ভয়াবহ মাদক এলএসডি

এলএসডি। এমন এক মাদক যেটি সেবনের ফলে সেবনকারীকে হ্যালুসিনেশন থেকে শুরু করে অলীক দৃশ্য দেখা, অবাস্তব কল্পনা এবং ভয়াবহ সব উন্মাদনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সকল ধরনের সাইকেডেলিক মাদকগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে মারাত্মক বলে ধরা হয়। আজ আমরা জানবো, কি এই এলএসডি মাদক? আমাদের মস্তিষ্কে এর প্রভাব কি? এবং এই ড্রাগ সেবনকারীর  মধ্যে আচরণগত কি কি পরিবর্তন ঘটে?

এলএসডি বা লাইসার্জিক এসিড ডাই-ইথ্যালামাইড হল এক ধরনের সিনথেটিক ড্রাগ, যেটা রাই এবং বিভিন্ন ধরনের শস্যদানার ওপর জন্মানো বিশেষ ধরনের ছত্রাক থেকে উৎপাদিত লাইসার্জিক অ্যাসিডের রাসায়নিক সংশ্লেষের মাধ্যমে তৈরী করা হয়। সাধারণভাবে এলএসডির কোন বর্ণ ও গন্ধ থাকে না। ব্লটার কাগজ, চিনির কিউব বা জেলটিনের আকারে এ মাদক বিক্রি করা হয়। এটি সেবনের পর রক্তচাপ বেড়ে যায়, দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়, দৃষ্টি বিভ্রম বা হ্যাঁলুসিনেশন সৃষ্টি হয়। তখন আর নিজের ওপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

এলএসডি কোন মাদক হিসেবে ব্যবহারের জন্য আবিষ্কার করা হয় নি। ১৯৩৮ সালে সুইজারল্যান্ডের রসায়নবিদ আলবার্ট হফম্যান প্রথমবারের মতো নিজের অজান্তেই আধুনিককালের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়াবহ ড্রাগ এলএসডি আবিষ্কার করে ফেলেন। তখনকার সময়ে এরগট নামক এক ধরনের প্যারাসাইটিক ফাঙ্গাস দমনের ওষুধ হিসেবে এর উদ্ভাবন করা হয়েছিল। 

১৯৪৩ সালে যখন হফম্যান পরীক্ষামূলকভাবে স্বাদ, বর্ণ ও রংহীন এই সাইকেডেলিক ড্রাগ টেস্ট করেন তখন তিনি নতুন এক জগতের দেখা পান, যা চিন্তা-ভাবনাকে মুহূর্তেই প্রভাবিত করতে পারে। আর এভাবেই আবিষ্কার হয় ভয়াবহ এই মাদক। 

১৯৫০ ও ৬০ এর দশকে বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, অবসাদ ও মানসিক রোগের চিকিতসায়  এলএসডি এর ব্যবহার করা হয়েছিল। এরপর ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ চিকিতসার জন্য এলএসডিকে নিষিদ্ধ করে দেয়। 

এলএসডির এক ডোজ ৪০-৫০০ মাইক্রোগ্রাম হয়ে থাকে। যা একটি বালুকণার ১০ ভাগের একভাগ। মাদক হিসেবে এলএসডির প্রভাব এতোটাই মারাত্মক যে, এই স্বল্প পরিমান এলএসডি সেবনের ফলে যেকারোরই নেশা হয়ে যায়। 

এলএসডি সেবনের আধা ঘন্টার মধ্যে এর কার্যকারিতা শুরু হয়ে যায়। এর প্রভাব ৬-১২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। কারো কারো ক্ষেত্রে ২০-২২ ঘন্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। 

এলএসডি গ্রহনের পর মানুষের মস্তিষ্কের সেরোটোনিন নামক রাসায়নিকের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করে। যার ফলে সাধারণত মানুষ ‘হ্যালুসিনেট’ করে বা এমন দৃশ্য দেখে যার বাস্তবে কোন অস্তিত্বই নেই। অনেক সময় অলীক দৃশ্য দেখার কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে থাকে মানুষ। অনেকেই এই মাদক ব্যবহারের পর ভালো অনুভব করেন। আবার অনেকেই উন্মাদ হয়ে ভয়ঙ্কর কিছু পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে গিয়ে বিপদগ্রস্ত হয়ে থাকেন। 

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে, এলএসডি গ্রহণের পর সেবনকারী চোখ বন্ধ করেও অলীক সব দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পায়। তখন সে বাস্তব এবং কল্পনার জগতের মধ্যে মিল খুঁজে পায় না। তার এসব দৃশ্য সবসময় বাইরের পৃথিবী বা স্মৃতি থেকে আসে না। কল্পনাশক্তির সাহায্যে তারা এই দৃশ্য চোখের সামনে দেখতে পায়। আর তাদের সেসব কল্পনা মস্তিষ্কে জমে থাকা তথ্যভাণ্ডার থেকে আসে। 

গবেষণা মতে, এলএসডি গ্রহণের পর ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ হয়ে ওঠে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। একইসঙ্গে এর প্রভাবে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাবস্থা দূর্বল হয়ে পড়ে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এর সমীক্ষা অনুসারে, এলএসডি গ্রহণের ফলে মানুষের হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের মাত্রা এবং শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এ ছাড়াও অনেকের ক্ষেত্রে অনিদ্রা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ঘামসহ নানা ধরনের মানসিক সমস্যাও তৈরি হয়। 

এলএসডি গ্রহণ করে ভুল রাস্তা দেখে দুর্ঘটনার শিকার হওয়া, বাড়ির জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়া বা অহেতুক আতঙ্কিত হয়ে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঘটনা অনেক ঘটেছে বলে জানা যায়। এ ছাড়াও বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় ভোগা ব্যক্তিরা এলএসডি গ্রহণের পর আরো বেশি বিষণ্ণতা বা দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারেন। 

মানুষ দিনে দিনে বিভিন্ন ধরনের মাদক গ্রহণ করতে থাকলে তার শরীরে এক ধরণের সহনশীলতা তৈরি হয়। অর্থাৎ আগে কোন মাদক যে পরিমাণ গ্রহণ করলে যতটা নেশা হতো পরবর্তীতে হয়তো সেই একই মাদকে আর আগের মতো নেশা হচ্ছে না। তখন আসক্ত ব্যক্তি অন্য মাদক দ্রব্যের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আর এলএসডি সে ধরণের মাদকের মধ্যে একটি। 

ইয়াবা বা হেরোইনের তুলনায় এলএসডি-তে আসক্তিকর উপাদান বা অ্যাডিক্টিভ প্রোপার্টি কম থাকে। তার মানে এটা না যে, এতে আসক্তি তৈরী হয় না। একাধিকবার বা দীর্ঘসময় পর্যন্ত এটি সেবন করতে থাকলে এলএসডির প্রতিও মানুষের আসক্তি তৈরী হয়ে যায়। আর কেউ যদি এটি একবার সেবন করে, তাহলে কয়েক বছর পরেও কোন প্রকার মাদক গ্রহন ছাড়াই হঠাৎ করে এর প্রভাব টের পাওয়া যায়। 

যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এলএসডি একটি অবৈধ মাদকদ্রব্য হিসেবে বিবেচিত। এছাড়াও ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক এটি নিষিদ্ধ করা হয়।  এসব নিষেধাজ্ঞার কারনেই এটা নিয়ে বিস্তরভাবে গবেষণা করা সম্ভব হয় না। তবুও অনেক দেশের মনোবিজ্ঞানী ও রসায়নবিদরা বিষন্নতা, দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের মতো অসুস্থতার চিকিৎসায় এলএসডির কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণার চেষ্টায় আছেন।