ইন্টারনেটের মালিক কে?
আচ্ছা, আপনার জানা আছে কি? আমাদের নিত্যদিনের ব্যবহৃত ইন্টারনেট কিভাবে কাজ করে? আমাদের মধ্যে যারা ইন্টারনেট সম্পর্কে খানিকটা হলেও ভেবেছি তাদের মাথায় হয়ত কখনো না কখনো কয়েকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন এসেছে। যেমন- ইন্টারনেট কে তৈরী করে কিংবা এর মালিক কে? আমরা যে এতো এতো ডাটা ইন্টারনেটে খরচ করি তার উৎস বা উৎপন্ন হয় কোথায় এবং কিভাবে? কিংবা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের খরচ এবং মোবাইল ডাটার খরচের মধ্যে এতো পার্থক্য কেন? ইত্যাদি আরো বহু প্রশ্ন যেগুলো সবগুলোর উত্তর জানা যাবে আজকের আলোচনায়।
প্রথম পর্বের শেষ অংশের পর থেকে আজ আলোচনা করা হবে। তাই পুরো বিষয়টি বুঝতে আপনাকে অবশ্যই প্রথম পর্বটি পড়তে হবে। প্রথম পর্বে আমরা জেনেছি যে, পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ইন্টারনেটে তথ্য আদান প্রদানের জন্য যে মাধ্যমটি ব্যবহার করা হয় সেটি হচ্ছে অপটিক ফাইবার ক্যাবল বা সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবস্থা। অর্থাৎ আমরা যারা ইন্টারনেটে যুক্ত আছি তাদের সবার একে অপরের মধ্যে সংযোগ সাধনের জন্য একটি বিশেষ তারের ব্যবহার করা হয় যেটিকে অপটিক ফাইবার ক্যাবল বলা হয়ে থাকে। এই ক্যাবলগুলো সাগর মহাসাগর পেরিয়ে অন্য একটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হয় বলে একে সাবমেরিন ক্যাবলও বলা হয়ে থাকে। এই ক্যাবলগুলো চুলের মতো সূক্ষ এক ধরনের পাতলা তার যেটাকে কাঁচ বা প্লাস্টিক দ্বারা তৈরী করা হয়। অর্থাৎ এটা এমন এক প্রযুক্তি বলা যেতে পারে, যেটির মাধ্যমে ডাটা ট্রান্সমিশন করানো সম্ভয় হয়। আর এই ডাটা ট্রান্সমিশনের জন্য ব্যবহার করা হয় লাইট বা আলো। তাই এই ক্যাবলগুলোর মধ্য দিয়ে তথ্য আলোর গতিতে আসা যাওয়া করতে পারে। এটা ছিল সাবমেরিন ক্যাবল নিয়ে কিছু বেসিক আলোচনা। আরো বিস্তরভাবে জানতে “সাবমেরিন ক্যাবল কী” এই লেখাটি পড়ে নিতে পারেন।
চলুন, এবারে আমাদের আজকের মূল আলোচনায় আসা যাক। প্রথমেই জানা যাক, আমাদের ব্যবহৃত ইন্টারনেটের উৎস কোথায় কিংবা এটি কিভাবে উৎপন্ন হয়।
ইন্টারনেট উৎপন্ন হয়, এরকম ধারনা আজ থেকে একেবারের জন্য মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন। কারন ইন্টারনেট কখনোই উৎপন্ন হয় না। "ইন্টারনেট" জিনিসটা বিদ্যুতের মতো নয়। "বিদ্যুৎ" কেও উৎপাদন করে সরবরাহ করছে। সেই বিদ্যুৎ আমরা ব্যবহার করে খরচ করে ফেলছি। কিন্তু, ইন্টারনেটের বিষয়টি ঠিক এরকম নয়। "উৎপন্ন হওয়ার" বিষয়টি এখানে একদমই নেই।
এর আগের পর্ব দেখে থাকলে এ বিষয়ে আপনি নিশ্চয়ই অনেকটা আইডিয়া করে ফেলেছেন। আমরা জেনেছি যে, দুটি কম্পিউটারকে একে অপরের সাথে তারের সাহায্যে যুক্ত করাটাই ইন্টারনেট। আর এভাবে আমরা পৃথিবীর সবাই একে অপরের কম্পিউটারকে ব্যবহার করছি তাদের কম্পিউটার থেকে তথ্য আহরণ করছি। আলোচনার স্বার্থে ইন্টারনেট কি সেটা আমি এখানে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
আপনার বাসায় থাকা দুটি কম্পিউটারকে যখন আপনি তারের সাহায্যে যুক্ত করে দেবেন তখন আপনি এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে সহজেই তথ্য আদান প্রদান করতে পারবেন। আর এটাই নেটওয়ার্ক। এবার আপনার কম্পিউটারটি যখন বিশ্বব্যাপি কোটি কোটি কম্পিউটারের সাথে যুক্ত হয়ে যায়, তখন সেটা হয়ে যায় ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক। আর এটাই ইন্টারনেট। সুতরাং যতগুলো ডিভাইস ইনটারনেটে যুক্ত থাকে তাদের সমষ্টিই হলো ইন্টারনেট। এর মানে হলো, ইন্টারনেটের কোন উৎস নেই, এটা কখনো উৎপন্ন হয় না। এর কোন শুরু নেই কিংবা নেই কোন শেষ। যতদিন আছে সংযোগ , ততদিন পর্যন্ত হতে থাকবে তথ্যের আদান প্রদান।
যদি বলেন ইন্টারনেটের মালিক কে? তাহলে বলব, ইন্টারনেটের যদি কোন মালিক থেকে থাকে তাহলে সেটা আমি আপনি আমরা সবাই। কারন আমরাই প্রত্যেকে মিলে তৈরী করেছি এই নেটওয়ার্ক।
এখন স্বাভাবিকভাবেই আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, তাহলে এই ইন্টারনেট ব্যবহার করার জন্য আমাদের টাকা দিতে হয় কেন?
কল্পনা করুন, পৃথিবীতে এখনো ইন্টারনেটের আবিষ্কার হয় নি। আপনাকে লন্ডনে থাকা আপনার এক বন্ধুর কাছে আপনার কম্পিউটার থেকে তার কম্পিউটারে কিছু ফাইল পাঠাতে হবে। কিন্তু ইন্টারনেটের ধারনা আপনার ভালোভাবেই জানা আছে। তাই আপনার কম্পিউটার থেকে লন্ডনে থাকা আপনার বন্ধুর কম্পিউটারকে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সংযুক্ত করলেন। এবার আপনারা একে অপরের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবেন এবং এর জন্য আপনাকে আর কখনোই ইন্টারনেট বিল দিতে হবে না। কিন্তু আপনার ইন্টারনেট জুড়ে থাকবেন শুধু আপনি আর আপনার বন্ধু। সেখানে না থাকবে গুগল না থাকবে ইউটিউব। ইউটিউব গুগুলের সাথে সংযোগের জন্য আপনাকে আবার তাদের সার্ভারের সাথে আপনার কম্পিউটারকে তার দিয়ে যুক্ত করতে হবে। কিন্তু আপনি যতই বিলিয়ন ডলারের মালিক হোন না কেন আপনার একার পক্ষে কখনোই পৃথিবীর ১৮০কোটি ওয়েবসাইটের সাথে আপনার কম্পিউটাকে সংযোগ করা সম্ভব নয়। তাই এই কাজটি করে থাকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানীগুলো। ISP বা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারেরা টিয়ার ১ ,টিয়ার ২ এবং টিয়ার ৩ এই ৩টি ধাপে আপনার ডিভাইস পর্যন্ত ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে থাকে।
আর ঠিক এই কারনেই আমাদের ইন্টারনেটের জন্য টাকা দিতে হয়।
যেহেতু অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের দাম অনেক বেশি হয়ে থাকে তাই এসব কোম্পানীগুলো প্রচুর অর্থের বিনিময়ে এই কাজটি করে থাকে। তাই আমাদেরও ইন্টারনেটের জন্য অনেক টাকা খরচ করতে হয়।
এখন জানা যাক ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ডাটার ক্ষেত্রে ইন্টারনেট খরচ এবং ডাটা ইউজের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখা যায় কেন?
ধরুন, আপনি ১০ মেগাবাইটের একটি ফাইল ডাউনলোড করলেন। সেখানে ১০ মেগাবাইট ডাটা আপনার ইন্টারনেট সংযোগটি দিয়ে ট্রান্সফার হয়ে আসলো। আবার আপনি একটি ইমেইল পাঠালেন, সেখানে ১ মেগাবাইট ডাটা আপনার সংযোগটি দিয়ে ট্রান্সফার হয়ে গেলো। তাহলে আপনার মোট ব্যবহার হলো ১১ মেগাবাইট ডাটা।
বুঝতেই পারছেন, এই যতটুকু গেলো, আর যতটুকু আসলো সেই দুটোর যোগফলই হলো আপনার মোট ব্যবহার অর্থাৎ ডাটা ইউসেজ বা ডাটা খরচ। বিষয়টি খেয়াল করে দেখুন, আপনি যেটা পাঠালেন সেটা কিন্তু উৎপাদন নয়।
মোবাইল ডাটায় লিমিট থাকে কেন?
মোবাইল ইন্টারনেটের প্যাকেজে ডাটা লিমিট উল্লেখ করা হয়। যেমন: আপনি 500 MB এর একটি প্যাকেজ নিলেন। তাহলে আপনি আপনার সংযোগটির মাধ্যমে, সেন্ড এবং রিসিভ মিলিয়ে সর্বমোট 500 MB ডাটা ট্রান্সফার করার অধিকার পেলেন। এখানে ৫০০ এমবি ডাটা কিনলেন, তার মানে এভাবে চিন্তা করার কোন অবকাশ নেই যে, আপনাকে সিম কোম্পানী ৫০০ এম্বি ডাটা দিয়ে দিয়েছে এবং তা আপনি খরচ করছেন। বরং এটা এভাবে হয় যে, আপনাকে ৫০০এমবি ব্যান্ডউইথ পর্যন্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং আপনি ৫০০ এমবি তথ্য আদান প্রদানের পর আপনার ইন্টারনেট সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।
এবার আসি ব্রডব্যান্ড কানেকশনের ক্ষেত্রেঃ
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্যাকেজে স্পিড লিমিট উল্লেখ করা হয়। যেমন: 5 MBPS এর একটি ব্রডব্যান্ড প্যাকেজ নিলেন। তাহলে আপনি আপনার সংযোগটির মাধ্যমে, সর্বোচ্চ 5 MBPS স্পিডে ডাটা ট্রান্সফার করার সুযোগ পেলেন। তেমনিভাবে 10 এমবিপিএস এর কানেশনে সর্বোচ্চ ১০ এমবিপিএস স্পিডে ডাটা ট্রান্সফার করার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু মোবাইল ইন্টারনেটের সাধারণত স্পিড লিমিট উল্লেখ করা থাকে না। যেটা থাকে সেটাকে ৩জি কিংবা ৪জি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তাহলে ফলাফল কি দাড়ালো?
ইন্টারনেট তৈরী করে এর প্রত্যেক ব্যবহারকারী এবং এর মালিকও এর সকল ইউজার। আমরা যে এতো এতো ইন্টারনেট ব্যবহার করি তার কোন উৎস নেই। কারন, আমরা একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে শুধু তথ্য আদান প্রদান করি এতোটুকুই। আমাদের কাছ থেকে ইন্টারনেটের নাম করে যে অর্থ নেওয়া হয় তা শুধু অপটিক্যাল ফাইবারের খরচ ও আনুষঙ্গিক মেইনটেনেন্স খরচের টাকা ছাড়া আর কিছুই নয়। এবং, আমরা ISP বা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারের কাছ থেকে কোন ডাটা ক্রয় করি না , যেটা ক্রয় করি সেটা হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সময়কাল।