ঘূর্ণিঝড় কি? কিভাবে সৃষ্টি হয়? কিভাবে শক্তিশালী হয় এবং কিভাবে দূর্বল হয়ে পড়ে?

“বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়েছে, এ নিম্নচাপ থেকে উচ্চশক্তিসম্পন্ন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়ে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় আঘাত আনতে পারে এবং এতে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে” আপনি যদি দক্ষিন এশিয় অঞ্চলের বাসিন্দা হন তাহলে রেডিও কিংবা টেলিভিশনে  এরকম একটা নিউজ কিন্তু প্রায়শই শুনে থাকবেন। আর অবস্থা যদি খুবই বেগতিক হয়ে যায়, তাহলে মাঝে মধ্যে নিউজটা শিরোনামেও এসে যায়।

যদিও ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্পের মতো আগে থেকে না জানিয়ে হুঠ করে আমাদের এটাক করে না, তবুও যখন এটি উপকূলীয় অঞ্চলে এসেই যায় তখন আর সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিতে বেশি সময় নেয় না- সেটা আমাদের যথেষ্ঠ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও। আবার দেখা যায় উপকূলে তার খেলা দেখাতে দেখাতে ক্লান্ত হয়ে একসময় দূর্বল হয়ে বৃষ্টি আকারে ভূপৃষ্ঠে নত হয়ে পড়ে যায়। কেন এমনটা হয়? আর কিভাবেই বা এরকম বিশাল বিশাল ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম হয়?

ঘূর্ণিঝড় হচ্ছে ক্রান্তীয় সমুদ্র অঞ্চলে সৃষ্ট প্রচন্ড ঘূর্ণি বাতাস সম্বলিত আবহাওয়ার একটি রূপ, যেখানে বৃষ্টি, বজ্র এবং প্রচন্ড গতিতে বয়ে চলা বাতাসের একটি পুরো প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এই ধরনের বাতাস ঝড়ের গতিতে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড বেগে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়। সমুদ্রে উৎপত্তি এ ঝড়কে অঞ্চলভেদে তিন টি নামে ডাকা হয়। নামগুলো হল, সাইক্লোন, হারিকেন এবং টাইফুন।

সাধারণত দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঝড়কে সাইক্লোন নামে ডাকা হয়। এছাড়া উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে উৎপত্তি হওয়া ঝড়গুলোকে হ্যারিকেন নামে ডাকা হয়। এবং দক্ষিণ চীন সাগর বা জাপান সাগরে সৃষ্ট ঝড়কে টাইফুন নামে ডাকা হয়ে থাকে। এ যাবতকালে, এ ঝড়গুলোর যে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম রেকর্ড করা হয়েছে তাতে দেখা যায় সাইক্লোন থেকে হারিকেন এবং টাইফুন এর গতিবেগ ছিল অনেক বেশি।

এবার জানা যাক ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয় কিভাবে?

সমুদ্রের তাপমাত্রা, নিরক্ষরেখা থেকে দূরত্ব, বায়ুমন্ডলের আর্দ্রতা ইত্যাদি বিষয়গুলো ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টিতে অনেক ভূমিকা রাখে। আচ্ছা ব্যাপারটি সহজ করে বলছি।  সমুদ্রের পানি ২৬-২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াসের বেশি গরম হয়ে গেলেই ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। এই উষ্ণতা থেকেই জন্ম নেয় বাষ্প ও স্যাঁতস্যাতে বাতাস। সেটিই রূপ নেয় ভয়ঙ্কর কালো মেঘে। দুই দিক থেকে আসা নিচের এই বাতাস এক হয়ে গরম পানির উপরের বাতাসকে ঠেলে দেয় আরও উপরের দিকে। তখন তাদের জায়গা করে দিতেই, অর্থাৎ এদের ধাক্কায় উপরের বাতাস ধেয়ে যায় উল্টো দুই দিকে। উপরের দিকে উঠতে থাকা ভেজা বাতাস এরই মাঝে তৈরি করতে থাকে ঝোড়ো মেঘ। আর এই ঘটনার আশপাশে বয়ে চলে যে হাল্কা বাতাস, সেও বাইরে থেকে ধীরে ধীরে এই ঘনঘটার ভেতর ঢুকতে শুরু করে, এতে ঝড়ের ঘূর্ণি আরও বড় হতে থাকে। বাতাসের গতি যখন প্রতি ঘণ্টায় ৭৪ মাইলের বেশি হয়ে যায়, তখনই তাকে হ্যারিকেন বলা হয়। গতি যখন এর চেয়ে কম থাকে কিন্তু প্রতি ঘন্টায় ৩৯ মাইলের বেশি থাকে তখন সেটা শুধুই মৌসুমী ঝড়। 

আশা করে সবাই বুঝে গিয়েছেন যে ঘুর্ণিঝড় আসলে কিভাবে উতপন্ন হয়। 

এবার তাহলে জেনে নেয়া যাক উৎপন্ন হওয়া ঘূর্ণিঝড় কিভাবে আস্তে আস্তে শক্তিশালী হতে শুরু করে আবার কিভাবেই বা দূর্বল হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের বিনাশ হতে পারে। 

আমরা এটা তো জানি যে, প্রতিটি কাজের জন্য তার প্রয়োজনীয় শক্তির দরকার পরে। কোন ইঞ্জিনই কিন্তু গ্যাস, তেল বা ফুয়েল ছাড়া চলতে পারে না। তেমনি ঘূর্ণিঝড়ের এগিয়ে যেতে কিংবা তার ধ্বংসলীলা দেখাতে দরকার পরে শক্তি উৎপাদনকারী ফুয়েল। আর ঘূর্ণিঝড়ের ফুয়েল হলো সমুদ্রের পানি থেকে নেয়া তাপশক্তি। তারমানে এটা ক্লিয়ার যে ঘূর্ণিঝড় কোন উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবেশ করার পর ব্যাপক ক্ষতিসাধন তো করে ঠিকই, কিন্তু যেহেতু সেটা ভূমি অঞ্চলে প্রবেশ করে ফেলে সেহেতু পানির অভাবে ঘূর্ণিঝড়টি আস্তে আস্তে দূর্বল হতে শুরু করবে এবং ঝড় একসময় বৃষ্টিতে রূপান্তরিত হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অর্থাৎ সমুদ্রের পানির তাপশক্তিই হচ্ছে ঘূর্নীঝড়কে বাচিয়ে রাখার চালিকাশক্তি। তাই ঘূর্ণিঝড় অব্যহত থাকতে হলে তার নিচে অবশ্যই সমূদ্রের পানি থাকতে হবে। 

তবে ঘূর্ণিঝড় আমাদের জন্য যতই ধ্বংসাত্মক হোক না কেন এটি কিন্তু আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যেটি পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে।