সাবমেরিন ক্যাবল কি?

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ইন্টারনেটে তথ্য আদান প্রদানের জন্য  যে মাধ্যমটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয় সেটা হচ্ছে সাবমেরিন ক্যাবল। আমরা আমাদের ব্যবহৃত মোট ইন্টারনেটের ৯৯ শতাংশই এই সাবমেরিন তারের সাহায্যে পেয়ে থাকি।

সাবমেরিন ক্যাবল বলতে একটি ভিন্নধর্মী টেলিযোগাযোগ মাধ্যম কে বুঝানো হয় যা তার বা ক্যাবলের সাহায্যে পৃথিবীর এক প্রান্তকে অন্য প্রান্তের সাথে জুড়ে রেখেছে।

আমরা কোনকিছু জানতে চেয়ে গুগলে সার্চ করলে সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্যে প্রথমে এটি আমেরিকাতে গুগলের ডাটা সেন্টারে যায় এবং সেখান থেকে আপনার  প্রয়োজনীয় তথ্যটি খুজে তারপর সেই সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্যেই সার্চ রেজাল্ট হিসেবে আপনার মোবাইল বা কম্পিউটারে ফিরে আসে। কাজটি এতো দ্রুতগতিতে হয় যে, আমরা এই প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে কোনকিছুই বুঝতে পারি না। 

সাবমেরিন ক্যাবলগুলো সাধারনত এক ধরনের অপটিক্যাল ফাইবারের সাহায্যে তৈরী হয় যেগুলো মানুষের চুলের চেয়েও সুক্ষ হয়। আর এই সুক্ষ ফাইবারগুলো দিয়ে সর্বোচ্চ গতিতে ডাটা ট্রান্সফার হয়ে থাকে।

সাধারণ ভাবে আমরা জানি যে, রেডিও ট্রান্সমিশনে ইথারে ছুঁড়ে দেয়া তথ্য আয়নোস্ফিয়ারে ঠিকরে আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। এই পদ্ধতিতে রেডিওর মাধ্যমে খবর বা সংগীত সম্প্রচার সম্ভব হলেও বৈরী আবহাওয়ায় বা দূর্যোগকালীন সময়ে এমনকি আপদকালীন সময়েও অধিকতর তথ্য আদান প্রদানের জন্য দ্রুত মাধ্যম হিসাবে "তার" বা "ক্যাবল" পদ্ধতি অপেক্ষাকৃত বেশি উপযোগী। স্বাভাবিক ভাবে একটি দেশ বা জনপদে খুঁটি গেড়ে অথবা মাটির নিচে টানেল করে খুব সহজেই ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা সরবরাহ করা সম্ভব। কিন্তু, বিশাল দূরত্ব যেমন এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে? সেখানে তো আর খুঁটি বসিয়ে নেয়া সম্ভব নাও হতে পারে! সে কারণেই , এই কাজটি করবার জন্য সাগরের গভীরে তার বিছিয়ে দিয়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করা হয়। যেহেতু, সমুদ্রের খুব গভীর দিয়ে এই তারগুলোকে এক দেশ থেকে আরেক দেশে নিয়ে যাওয়া হয়, তাই এই তার বা ক্যাবলগুলোকে বলা হয় সাবমেরিন ক্যাবল। 

সর্বপ্রথম ১৮৫০ সালে বাণিজ্যিক সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপন করা হয়। তখন এটা শুরু হয়েছিল ইউরোপ-আমেরিকার মধ্যে তামার তার বসিয়ে, কিন্তু বর্তমান সময়ে "সাবমেরিন কেবল" বলতে শুধু "সমুদ্রের নীচে দিয়ে বসানো "অপটিক্যাল ফাইবার"কে বুঝায়"। আগে তথ্য পাঠানোর জন্যে 'তামার তারে'র মধ্যে 'ইলেকট্রনিক সিগন্যাল' পাঠানো হত। আমরা বাসায় রাউটার দিয়ে এখনো এটি ব্যবহার করি। কিন্তু 'ইলেকট্রনিক সিগন্যালে'র থেকে, "আলো" দিয়ে অনেক অনেক বেশি তথ্য পাঠানো সম্ভব। এই আলো অবশ্য কোনো স্বাভাবিক আলো না, এতে লেজার আলো ব্যবহার করা হয়। আর এই লেজার আলোই থাকে অপটিক্যাল ফাইবারের ভেতরে।

পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৮৬৩ সালে সাবমেরিন ক্যাবলের সাহায্যে সৌদি আরবের সাথে বোম্বের প্রথম যোগাযোগ স্থাপন হয়। এর ৭ বছর পর, লন্ডনের সাথে বোম্বের সরাসরি সংযোগ দেয়া হয়।

যেহেতু সাবমেরিন ক্যাবলই আমাদের ইন্টারনেট সংযোগের মূল উৎস তাই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, এই ক্যাবলগুলো কতটুকু শক্তিশালী হয়ে থাকে বা এর স্থিতিস্থাপকতা কতটুকু। নীলতিমি, হাঙরসহ অনেক দানবীয় প্রানীই তো সমুদ্রে বসবাস করে। তারা কি এই ক্যবলগুলোর কোনো ক্ষতি করতে পারে না?

স্থিতিস্থাপকতা যে কোন তার বা পরিবাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। শুধু তাই নয়, সেই সাথে সেটি কোন মাধ্যমে স্থাপন করা হবে এবং মাধ্যম ভেদে তার স্বভাবজাত পরিবর্তনের সম্ভাবনাটাও কিন্তু দেখার বিষয়।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, প্রথম যেই ক্যাবলটি ব্রিটিশ চ্যানেল পাড়ি দেয় সেটি কিন্তু একটা গ্যাটা-পার্চায় মোড়ানো কপার তার ছিলো। সেটাতে বিশেষ কোন অন্তরক বা ইনসুলেশন দেয়া হয় নি! তবে কালের সাথে সাথে আমাদের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ঘটেছে এবং এখনকার সাবমেরিন ক্যাবলে মূলত অপটিক্যাল ফাইবার ব্যবহার করা হয় । অপটিক্যাল ফাইবারের চার পাশে বেশ কয়েক স্তরে থাকে বেশ কয়েক ধরণের অন্তরক। এবং এর বাইরে বেশ অনেকগুলো লেয়ারে থাকে প্রোটেকশল শিল্ড। যার কারনে ক্যাবলটি বাইরের দিক থেকে অনেক মজবুত হয়ে থাকে এবং এর অনেক ভেতরে থাকে ডাটা ট্রান্সফারের জন্য অপটিক ফাইবার ক্যাবল। এরপর এই ক্যাবলগুলোকে জাহাজে করে সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বড় বড় স্ক্রু ড্রাইভারের সাহায্যে ক্যাবলগুলোকে সমুদ্রের একেবারে তলদেশে আটকে দেয়া হয় যাতে ক্যাবলগুলো তার নির্দিষ্ট জায়গা থেকে সরে না যায়। তাই বোঝাই যাচ্ছে যে, এতো সহজে এই ক্যাবলগুলো নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ২টি সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে। এগুলোর একটি কক্সবাজারে অবস্থিত সী-মি-উই-৪ এবং অপরটি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় অবস্থিত সী-মি-উই-৫ । আর এই ক্যাবলগুলোর ব্যান্ডউইথ ১৫০০GBPS. পটুয়াখালী ও কক্সবাজারের এ দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন দ্বারাই সারা বাংলাদেশে তারের সাহায্যে টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়ে। আমি আগেও বলেছি যে, আমরা ইন্টারনেটে কোন ওয়েবসাইট ব্রাউজ করলে সেই ওয়েবসাইটের সকল তথ্য তার সার্ভার থেকে তারের মাধ্যমেই আমাদের মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট বা কম্পিউটারে এসে থাকে। এ থেকে স্বাভাবিক ভাবেই আপনার মনে একটা প্রশ্ন আসতে পারে যে, ইন্টারনেট ব্রাউজ করার জন্য তো আমরা আমাদের  ফোন বা ট্যাবলেটে কোন ওয়্যার বা তারের সংযোগ ব্যবহার করছি না। তাহলে কিভাবে ইন্টারনেট বা যেকোন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা তার বা ক্যাবলের সাহায্যে কাজ করে?

ধরুন আপনি সিঙ্গাপুরের একটি সার্ভারে থাকা ওয়েবসাইট ব্রাউজ করছেন। সেই সার্ভার থেকে তথ্য আপনার ডিভাইস পর্যন্ত পৌছাতে বেশ কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়। সর্বপ্রথম সেই ওয়েবসাইট থেকে তথ্যটি বেশ কয়েকটি সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন অতিক্রম করে বাংলাদেশের কক্সবাজার বা পটুয়াখালীর যে কোন একটি স্টেশনে পৌঁছায়। সেখান থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন সিম কোম্বানীর টাওয়ার বা ব্রডব্যান্ড সংযোগের মাধ্যমে আপনার ঘর পর্যন্ত আসে। আর এসব কোম্পনীগুলোও তারের সাহায্যে এ কাজটি করে থাকে। আপনার ডিভাইস থেকে টাওয়ার বা রাউটার- শুধুমাত্র এ দূরত্বটুকু ওয়্যারলেস মাধ্যমে হয়ে থাকে আর বাকী পুরো প্রক্রিয়াটা হয়ে থাকে তারের সাহায্য। তবে অনেক টেলিযোগাযোগ মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটা হয়ে থাকে শুধুমাত্র তার বা ক্যাবলের সাহায্যে। তাই যখন এসব সাবমেরিন ক্যাবলের কোন একটি ছিড়ে যায় বা কেটে যায় তখনই আমাদের ইন্টারনেটের গতি স্লো হয়ে যাওয়ার খবর শোনা যায়। 

তবে যত বেশি "সাবমেরিন কেবল" তত বেশি তথ্য আদান-প্রদানের দ্রুতি বা বেশি বেশি লোককে ইন্টারনেট সংযোগ দেয়া সম্ভব। সেই সাথে কোন একটা ক্যাবলের ত্রুটিপূর্ণ অবস্থাতে বাকী সাবমেরিন ক্যাবলগুলো দ্বারা পর্যাপ্ত ব্যাকআপ প্রদান করা সম্ভব এবং এতে ইন্টারনেটের গতি কমে যাওয়া নিউজের পরিমানও কমে যাবে।