পৃথিবীর পরিত্যক্ত ও ভুতুরে শহরগুলির গল্প (১ম পর্ব)

পৃথিবীর অনেক শহরই আছে, যেগুলো চলতি থাকা অবস্থাতেই পরিস্থিতির শিকার হয়ে পরিত্যক্ত হতে বাধ্য হয়েছে অর্থাৎ সেই শহরের সবাই তাদের নিজেদের শহর থেকে চলে গিয়েছে। সেই শহরগুলোকে আমরা ইংরেজীতে বলি Abandoned City। কিছু কিছু শহর দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে, আবার কিছু কিছু শহর প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য কারনে জনশূন্য হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই পরিত্যক্ত শহরগুলো এখনো যেন নিরবে কেঁদে চলে। আজ আমি আপনাদের নিয়ে যাব এরকমই ৫টি পরিত্যক্ত শহরে এবং খুজে বের করবো সেইসব শহর জনশূন্য হয়ে ঘোষ্ট টাউনে পরিনত হওয়ার পেছনের রহস্য। পৃথিবীর পরিত্যক্ত শহরগুলো নিয়ে আমি বেশ কয়েকটি আর্টিকেল আনবো।  সে লক্ষ্যে আজ লিখছি এর প্রথম পর্ব।

5) Pripyat, Ukrane

১৯৮৬ সালে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে এই শহরটিতে সর্বোচ্চ ৪৯,৩৬০ জন মানুষ বসবাস করতো। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নবম পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হিসেবে ১৯৭২ সাল থেকে 'চেরনোবিল নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট' তৈরির কাজ শুরু হয়। আর এই নির্মাণ কাজের স্বার্থে এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে সচল রাখার জন্য পাশেই প্রিপিয়াট নামের এই পরিকল্পিত শহরটি গড়ে তোলা হয়।

১৯৮২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর চেরনোবিল পাওয়ার প্লান্টের এক নাম্বার চুল্লিতে একটি ছোটখাট দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এটি খুব দ্রুত সারিয়ে ফেলা হয় এবং ঘটনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। এরপর ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলে চার নম্বর চুল্লিতে একটি বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটে। এর ফলশ্রুতিতে চুল্লির তাপমাত্রা খুব তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং ভিতরে বিস্ফোরণ ঘটতে থাকে। ধীরে ধীরে বিশাল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ বায়ুমণ্ডলে মিশে যায় আর চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। 

মানব শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ার কারণে অতি নিকটবর্তী প্রিপিয়াট শহরের সকল মানুষকে মাত্র ২ দিনের মধ্যেই শহর থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। ফলে পঞ্চাশ হাজার মানুষের শহরটি জনশূন্য হয়ে একটি ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয় যা আজো একটি ভুতুরে শহর হিসেবেই রয়ে গেছে।

4) Ordos City

চীনের মঙ্গোলিয়ায় অবস্থিত জনমানবহীন এই শহরটির নাম ওরডস, যাকে মানুষ ভুতুরে শহর হিসেবে চেনে। নির্মানের সময় অবশ্য এরকম কিছু হওয়ার ক্থা স্বপ্নেও চিন্তা করেননি এর নির্মাতারা। সে সময় প্রায় ১ মিলিয়ন মানুষের বসবাসের জন্যি তৈরী হয়েছিল এই শহরটি। কিন্তু সেগুলোর মাত্র ২শতাংশ স্থানই মানুষ বসবাস করেছিল। আজ থেকে ২০বছর আগে মঙ্গোলিয়া আর ভবিষ্যতের কথা ভেবে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে তৈরী হয় বিশাল বিশাল সব দালান ও হাজার হাজার ফ্ল্যাট। কিন্তু সবকিছু স্থবির হয়ে যায় যখন কিছুদিন পর এই স্থানের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কমে যায়। একে একে চলে যাতে থাকে ওরডস ছেড়ে। আর ফেলে রেখে যায় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই দালানগুলোকে। আর কোন উপায় না দেখে বিনিয়োগকারীরাও কিছুদিনের মধ্যে স্থানটি ত্যাগ করে। মাত্র পাচ বছরের ব্যবধানে এই এখানকার প্রতি বর্গফুট জায়গার দাম নেমে আসে সর্বোচ ৪৭০ ডলারে। তবে কোন কিছুতেই লাভ হয়নি। ভুতুরে শহর সেই ভুতুরেই রয়ে গেছে।

3) Hashima Island

দক্ষিণ জাপানের নাগাসাকি শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই হাশিমা আইল্যান্ড। ১৮১০সালে ওখানে সমুদ্র তলদেশে বিপুল পরিমাণ কয়লার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ১৮৯১ থেকে ১৯৭৪ সালের মধ্যে ওই খনি থেকে ১.৫৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলন করা হয়।

কয়লা উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ওই দ্বীপে জনবসতি গড়ে উঠতে থাকে। ধীরে ধীরে অনেক বিল্ডিং, স্কুল, হাসপাতাল, দোকানপাট ইত্যাদি গড়ে উঠে এবং হাশিমা আইল্যান্ড একটি ছোটখাটো শহরের রূপ ধারণ করে। ৫২৫৯ জন মানুষ নিয়ে ১৯৫৯ সাল নাগাদ এই দ্বীপের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। 

চিন ও কোরিয়ায় জাপানি আগ্রাসনের সময় বহু চিনা ও কোরিয়ান বন্দিকে ওই খনিতে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য করা হতো। ওই সময় প্রায় ১৩০০ বিদেশি শ্রমিক অপুষ্টি, বিভিন্ন দুর্ঘটনা ও অত্যাচারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। 

একটা সময় এখানে কয়লার মজুত শূন্য হয়ে যায় এবং ১৯৭৪ সাল নাগাদ এই কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলে হাশিমা দ্বীপের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় ও মানুষ এই দ্বীপ ছেড়ে চলে আসতে থাকে। ধীরে ধীরে দ্বীপটি একটি ভুতুড়ে শহরে পরিণত হয়। তবে জাপানের ঐতিহাসিক হাশিমা দ্বীপ ২০১৫ সালে ইউনেস্কো কর্তৃক 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে'র মর্যাদা লাভ করে।

2) Bodie

প্রায় দশ হাজার জন বাসিন্দার বডিই শহরটির অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। ১৮ শতকের শেষের দিকে সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহরগুলোর একটি  ছিল এই বডিই শহর । সোনার খনি থাকার কারণে শহরটিকে সবাই আধুনিক শহর হিসেবেই জানতো এবং সেই কারনে সর্বাদা জমজমাটও থাকতো শহরটি। এখানে ৬০টি অভিজাত সেলুনসহ ছিল হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু স্বর্ণের খনি থাকার ফলে শহরটিতে প্রায়সময়ই ডাকাতি ও হত্যাযজ্ঞ চলতো। পরবর্তীতে এখানকার সোনার খনি পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর ১৯৪২ সাল থেকে শহরটিও পরিত্যক্ত বলে গণ্য করা হয়। তবে পরিত্যক্ত এই শহরটি বর্তমানে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া আছে।

1) Kayakoy, Turkey

তুরস্কে অবস্থিত কায়াকয় শহরটি অন্যান্য পরিত্যক্ত শহরগুলোর থকে আলাদা। কারণ এই শহরটিতে এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে যুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতি। গ্রিক এবং তুরস্কের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকেই শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। সময়ের হিসাবে বলা চলে ১৯২৩ সাল থেকেই জমজমাট কায়াকয় পরিণত হয় মৃত নগরীতে। পরিত্যক্ত হলেও বর্তমানে ৫০০ এর মতো দালান এবং কয়েকটি চার্চের ধ্বংসাবশেষ এখনো টিকে আছে। যা ওই সময়ের উজ্জ্বল দিনগুলোর স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।