ইসরায়েলী সামরিক বাহিনী কতটা শক্তিশালী?
১৯৬৭ সালে, ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি বাহিনী মিশর, জর্ডান এবং সিরিয়ার সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করেছিল যা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে একটি প্রভাবশালী শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এর পর থেকে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি টেকনোলোজিক্যালি বিশ্বের অন্যতম উন্নত মিলিটারি তৈরি করেছে। কিন্তু ইসরায়েলি মিলিটারি আসলে কতটা শক্তিশালী? ইসরায়েল সেনাবাহিনী ও ইসরাইল প্রতিরক্ষা বাহিনীতে প্রায় 1 লক্ষ 77 হাজার সক্রিয় সেনা সদস্য এবং 4 লক্ষ 45 হাজার রিজার্ভ সেনা সদস্য রয়েছে যা ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার 7শতাংশ। বিশ্বের বৃহত্তম সেনাবাহিনীর দেশ চীনের সাথে যদি তুলনা করি তাহলে দেখব যে, চীন তার জনসংখ্যার মাত্র 0.15 শতাংশ মানুষ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। ইসরায়েলের সকল নন-আরবীয় নাগরিকদের মিলিটারি ট্রেনিং বাধ্যতামূলক, যেটা কিনা বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই চোখে পড়ে না। এই ট্রেনিংয়ে পুরুষদের সাধারণত তিন বছর এবং মহিলাদের দুই বছর পর্যন্ত সামরিক প্রশিক্ষন দিতে হয়। ইসরায়েলি নাগরিকদের কেউ ১৮ বছর বয়সে পা দিলে মিলিটারিতে জয়েন করাকে তারা উৎসবের মতো করে উদযাপন করে।
Israel Defence Force এ রয়েছে Sayaret Matkal নামে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী বাহিনী। এটি একটি অত্যন্ত গোপনীয় বিশেষ অপারেশন ব্রিগেড যা শত্রুর সীমানার বাইরে থেকেও নিখুতভাবে তৎপরতা চালিয়ে যেতে পারে। অতি শক্তিশালী যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় অর্জন করার জন্য, Israel Defence Force কয়েক বছর ধরে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মারকাভা ব্যাটল ট্যাংক তৈরী করছে, যা তাদেরকে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সাজোয়া বাহিনীতে পরিনত করেছে। যার ফলে ইসরায়েলি বাহিনী সিনাই উপদ্বীপ বা গোলান মালভূমির মতো জটিল ভূখণ্ডগুলিতেও সহজে দখলদারিত্ব করতে পেরেছে।
ইসরাইলের বিমানবাহিনী গঠিত হয়েছে মূলত সর্বোচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রেষ্ঠ ফাইটারদের সমন্বয়ে। বিমানবাহিনীর F-15 Eagle ফাইটার জেট যখন আকাশের উপরের অংশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যস্ত, তখন F-16 Falcon ফাইটার জেট গুলো জমিনে আক্রমণের মাধ্যমে শত্রুকে ঘায়েল করতে সক্ষম। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েল সামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় উদ্ভাবনী উন্নতি লাভ করেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তাদের এরকমই এক উদ্ভাবনী যন্ত্রের নাম আয়রন ডোম এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম যা প্রতিপক্ষ থেকে আগত যেকোন রকেট বা মিসাইলকে অটোমেটিক সিস্টেমে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে। আয়রন ডোম সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে আমাদের চ্যানেলে একটি ভিডিও আছে। চাইলে আপনি ওটা দেখে নিতে পারেন।
অনেকে মনে করেন, ইসরাইলে বিশাল বিশাল পারমাণবিক অস্ত্রাগার আছে। কিন্তু আসলে কয়টি অস্ত্রাগার রয়েছে এবং কতটা বিশাল এসব অস্ত্রাগার, সেটা এখন পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে।
২০১৪ সালে, আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার বলেছিলেন, ইসরায়েলে নাকি ৩০০ টিরও বেশি পারমানবিক বোমা রয়েছে। এটাও সন্দেহ করা হচ্ছে যে, ইসরাইলে একটি অত্যাধুনিক নিউক্লিয়ার ট্রায়াড রয়েছে যার মাধ্যমে ভূমি, আকাশ ও জলভাগ— এই তিন অবস্থান থেকেই পরমাণু হামলা চালানো সম্ভব।
মানচিত্রে ইসরায়েলের আয়তন অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও এর মোট জিডিপির প্রায় সারে চার শতাংশ ব্যয় করা হয় গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে। আর এই পরিমানের ৩০ শতাংশ ব্যয় করা হয় সামরিক অস্ত্রসস্ত্র উৎপাদনে, যেখানে আমেরিকা এক্ষেত্রে খরচ করে মাত্র ১৭ শতাংশ। গবেষণা ও উন্নয়নের উপর এরকম মনোনিবেশ ইসরায়েলি সেনাবাহিনীকে অতি শক্তিশালী অস্ত্রসস্ত্র উৎপাদন করতে সক্ষম করে তুলেছে যা সারা বিশ্বের সেনাবাহিনীর ঈর্ষার কারন। গত পাঁচ বছরে ইসরায়েলি অস্ত্রের রফতানি বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। আর বর্তমানে ইসরায়েল হল বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারী দেশ যার সবচেয়ে বড় কাষ্টোমার হচ্ছে ভারত, ভিয়েতনাম এবং আজারবাইজান। মধ্য প্রাচ্যে আয়তনের দিক দিয়ে ছোট হওয়া সত্বেও, প্রযুক্তিগত উন্নতির কারনে ইসরাইলি সেনাবাহিনী নিজেকে একটি প্রবল ক্ষমতাসম্পন বাহিনীতে পরিণত করেছে। আসলে এটা সত্যিই যে, একটি দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন মানে সেদেশের সার্বিক শক্তিমত্তারও উন্নয়ন। তাই সকল দেশেরই উচিত প্রযুক্তি খাতে বিশেষভাবে আলাদা একটি বিনিয়োগ রাখা।
