পৃথিবীতে এমন অনেক ভূতুড়ে ঘটনা ঘটে যার কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই কারণেই হয়ত মানুষ ভূতে বিশ্বাস করে। যুগের পর যুগ ধরে মানুষের ভূতের বিশ্বাসের পেছনে অনেক কারনই রয়েছে। এর মধ্যে লৌকিক কাহিনী, ভূতসাহিত্য এবং সিনেমায় চিত্রায়ন উল্লেখযোগ্য। তবে ভূতসাহিত্য কিংবা সিনেমার পর্দার বাইরে বাস্তব জীবনেও ভূতকে ঘিরে অনেক কিছু ঘটে। পৃথিবীতে এমন অনেক জায়গা রয়েছে যেগুলোকে ভৌতিক বা অভিশপ্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরকমই ১০টি জায়গা নিয়ে বিগত দুটি পর্বে আমি আলোচনা করেছি। আজ এর ৩য় পর্ব বা শেষ পর্বে আরো ৫টি রোমহর্ষক পরিত্যক্ত স্থান সম্পর্কে আলোচনা করবো। তাহলে চলুন শুরু করা যাক।
5) Rubi, Arizona
অ্যারিজোনার সবচেয়ে ভুতুরে শহরগুলির মধ্যে একটি এই রুবি শহরটি। প্রথমে এখানকার অধিবাসীরা এখানে এসেছিল মূলত খনিজ সরাবরাহের কাজের জন্য। কিন্তু ১৮০০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে এখান থেকে সোনা, রূপা, তামা এবং দস্তা আবিষ্কার হয়। এরপর জুলিয়াস এন্ড্র্যুস নামের এক ব্যাক্তি এই শহরে একটি পোষ্ট অফিস খোলেন এবং তার স্ত্রীর নামে শহরটির নাম দেন রুবি। বিভিন্ন সম্যে বিভিন্ন কারনে শহরটি সহিংসতার শিকার হতে থাকে। অবশেষে শহরটি থেকে খনিজ সীসা ও দস্তা সরাবরাহ শেষ হয়ে গেলে ১৯৪১ সালে পোষ্ট অফিসটি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে রুবি একটি মালিকানাধীন শহর।
4) Kolmanscop
 |
|
দক্ষিণ নামিবিয়ার নামিব জেলায় অবস্থিত পরিত্যক্ত এই শহরটির নাম কোলম্যানস্কোপ। লডেরিটজ দ্বীপ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে মরুভূমির মধ্যে এই ‘ভূতের শহর’ এর অবস্থান। প্রায় ১০০ বছর আগে এই শহরের মাটির নীচে ছিল হীরের আকর। বাসিন্দারা বালি খুঁড়ে হীরে সংগ্রহ করতেন। বর্তমানে পরিত্যক্ত কোলম্যানস্কোপ সংরক্ষিত এলাকা হিসাবে চিহ্নিত। একমাত্র সরকারী অনুমতি নিয়েই এখানে প্রবেশ করতে হয়। ১৯০৮ সালে এই কোলম্যানস্কোপে জাচারিয়াজ লেয়ালা নামের এক রেলকর্মী কাজ করতে গিয়ে মাটির নীচ থেকে একটি হীরে খুঁজে পায়। হীরেটি নিজের মালিক অগস্ট স্টাচকে দেখান লেয়ালা। জার্মান রেল ইনস্পেকটর অগস্ট আন্দাজ করেন কোলম্যানস্কোপের নীচে রয়েছে হীরের খনি। এরপর থেকেই এই অঞ্চলে ঘাঁটি গাড়তে থাকেন জার্মান ব্যবসায়ীরা। এর অল্প দিন পরেই জার্মান সরকার এই এলাকাকে সংরক্ষিত ঘোষণা করে হীরে উত্তোলনের কাজ শুরু করে। একটা সময় বিশ্বের মোট উত্তোলিত হীরের ১২ শতাংশই পাওয়া যেত কোলম্যানস্কোপ থেকে। আস্তে আস্তে তৈরি হয় গোটা শহর। তৈরি হয় বাড়ি-ঘর, স্কুল, হাসপাতাল, কারখানা, পাওয়ার স্টেশন, থিয়েটার হল, পোস্ট অফিসহ আরো অনেক কিছু। জার্মানদের হাত ধরে ধীরে ধীরে উন্নত হতে থাকে এই ছোট্ট শহরটি। কিন্তু সেই সু-সময় বেশিদিন চলেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যেতে থাকে কোলম্যানস্কোপের হীরের ভাণ্ডার। বাসিন্দারাও একে একে চলে যেতে থাকেন। ১৯৫৪-তে সম্পূর্নভাবে পরিত্যক্ত হয় কোলম্যানস্কোপ। তবে এখনও পর্যটকদের কাছে বড় আকর্ষণ এই শহর।
3) Craco, Italy
ইতালির একটি অনিন্দ্যসুন্দর শহর ছিল ক্র্যাকো। শহরটিকে আধুনিক সময়ের একটি দুর্গনগরী বলা যায়। কারন নিরাপত্তাজনিত কারণে শহরটিকে একটি ক্লিফের ওপর তৈরি করা হয়।
আর নিরাপত্তার বিষয়টি স্পষ্ট করে বললে বলতে হবে মূলত দস্যুদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য শহরটিকে এমন একটি বেসের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল যেটি আসলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল না। ফলে এই নিরাপত্তাজনতি অতিরিক্ত সতর্কতাই শেষ পর্যন্ত শহরটির জন্য কাল হয়ে দাঁড়াল। এর মধ্যেই কৃষিক্ষেত্রে শহরটির অনগ্রসরতা ১৮৯২ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত শহরটির মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। শহরের অধিবাসীরাও বিকল্পের সন্ধানে উন্মুখ হয়ে উঠেন। কয়েকটি ভূমিকম্প এবং ভূমিধসের পর শহরটির পতন ত্বরান্বিত হয়। এরপর শহরবাসীরা সমতল ভূমিতে নেমে আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে রয়েছে। বর্তমানে পরিত্যক্ত এই শহরটির আকর্ষণ হলো পুরনো একটি গির্জা সান্টা মারিয়া।
2) Houtouwan
 |
|
সাংহাইয়ের উপকূল থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরত্বে শেঙশান দ্বীপে প্রায় ৫০০ বর্গ কিলোমিটারের ছোট্ট একটি গ্রাম হাওটাওওয়ান। পুরোপুরি সবুজে ছাওয়া গ্রামটি দীর্ঘদিনই ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। গ্রামটির ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট সবই সবুজ গাছপালায় ঢেকে গিয়েছে। বিশ্ব উষ্ণায়ণ ও মাত্রাছাড়া দূষণ যখন সবুজ প্রকৃতিকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে, এই রকম একটা গ্রামের ছবি দেখে বিস্ময় হতবাক গোটা বিশ্ব। চারদিকে পাহাড়ে ঘেরা গ্রামটি ১৯৫০ সালে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এক সময় প্রায় তিন হাজার মানুষের বাস ছিল এই গ্রামে। তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই ছিলেন পেশায় জেলে। শহরাঞ্চল থেকে অনেকটাই দূরে প্রান্তিক এই গ্রামটিতে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল একেবারেই অনুন্নত। সেই সঙ্গে খাবার ও পানীয় জলের জন্যও গ্রামবাসীদের অনেক দূরে পাড়ি দিতে হত। একদিকে পাহাড়ে ঘেরা রুক্ষ পরিবেশ, অন্যদিকে জীবনধারণের নানা অসুবিধার মুখোমুখি হয়ে একে একে গ্রামবাসীরা তাঁদের ভিটেমাটি ছাড়তে শুরু করেন। শোনা গিয়েছে, কাজের সূত্রেও জেলে পরিবারের অনেকে তাঁদের ভিটে ছেড়ে শহরে পাড়ি দেন। ১৯৯০ সাল নাগাদ হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার ছাড়া গোটা গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ বাড়িই পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, পরিত্যক্ত বাড়িগুলিতে ধীরে ধীরে ডালপালা বিস্তার করতে শুরু করে গাছগাছালি। সমস্ত বাড়িগুলির গা বেয়ে উঠতে থাকে আঙুর গাছ। এক সময় দেখা যায় গোটা গ্রামটিই সবুজে আবৃত হয়ে গিয়েছে। ঘরবাড়ি, দালান, উঠোন কোনও কিছুই বাকি নেই। গ্রামের আদি বাসিন্দাদের দাবি, উপযুক্ত খাদ্য, পানীয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবেই তাঁরা শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল গ্রামটি। যাঁরা থেকে গিয়েছিলেন তাঁরাও অনেকটা দূরে পাহাড়ের উপর আশ্রয় নিয়েছিলেন। লোকজনের বাস থাকায় গ্রামটির নাম হয়ে যায় ‘ভূত গ্রাম’।
1) Ufo City
এখানকার এই অদ্ভুত স্থাপনাগুলো মূলত পর্যটকদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে, তাইপের ঠিক বাইরে অর্থাৎ তাইওয়ানের উত্তর উপকূলে “বিজারো সানঝি ইউএফও হাউজ প্রজেক্ট” নামে এই প্রজেক্টের কাজ শুরু হয়। কাজ চলাকালীন সময়ে এখানে একাধিক এক্সিডেন্টসহ একটি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। যার ফলে প্রজেক্টটির কাজের অগ্রগতিতে বিশাল বাধার সম্মুখিন হতে হয়। বেশ কিছু স্থানীয়দের দাবী ছিল এখানে সপ্তদশ শতাব্দীর ডাচ সৈনিকদের কবর ছিল। তাদের আত্মাই নাকি বারবার এরকম দূর্ঘটনা ঘটানোর একমাত্র কারন এবং সেই সাথে এটাও দাবী ছিল যে প্রবেশমুখে থাকা বড় আকারের ড্রাগনমূর্তিটিকে যেন ধ্বংস করে দেয়া হয়।
১৯৮০ সাল নাগাদ, অবশেষে বাধ্য হয়ে এই প্রজেক্টটির কাজ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং তারপর থেকেই এটি আজ অব্দি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।