন দিয়ে ২০ টন এর অধিক কোন বস্তুকে ওঠানোই সম্ভব না। তার মধ্যে পাথরগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে দুটি পাথরের মাঝখানে চুল পরিমাণ স্থান ফাঁকা নেই। 

পিরামিড তৈরীতে যে পাথরগুলো ব্যাবহার করা হয়েছিল সেগুলো সাধারণ পাথরের থেকে লক্ষ লক্ষ গুন বেশি মজবুত ও শক্তিশালী। বিজ্ঞানীরা এই পাথরগুলো নিয়ে অনেক রিসার্চ করেছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত কেউই নিশ্চিত হতে পারেন নি যে এগুলো কি। এগুলো দেখতে অনেকটা লাইম স্টোন এর মত। কিন্তু লাইম স্টোন নয়। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অন্য কোথাও আর এরকম কোন পাথর খুঁজে পায় নি। 

তবে বলা হয়ে থাকে চুনাপাথরের ব্লক দিয়ে বাইরের দেয়াল আর গ্রানাইড পাথর দিয়ে পিরামিডের ভেতরের দেয়াল তৈরী করা হয়েছে।  

খুফুর পিরামিডের ভেতরে ৩ টি চেম্বার রয়েছে। নিচের টা হলো বেইজ চেম্বার মাঝের টা কুইন্স চেম্বার আর একেবারে উপরের চেম্বার টি হচ্ছে কিংস চেম্বার। যদি আপনি উপরের কিংস চেম্বার দিয়ে প্রবেশ করেন তাহলে ভেতরে দিয়ে এই ৩ চেম্বারকেই এক্সপ্লোর করতে পারবেন আবার আপনি যদি একেবারে নিচের চেম্বার দিয়েও প্রবেশ করেন তাহলেও আপনি ৩টি চেম্বারকেই এক্সপ্লোর করতে পারবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউ এগুলোকে ঠিক করে এক্সপ্লোরই করতে পারে নি। ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৩ফুট প্রস্থে পাথর কেটে এই চেম্বারগুলোর প্রবেশ পথ তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও পিরামিডের ভেতরে অনাবিষ্কৃত অনেক কক্ষ রয়েছে যেগুলো এখনও এক্সপ্লোর করা সম্ভব হয়ে ওঠে নি।

পিরামিডের মধ্যে কিছু সুরঙ্গ রয়েছে যেগুলো বাইরে থেকে ভেতরে বাতাস আসা যাওয়ার জন্য ব্যাবহার করা হত বলে মনে করা হয়। কিন্তু পরবর্তী কালে এ ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হয়, যখন দেখা যায় সুরঙ্গের ভেতরে কিছুদূর যাওয়ার পর এর পথটি চুনাপাথরের দেয়াল দিয়ে বন্ধ পাওয়া যায়। 

খুফুর পিরামিডের পাশে আরও ২টি পিরামিড দেখা যায় যার মধ্যে একটি খুফুর পুত্র খাফরে এর কেফ্রেন পিরামিড আর তৃতীয় টি খাফ্রে এর পুত্র মেনকৌর দ্বারা নির্মিত মাইসারিনাস পিরামিড। খাফরে এর পিরামিড খুফুর পিরামিড এর দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত। এই তিনটি পিরামিডের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পিরামিড টি অর্থাৎ মেনকৌর এর পিরামিড টি প্রায় ৬৭ মিটার বা ২২০ ফুট উঁচু।

তবে আশ্চরযজনক তথ্য হচ্ছে এটা যে, গিজায় অবস্থিত এই ৩ টি পিরামিড আকাশের তারাদের সাথে এলাইনমেন্ট করা। অর্থাৎ ৩ টি পিরামিডের শীর্ষ বিন্দু আকাশের ৩ টি তারার সাথে যুক্ত আছে। এটা নিয়ে একটা থিওরী আছে যাকে ওরিয়ন কোরিলেশন থিওরি বলা হয়। আপনি যদি রাতে পিরামিডকে দেখেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে রাতের আকাশে পিরামিড একটি constellation বা নক্ষত্রের সাথে এলাইন্ড হয়ে আছে। মহাকাশের এই constellation কে বলা হয় অরিওন বেল্ট। এই বেল্টের মধ্যে ৩ টি প্রধান তারা আছে যেগুলো নাম হচ্ছে Alnitak, Alnilam, Mintaka. পিরামিডের পজিশন ওই ৩ টি তারার সাথে মিল রেখে সাজানো আছে। পিরামিডের সাথে এই এলাইন্মেন্ট একমাত্র আকাশ থেকেই করা সম্ভব ছিল। কিন্তু সেই ৪৭০০ বছর আগে তারা কিভাবে এটা ভু-পৃষ্ঠে দাড়িয়ে সম্ভব করেছিল তা আজও একটা রহস্য।

আপনি কি জানেন যে, এই পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল কোথায় অবস্থিত? হ্যা, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল ওই গিজাতেই অবস্থিত যেখানে খুফুর পিরামিড তৈরি করা আছে। কিন্তু হাজার হাজার বছর আগে তারা এটা কিভাবে নির্ণয় করেছিল যেখানে আগেকার দিনে মানুষ ভাবত যে পৃথিবী গোলাকার নয় চ্যাপ্টা ছিল। আরো একটি অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এই পিরামিডের একটি পার্ট নর্থ পোলের এলিমেন্ট এ আছে। যদি পিরামিডের সেন্টার থেকে একটি arrow চিহ্ন করা হয় তাহলে সেটা একেবারে নর্থ পোলের সাথে গিয়ে মিলবে।

আমরা সবাই জানি পিরামিড মিশরে অবস্থিত গিজার উত্তপ্ত মরুভূমির প্রান্তরে অবস্থিত। বাইরের আবহাওয়া সারাবছর যেমনই থাকুক না কেন অর্থাৎ গরম ও শীত যা ই পড়ুক না কেন পিরামিডের ভেতরের তাপমাত্রা সর্বদা ২০ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকে। আর এই তাপমাত্রাকে ই পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক ও এভারেজ তাপমাত্রা ধরা হয়। 

আধুনিক পাথর কাটার প্রযুক্তির সাথে পিরামিডের পাথর কাটার প্রযুক্তির আশ্চরযজনক মিল পাওয়া যায়। কারণ, সেসময় এতো টন ওজনের পাথরগুলো কেটে কেটে যেভাবে নিখুঁত ব্লক তৈরী করা হয়েছিল সেটা আজকের যুগেও এত নিখুঁত ভাবে করা সম্ভব নয়। 

আর এতো হাজার বছর পরেও পিরামিডের অনড়ভাবে দাড়িয়ে থাকার মূল কারণ হচ্ছে এর ভিত্তি প্রস্তর বল এন্ড সকেট কাঠামোতে বানানো হয়েছিল। যা উচ্চতা, ভূমিকম্প বা বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও ঠেকিয়ে দিয়ে সক্ষম।

কিন্তু ঠিক কি উদ্দেশ্যে তৈরী করা হয়েছিল শক্তিশালী, মজবুত ও রহস্যেঘেরা এই পিরামিড? প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা নিয়ে ঘাটাঘাটি করে যতটুকু জানতে পারা যায়, জীবনকে যাতে ভালোভাবে উপভোগ করা যায় সবসময় সেই চিন্তায় নিমগ্ন থাকতো প্রাচীন মিশরিয়রা। ব্যক্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করে যে ব্যাক্তি যতোটা গুরুত্বপূর্ণ সে ব্যাক্তির জন্য এ কাজের গুরুত্ব ততটাই বেড়ে যেত।  পরবর্তী জীবনের আরাম-আয়েশের জন্য স্বভাবতই ফারাওদের ব্যাপারে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিলো সেসময়। প্রত্যেক ফারাও ই চাইতেন বিশাল আয়তনের হবে তার সমাধিক্ষেত্র। অনেকেই মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত সমাধিক্ষেত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যেত। এবং যখন তাদের মৃত্যু হতো তখন তাদের দেহকে অতি যত্ন সহকারে মমিকরন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃতদেহ সংরক্ষণ করত। কারণ তারা মনে করত যে, মৃত্যুর পরও তাদের আত্মা বেঁচে থাকে। কিন্তু যদি তাদের দেহে পচন শুরু হয় বা কোনও আঘাতলাগে তাহলে অনন্ত জীবন থেকে বঞ্চিত হবেন। তাতে সুর্য ধ্বংস হবে আর পৃথিবীতে নেমে আসবে মহাপ্রলয়। তাই মৃত্যুর পর তাদের দেহকে মমি বানিয়ে পচন রোধ করে নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য স্থানে রাখার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছিল পিরামিড। প্রাচীন মিশরে এই মমি প্রথার ইতিহাস ছিল বেশ প্রসিদ্ধ। মমির ইতিহাস ও কিভাবে মৃতদেহকে মমি করার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা হতো তা জানতে নিচের ভিডিওটি দেখতে পারেন।

পিরামিডের সামনে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটি হয়ত আপনি এর আগেও কখনো দেখেছেন। এই ভাস্কর্যটি কে বলা হয়ে থাকে The great sphin. এটা এমনই একটা মনুমেন্ট যার শরীরের অংশ সিংহের মতো হলেও মাথার অংশটি মানুষের মতো। এর আকৃতি ৭৩.৫ মিটার লম্বা এবং মুখমন্ডলটির উচ্চতা প্রায় ২০ মিটার। বিভিন্ন আধুনিক গবেষণার সাহায্য নিয়েও এখন পর্যন্ত এর ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য জোগাড় করা সম্ভব হয় নি। তবে এটা জানা যায় যে, ভাস্কর্যটি খণ্ড খণ্ড পাথর টুকরা দিয়ে বানানো হয়নি। বরং বড় একটি লাইম স্টোন কে খোদাই করে একে এরকম আকৃতি দেওয়া হয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে এটি মাটির নিচে ডুবে ছিল এবং ১৯০০ সালে প্রথবারের মতো একে এক্সপ্লোর করা হয়। 

পিরামিডের আশ্চরযজনক নির্মাণ শৈলী, অসম্ভব নির্মাণযজ্ঞ, মহাকাশের নক্ষত্রের সাথে এলাইন্মেন্ট, নর্থ পোলের সাথে মিলন, ন্যাচারাল এসি ও অত্যাধুনিক টেকনোলজির ব্যবহার। এতো কিছু জানার পর আপনার আমার সবার মনে একটা প্রশ্ন আসা খুবই স্বাভাবিক। আর সেটা হচ্ছে এই পিরামিড আসলে কারা তৈরী করেছে। এতো আধুনিক প্রযুক্তি তারা কোথা থেকে এবং কিভাবে পেয়েছিল। 

বর্তমান যুগের স্থাপত্য প্রকৌশল ও টেকনোলজি যদি ৪ হাজার ৭০০ বছর পূর্বে দেখা পাওয়া তাহলে সেটা নিতান্তই ভৌতিক বলে চালিয়ে দেয়াটা দোষের কিছু হবে না। সত্যি বলতে আজকের যুগেও কেউ এতো বড় স্থাপত্য কলা নির্মাণের সাহস দেখাতে পারেনা। তাহলে তারা কিভাবে এটা সম্ভব করেছিল? তাও আবার ৪,৭০০ বছর আগে? অনেকে মনে করে মিশরীয়রা ভিনগ্রহের প্রাণীদের সাহায্য নিয়েছিল পিরামিড তৈরী করতে অথবা ভিন গ্রহের প্রাণীরাই তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে নিজেরাই এটা তৈরী করেছিল। এ ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব বিদরা কিছু চিত্রকর্মেরও দেখা পায় যা থেকে তারা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল। তবে এটা নিয়ে আজ নয়। পরবর্তী পর্বে আমরা বিস্তারিত ভাবে পিরামিডের আরো গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করবো। বের হবো পিরামিডের ভেতরকার আরো কিছু রহস্যের খোঁজে। সে পর্যন্ত সবাই ভালো থাকুন ও সুস্থ থাকুন।