বঙ্গবন্ধুর সারাজীবন (শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী)

হাস্যজ্জল শেখ মুজিব (ছবিঃ পিন্টারেস্ট)

১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে রোজ মঙ্গলবার রাত ৮টায় যে শিশুর জন্ম হয় পরবর্তীকালে তিনিই হন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্রষ্টা এবং বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ লুৎফর রহমান ও মোসাম্মৎ সাহারা খাতুনের চার কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন তৃতীয়। মা-বাবা আদর করে তাকে খোকা বলে ডাকতেন। আর এই খোকার শৈশব কাটে টুঙ্গিপাড়ায়। ১৪ বছর বয়সে বেরিবেরি রোগে আক্রান্ত হলে তার একটি চোখ কলকাতায় অপারেশন করা হয় এবং তারপর থেকে তিনি চশমা ব্যবহার করা শুরু করেন। চক্ষুরোগে চার বছর শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পর শেখ মুজিব পুনরায় স্কুলে ভর্তি হন। ১৮ বছর বয়সে বঙ্গবন্ধু বেগম ফজিলাতু্ন্নেসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করেন এবং তারা দুই কন্যা শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা ও তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও শেখ রাসেল এর জনক-জননী হন। ১৯৪০ সালে শেখ মুজিব নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনে যোগদান করেন এবং এক বছরের জন্য বেঙ্গল মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তাকে গোপালগঞ্জ মুসলিম ডিফেন্স কমিটির সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। 

১৯৪২ সালে তিনি এস.এস.সি পাস করেন এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মানবিক বিভাগে ইন্টারমিডিয়েট ক্লাসে ভর্তি হন। বঙ্গবন্ধু ওই বছরেই পাকিস্তান আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং পরের বছর মুসলিম লীগের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। 

১৯৪৭ সালে তিনি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন। তার পরের বছরই ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন এবং ৪ জানুয়ারি মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন আইন পরিষদে ‘পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেবে’ বলে ঘোষণা দিলে তাৎক্ষণিক-ভাবে বঙ্গবন্ধু এর প্রতিবাদ জানান। ১১ মার্চ বাংলা ভাষার দাবিতে ধর্মঘট পালনকালে বঙ্গবন্ধু সহকর্মীদের সাথে সচিবালয়ের সামনে বিক্ষোভরত অবস্থায় গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারে সারাদেশে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। আন্দোলনের চাপে পরে ১৫ই মার্চ তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। তারপর বহুবার তাকে অন্যায় কারনে গ্রেফতার করা হয়। 

১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিন নিশ্চিত করেন ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। এর প্রতিবাদে বন্দি থাকা অবস্থায় ২১ ফেব্রুয়ারিকে রাজবন্দি মুক্তি এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি দিবস হিসেবে পালন করার জন্য বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। ১৪ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু এ দাবিতে জেলখানায় অনশন শুরু করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র সমাজ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে সালাম, বরকত, রফিক, শফিউর শহীদ হন। বঙ্গবন্ধু জেলখানা থেকে এক বিবৃতিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।

যুক্তফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর ১৯৫৪ সালের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে ১৫ মে বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক সরকারের কৃষি ও বন মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন কিন্তু ৩০ মে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা বাতিল করে দেয়। 

১৯৫৫ সালের ৫ জুন বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ১৭ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করে ২১ দফা ঘোষণা করা হয়। 

১৯৫৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে খসড়া শাসনতন্ত্রে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনে বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান। ১৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সভায় প্রশাসনে সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিত্বের বিরোধিতা করে একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই সিদ্ধান্ত প্রস্তাব আনেন বঙ্গবন্ধু। ৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিল বের করা হয়। 

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। ১১ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় এবং একের পর এক মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়।  

১৯৬২সালের ২৫ জুন বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতৃবৃন্দ আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি দেন। ২৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু লাহোর যান, এখানে শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিরোধী দলীয় মোর্চ জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট গঠিত হয়। অক্টোবর মাসে গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে সারা বাংলা সফর করেন।

১৯৬৩ সালে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবরন করেন এবং ১৯৬৪ সালে মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়। 

১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলসমূহের জাতীয় সম্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবি পেশ করেন। 

১৯৬৮ সালের ৩ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করে মোট ৩৫ জন বাঙালি সেনা ও সি এস পি অফিসারের বিরুদ্ধে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ এনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। ৫জুন ১৯৬৮ সালে ঢাকা সেনানিবাসে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে এই মামলার বিচার কার্য শুরু করে সামরিক সরকার।

 ১৯৬৯ সালের ১৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা সেনানিবাসে আটক রাখা হয়। বঙ্গবন্ধুসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত আসামিদের মুক্তির দাবিতে সারাদেশে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই আন্দোলন গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ২২ ফেব্রুয়ারি জনগণের অব্যাহত চাপের মুখে কেন্দ্রীয় সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যান্য আসামিকে মুক্তি দানে বাধ্য হয়। 

২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে প্রায় ১০ লাখ ছাত্র জনতার সংবর্ধনা সমাবেশে শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এরপর ১০ই মার্চ আইয়্যুব খানের সঙ্গে বৈঠকে সায়ত্বশাসনের জোর প্রস্তাব জানান। ওই বছরেই ৫ ডিসেম্বর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় বঙ্গবন্ধু পূর্ব বাংলার নামকরণ করেন ‘বাংলাদেশ’। ফলে ১৯৭০ সাল নাগাদ শেখ মুজিবুর রহমান ভারতীয় উপমহাদেশে এক প্রভাবশালী নেতা হিসাবে আবির্ভূত হন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক আইনসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় পরিষদেও সংখ্যাগড়িষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবে ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরে কাল ক্ষেপন করতে থাকেন। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সৃষ্টি হয় এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকায় সমবেত হন লক্ষ লক্ষ বাঙালি। সেদিনই এই অমর নায়ক শুনিয়ে দেন তার কিংবদন্তি তুল্য ঘোষনা, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে এক ওয়্যারলেস বার্তায় স্বাধীনতার ঘোষনা দেন শেখ মুজিব। এর পরপই তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৭ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমান কে সর্বাধিনায়ক করে মুজিবনগরে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বাঙালির স্বাধীনতা অর্জিত হলেও জালিমের জেলখানায় বন্দী জীবন কাটাতে থাকেন জাতির শ্রেষ্ঠ পুরুষ। 

অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী আন্তর্জাতিক চাপের ফলে শেখ মুজিব কে মুক্তি দিতে বাধ্য হন পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রপতি জুলফিকার আলি ভুট্টো। লন্ডন ও ভারত হয়ে ১০ জানুয়ারী স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখেন শেখ মুজিব। ঐদিনই রেসকোর্স ময়দানে বক্তব্য রাখেন পাঁচ লক্ষ জনতার সামনে। এরপর দেশ গড়ার মহান কাজে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭২ সালে কার্যকর করেন স্বাধীন বাংলাদেশের নয়া সংবিধান। 

১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুনরায় শেখ মুজিবের নেতৃত্বে নিরঙ্কুশ জয় লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু বামপন্থীদের বিদ্রোহী মনোভাব এবং মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতির কারনে ক্ষমতা গ্রহনের পর থেকেই শেখ মুজিবকে বাড়তে থাকা অসন্তোষ সামাল দিতে হয়। রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তিনি ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে দেশে জরুরী অবস্থা জারী করেন।

১৯৭৫ সালে তিনি গঠন করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ নামে একটি রাজনৈতিক দল। কিন্তু দলের ভেতরে ও বাইরে নানা কারণে বাড়তেই থাকে অসন্তোষ। অবশেষে ঘনিয়ে আসে সেই ভয়াল দিনটি। ৭৫ এর ১৫ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার আগেই সেনাবাহিনীর একদল জুনিয়র অফিসার ট্যাংক এবং ভারী অস্ত্র নিয়ে ঘিরে ফেলে ধানমন্ডি ৩২ এর শেখ মুজিবের বাসভবন। বাড়িতে ঢুকে নির্বিচারে হত্যা করা হয় হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি এবং তার পরিবারের সকল সদস্য সহ ব্যাক্তিগত কর্মচারী দের। নিমেষেই যেন আধার নেমে আসে বাংলার বুকে। জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ রেহানা এবং শেখ হাসিনা।

দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বলি হয়ে জাতির জনক জীবন দিয়ে গেলেও তিনি আজও অমর হয়ে আছেন বাঙালিদের হৃদয়ে। আজ এই ক্ষণজন্মা কিংবদন্তির ১০০ তম জন্মদিনে একটা কথাই মনে হয়- যতদিন রবে পদ্মা যমুনা গৌরি মেঘনা বহমান, ততদিন রবে কীর্তি তোমার শেখ মুজিবুর রহমান!