ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কি? লক্ষণ ও প্রতিকার
![]() |
দেশে করোনাভাইরাস সংকট শেষ হওয়ার কোন নামগন্ধ নেই। এরই মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের মতো আরেকটি বিপজ্জনক রোগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিপদজনক বলতে আসলেই বিপজ্জনক রোগ। আপনি যদি কোভিড-19 এ আক্রান্ত হন, তাহলে ৯০% চান্স আছে যে আপনি বেঁচে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি ব্ল্যাক ফাঙ্গাস দ্বারা সংক্রামিত হন তবে আপনার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কেবলমাত্র ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ এর মৃত্যুর হার প্রায় ৫০%।
কি এই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস?
কতটা ভয়াবহ এই রোগ?
আর কিভাবেই বা এটি প্রতিরোধ করা যায়?
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস আসলে নতুন কোন রোগ নয়। এটা সর্বত্র বিরাজমান। আমাদের চারপাশেই এটা আছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগের ফরমাল নাম হচ্ছে মিউকরমাইকোসিস। বেশি সময় ধরে ঘরে রাখা আমাদের জুতাতেও এ ছত্রাক থাকতে পারে, দীর্ঘক্ষণ রাখা রুটিতেও এটি সৃষ্টি হতে পারে। মাটি, গাছপালা, সার বা পচনশীল ফল ও সবজির মধ্যে এটি থাকতে পারে। এটা আসলে বিরল কোনো রোগ নয়।
কিন্তু করোনা মহামারির এই সময়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ছড়ানোর কথা বেশি শোনা যাচ্ছে। আমরা কোন রোগে আক্রান্ত হলে, আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ধরুন কেউ যদি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাহলে প্রথমে ভাইরাসটি তার ফুসফুসে যায়। তখন আমাদের শরীরে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। শরীরের এই মারাত্মক পরিস্থিতিকে স্টর্ম বলে। এই স্টর্মের মধ্যে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস বা এরকম কিছু সুযোগসন্ধানী জীবানু দেহে প্রবেশ করলে, যেগুলো কিনা স্বাভাবিক সময়ে আক্রমণ করে না তখন সেই সব জীবানুগুলোও সক্রিয় হয়ে যায়। তবে স্টেরয়েড প্রয়োগের মাধ্যমে রোগীর এরকম পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কোন ছোয়াছে রোগ নয়। এটি মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না, কিন্তু চিকিৎসার সময় রোগীর ব্যবহার্য বস্তু থেকে অন্যজনের দেহে প্রবেশ করতে পারে। তারপরেও সবাই যে আক্রান্ত হবে তা কিন্তু নয়, যাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম শুধুমাত্র তাদেরই এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন বা সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যগত জটিল সমস্যায় থাকা ব্যক্তি বা যারা অতিরিক্ত ওষুধ খাওয়ার ফলে শরীরের প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে ফেলেছে, সেসব ব্যক্তিদের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও ক্যানসার, এইডসে আক্রান্ত রোগীদের এতে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে। ডায়াবেটিস, ক্যানসার আক্রান্ত হওয়ার পর যারা রেডিও থেরাপি বা কেমোথেরাপি নিচ্ছে, তারা খুব ঝুঁকিতে আছে। বংশ বা জন্মগতভাবে যারা কম প্রতিরোধক্ষমতার অধিকারী তাদেরও এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার জোর সম্ভাবনা আছে।
প্রকৃতিতে থাকা এ ছত্রাক নাক দিয়ে শ্বাসগ্রহণের মাধ্যমে সাইনাসে এবং ফুসফুসে ঢুকতে পারে। প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকা ব্যক্তির শরীরের কাটাছেঁড়া জায়গা, পোড়া জায়গা বা চামড়ার কোনো ক্ষত থাকলে সেখানেও আক্রান্ত হতে পারে।
এই ব্ল্যাক ফাঙ্গাস আসলে কতটা মারাত্মক?
প্রতিবেশি দেশ ভারতের দিকে যদি লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাব যে, সেখানে এ রোগের মৃত্যুহার 50 শতাংশের ও বেশি। বাংলাদেশেও এ রোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
চলুন এবারে জেনে নেয়া যাক ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কিভাবে ছড়ায়, যাতে আমরা এর প্রতিরোধ সম্পর্কে কিছুটা আইডিয়া নিতে পারি। যেহেতু এটা প্রকৃতিতে বসবাস করে, সেহেতু যেকোন সময় আমরা এর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যেতে পারি। হয়তবা আমরা আক্রান্ত হচ্ছি কিন্তু টের পাচ্ছি না আমাদের প্রতিরোধক্ষমতার বলেই। কিন্তু যাদের প্রতিরোধক্ষমতা কম এবং আক্রান্ত হয়েছেন তাদের বেচে থাকার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশ। দেখুন না, সম্প্রতি বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২জন আক্রান্ত হয়েছে এর মধ্যে একজনই মারা গেছে। ব্ল্যাক ফাঙ্গাস চোখ ও নাক দিয়ে প্রবেশ করতে পারে। চোখ থেকে আবার মস্তিষ্কেও চলে যেতে পারে। এটা হলে ব্যাপারটা খুবই ভয়াবহ হবে।
বাংলাদেশে এই সংক্রমণ আগেও হয়েছে। তবে খুবই কম। তাই এটি আমাদের দেশে হয় না—এমনটা নয়; আবার খুব বেশি হয়, সেটাও ঠিক নয়।
তাই সবাইকে এর প্রতিরোধের জন্য সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। যদি আপনি আক্রান্ত হয়েই যান তাহলে প্রাথমিকভাবে করোনাকালীন যেসব স্বাস্থবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল সেগুলোই মেনে চলার চেষ্টা করতে হবে।
আমেরিকার সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্যমতে, ব্ল্যাক ফাঙ্গাস যেহেতু পরিবেশ থেকেই আসে তাই একে রোধ করাও কঠিন। এর কোনো ভ্যাক্সিন বা টিকা নেই। কম প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য তাদের কিছু বেসিক পরামর্শ হচ্ছে,
- ধুলাবালি ও স্যাতস্যাতে জায়গা থেকে দূরে থাকা।-মাটি ধরতে হলে হাতে গ্লাভস পড়ে নেওয়া।
-চামড়ার মাধ্যমে যাতে সংক্রামণ না হয় সেজন্য কাটা ছেড়া বা ক্ষত স্থান পরিষ্কার রাখা।
-শরীরের কোন জায়গায় নোংরা দেখলে তা সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার পরামর্শ রয়েছে।
সবশেষে এটা বলা যেতে পারে, আপনি যদি ফিট এবং শারিরিকভাবে হেলদি হয়ে থাকেন মানে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি ভালো হয়ে থাকে, তাহলে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
