ইকোশিয়াঃ ক্লিকে ক্লিকে গাছ রোপন

পৃথিবীতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে জনসংখ্যা। এবং যে হারে এই জনসংখ্যা বাড়ছে তার চেয়ে বহুগুনে কমছে গাছপালা। উজার হয়ে যাচ্ছে বন, গাছপালা, লতাপাতা। এইতো কিছুদিন আগেই তো আমাজনের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে  ধবংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে বহু গাছগাছালী। স্বার্থের পেছনে পড়ে মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে একের পর এক বিলীন হয়ে পড়ছে বেঁচে থাকার প্রধান উৎস অক্সিজেন।

অতিমাত্রায় গাছ কাটার ফলে আমরা আমাদের সম্ভাবনাময় পৃথিবীকে ফেলে দিচ্ছি মহাসংকটে। কখনো কি ভেবে দেখেছি ভবিষ্যতে এর পরিনাম কি হতে পারে? ভাবার আর সময় কোথায় আমাদের। কিন্তু এমনটাই ভেবেছেন জার্মানির নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র ক্রিশ্চিয়ান ক্রোল। শুধু ভাবেনই নি! তিনি আমাদের প্রযুক্তির দাসত্বকে কাজে লাগিয়ে এটা এখন বাস্তবে সম্ভবও করেছেন। হ্যা। আর তিনি এটা করেছেন সার্চ ইঞ্জিন ইকোশিয়ার মাধ্যমে। যে সার্চ ইঞ্জিনের সার্চের মাধ্যমে সবুজায়নে ভরে যাচ্ছে পুরো পৃথিবী। হ্যাঁ। আপনি একদমই ভুল শুনেননি।

আমরা তো প্রতিনিয়ত ইন্টারনেটে অনেক কিছুই খুজে থাকি আর এই খোঁজাখুঁজির কাজের জন্য আমরা গুগোলকেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করি। কিন্তু আপনি চাইলে আজ এখন থেকে প্রতিদিনই বৃক্ষরোপণের মহোৎসবে অংশ নিতে পারেন। আর সেটা আপনি করতে পারেন ইকোশিয়া সার্চের  মাধ্যমে। ইকোশিয়া সার্চ ইঞ্জিন দ্বারা কোন কিছু সার্চ করলে এই গ্রহের অন্য কোনও প্রান্তে আপনার নামে একটি চারাগাছ রোপণ  হয়ে যাবে। জার্মানীর বার্লিনের নব শিল্পদ্যোগী ক্রিশ্চিয়ান ক্রোল ২০০৯ সালে এমনই একটি সার্চ ইঞ্জিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

ইকোশিয়া নামে ওই সার্চ ইঞ্জিন কাজ করে একদম গুগ্‌ল সার্চ ইঞ্জিনের মতোই। কিন্তু গুগ্‌লের মতো ধনী হওয়ার বদলে ইকোশিয়ার লাভের ৮০ শতাংশই দান করে দিচ্ছেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে গাছ পোঁতার কাজে।

২০০৭ এর দিকে জার্মানির নুরেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনা শেষ করে ক্রিশ্চিয়ান ক্রোল সিদ্ধান্ত নেন বিশ্ব ভ্রমণের। লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যবসায় সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। একেক দেশের পরিবেশ, চিন্তা-ভাবনা, একেক রকম, যার প্রভাব পড়ে তার ব্যবসায়ে।

ভারত, থাইল্যান্ড ঘুরে নেপালে যান ক্রোল। সেখানে 'জ্যাভেল' নামক একটি সার্চ ইঞ্জিন চালু করেন। সার্চ ইঞ্জিনটি স্থানীয় এনজিওর জন্য তহবিল গঠনে সহায়তা করত। জ্যাভেল একে বেশি দিন চালিয়ে নিতে পারেননি। নেপালের বিদ্যুৎ স্বল্পতা কাজে ব্যাঘাত ঘটাত। তাই বন্ধ করে দেন জ্যাভেলের কার্যক্রম। পাড়ি দেন দক্ষিণ আমেরিকায়।

সেখানে দেখতে পান, মহাবন অ্যামাজনের অনেকটা অংশ মানুষজন অবাধে গাছ কেটে বন উজাড় করে ফেলছে। এর প্রেক্ষিতে সেসব দেশে পুনরায় বনায়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। কয়েকমাস আর্জেন্টিনায় থেকে এসব সমন্ধে ধারণা নেন ক্রোল। তার জ্ঞানের পরিধি আরও বাড়ে নিউ ইয়র্ক টাইমসের কলামিস্ট থমাস এল. ফ্রাইডম্যানের 'হট, ফ্ল্যাট, ক্রাউডেড - হোয়াই উই নিড অ্যাগ্রীন রেভ্যুলেশন' বইটি পড়ে। জ্যাভেল বন্ধ হয়ে গেলেও সেখান থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু করার ভাবনা চেপে বসে ক্রোলকে। ভাবতে ভাবতেই মাথায় আসে বনায়নের কথা। এরই প্রেক্ষিতে ২০০৯ সালের ৭ ডিসেম্বর কোপেনহেগেনে জলবায়ু সম্মেলনে পথচলা শুরু হয় নতুন এক পরিবেশবান্ধব সার্চ ইঞ্জিন ‘ইকোশিয়া’র। তখন ইকোশিয়ার বিজ্ঞাপনের রেভিনিউ থেকে সকল লভ্যাংশ দান করে দেয়া হয়। তাই আপনি যতবার ইকোশিয়াতে ক্লিক করবেন তারমানে তত বেশি গাছ পুঁততে সাহায্য করবেন আপনি। ইকোশিয়া কর্তৃপক্ষ মতে কোনও ব্যক্তি ৪৫ বার ইকোশিয়া সার্চ করলেই একটা গাছ পোঁতা হয়ে যায়। খুব দ্রুতই ক্রোলের এই উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পায় এবং বর্তমানে এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশি লক্ষেরও বেশি হয়ে যায়। ইকোশিয়ার সিইও ক্রিশ্চিয়ান ক্রোল বলছেন, যদি গুগ্‌লের বাজারের মাত্র ১০ শতাংশও ইকোশিয়া পেয়ে যায় তাহলেই বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধ করে পৃথিবীর অর্ধেক অংশে সবুজায়ন করতে সক্ষম হবে তারা।

শুরুর দিকে কয়েক বছর বিভিন্ন সভা, সেমিনারে গাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলে গেছে টিম ইকোশিয়া। শুরু হয়েছিল সভা-সেমিনারের জায়গায় গাছ উপহার দিয়ে। এক পর্যায়ে  এগিয়ে আসে ইয়াহু, বিং। বর্তমানে সার্চ ইঞ্জিনটি তাদের নিজস্ব এলগরিদম এর মাধ্যমে বিং দ্বারা সার্চ রেজাল্ট সরবরাহ করে থাকে।  

এরপর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য টিম শুম্যাচারকে নিয়ে ক্রিশ্চিয়াল ক্রোল শুরু করেন বনায়নের এক বৃহৎ প্রজেক্ট। গাছ লাগানো হয় ব্রাজিলের জুরুয়েনা জাতীয় উদ্যান ও আমাজনের একটা ছোট্ট অংশে। তারপর একে একে পেরু, কলম্বিয়া, স্পেন, হাইতি, উগান্ডা, বুরকিনাফাসো, মরক্কো ও ইন্দোনেশিয়ায়। আকাশ ফোঁড়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়তে থাকে রোপণ করা চারাগাছগুলো। সম্প্রতি কিছুদিন আগেই তারা এক বিলিয়ন গাছ লাগাতে সক্ষম হয়েছে। এবং তাদের মোট লাভের ৮০ শতাংশ বনায়ন ও চ্যারিটির কাজে ব্যয় করে ইকোশিয়া।

চাইলে আমরা ঘরে বসেই অংশগ্রহন করতে পারি বনায়নের এই মহা উৎসবে, শুধুমাত্র আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে কোন কিছু জানতে চেয়ে তাদের সার্চ ইঞ্জিনে সার্চের মাধ্যমে। প্রতিনিয়ত কত–কীই তো খোঁজ করি আমরা, তাই না? সেই হিসেবে ৪৫ সংখ্যাটি আমাদের কাছে কিন্তু অতি তুচ্ছ! ইকোশিয়ায় মাত্র ৪৫ বার কোনো কিছু সার্চ করার পর আপনার নামে রোপণ হয়ে যাবে একটি গাছ! এরপর যতই সার্চ করবেন, বাড়তে থাকবে এর সংখ্যা।

২০১৮ সালে ইকোশিয়া ইউজারদের গোপনীয়তা রক্ষাকারী সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। বর্তমানে ইউজারদের অনুসন্ধানকৃত বিষয়বস্তু এনক্রিপ্টেড করা হয়ে থাকে যার ফলে ব্যবহারকারীদের তথ্য নিজেদের সংগ্রহে রাখে না। এছাড়াও এটি ব্যবহারকারীদের তথ্য তৃতীয় কোনো পক্ষের কাছে বিক্রিও করে দেয় না। তাই বর্তমানে ইকোশিয়া একটি পরিবেশবাদী ও ইউজার ফ্রেন্ডলি সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে বিবেচিত।

অবশেষে বলতে চাই, প্রযুক্তির সংস্পর্শে আমরা যতই আধুনিক হইনা কেন , যদি মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে নিশ্বাস না নিতে পারি, তাহলে কিন্তু সবকিছুই বৃথা। ইচ্ছা থাকলেও সময়ের অভাবে গাছ লাগানো হয়ে ওঠে না আমাদের। আর এই কাজটিই কিন্তু আমরা করিয়ে নিতে পারি ইকোশিয়ার মাধ্যমে।