৬ষ্ঠ গণবিলুপ্তিঃ যে বিলুপ্তিতে ধ্বংস হবে পুরো মানবজাতি!
গত একটি পর্বে আমরা জেনেছি গণবিলুপ্তি কি এবং পৃথিবীর ইতিহাসে পাঁচটি বৃহৎ গণবিলুপ্তি সম্পর্কে। ইতিহাসে সংঘটিত হওয়া এই পাঁচ গণবিলুপ্তি - ওর্ডোভিসিয়ান, ডেভোনিয়ান, পারমিয়ান, ট্রায়াসিক এবং ক্রিটেসিয়াস গণবিলুপ্তি নামে পরিচিত। এগুলোর মধ্যে ক্রিটেশিয়াস বা টারশিয়ারি বিলুপ্তিই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। সাধারণত যখন কোনো কারণে প্রকৃতিতে বড় আকারে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তির ঘটনা ঘটে তাকে গণবিলুপ্তি বলা হয়। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত প্রাণীর বিচরণ ঘটেছে তার ৯৯ শতাংশই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে এসব গণবিলুপ্তির সময়ে। প্রথম গণবিলুপ্তির ঘটনা ঘটেছিল ৪৪০ মিলিয়ন বছর আগে এবং সর্বশেষে যে বিলুপ্তি ঘটে সেটি হয়েছিল মাত্র ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে। আর এই বিলুপ্তির মধ্য দিয়েই আমাদের বহুল পরিচিত অতিকায় ডায়নাসোরেরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। পৃথিবীতে সংঘটিত হওয়া পাঁচটি বৃহৎ গণবিলুপ্তি সম্পর্কে জানতে আপনারা- আমাদের আগের ভিডিওটি দেখে নিতে পারেন। ভিডিওটির লিংক ডেসক্রিপশন বক্স কিংবা পিন কমেন্টে দেয়া থাকবে। এসব গণবিলুপ্তির সময়ে পৃথিবীতে বিরাজমান সকল প্রাণী সমূহের ৭০ শতাংশেরও বেশি প্রাণী ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল । বিভিন্ন উল্কাপাত , আগ্নেয়গিরি, আবহাওয়ার চরমভাবাপন্ন অবস্থা, সমুদ্রের অস্বাভাবিক অবস্থা ইত্যাদি বিষয়গুলো এসব গণবিলুপ্তির প্রধান কারণ। এসব গণবিলুপ্তির কারণ হিসেবে প্রকৃতি দায়ী থাকলেও বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর ষষ্ঠ গণবিলুপ্তির কারণ এককভাবে আমরা মানুষেরা। হ্যাঁ, আমরা মানুষেরা নিজেই নিজেদের বিলুপ্তির কারণ। কিন্তু কিভাবে?
কয়েক লক্ষ বছর ধরে স্বগর্বে পৃথিবী রাজত্ব করা মনুষ্য জাতি ভবিষ্যতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে এমনটা শুনলে সবারই চোখ কপালে উঠে যাওয়ার কথা । কিন্তু কি করার বলুন তো? আমরা নিজেরাই যদি নিজেদের ধ্বংস করতে থাকি তাহলে আমাদের আর আটকাবে কে? পৃথিবীতে বর্তমানে মানুষের সংখ্যা ৭৫০ কোটির উপরে। এই সংখ্যাটি ৮০০, ৯০০ এমনকি ১০০০ কোটি ছাড়িয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে না। আর এই বিপুলসংখ্যক মানুষের কারণে সর্বপ্রথম যে সমস্যাটির শুরু হয় সেটি হচ্ছে বাসস্থান সমস্যা। মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় বাসস্থান নির্মাণ করতে গাছপালা ধ্বংস করছে, অতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনের জন্য ধ্বংস করছে প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট প্রাণীদের অভয়ারণ্য। পশুপাখি শিকার, মাছ আহরণ, রাসায়নিক দূষণ, শিল্প কারখানার বর্জ্য ইত্যাদি বিষয়গুলো পরিবেশকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। শুধু আমরা নিজেদের কথা বিবেচনা করে বৈচিত্র্যময় সকল প্রাণীকে পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছি।
২০১৪ সালের এক গবেষণায় জানা যায় , বিগত ৪০ বছরে পৃথিবী থেকে ৫০ শতাংশ বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৭০ সালের পর থেকে প্রাকৃতিক ভাবে বিভিন্ন প্রজাতির মেরুদন্ডী প্রাণীর সংখ্যা কমে গেছে গড়ে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত। আর এই পরিসংখ্যানগুলো আমাদের- একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত করে। আর সেটা হচ্ছে, 6th mass extinction বা ষষ্ঠ গণবিলুপ্তি।
এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে ৬০ হাজারের মতো মেরুদন্ডী প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মাঝে গত ৪০ বছরে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে ৬১৭টি প্রজাতির। সাম্প্রতিক কালে উল্লেখযোগ্য কিছু মেরুদন্ডী প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটেছে যেগুলোর বিলুপ্ত ঠেকাতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। এর মধ্যে ব্রাজিলিয়ান নীল টিয়া, সাদা রাইনোর প্রজাতির সর্বশেষ সদস্যটি পৃথিবী ত্যাগ করেছে ২০১৮ সালের শেষদিকে। এভাবে সকল মেরুদণ্ডী এবং অমেরুদন্ডী প্রাণীসমূহ হাড়িয়ে যাচ্ছে চিরদিনের জন্য।
আমরা হয়তো সবাই এটা জানি যে, পৃথিবীর ৯৯শতাংশ প্রাণীই হচ্ছে অমেরুদন্ডী। এর মধ্যে ১২ লক্ষ প্রজাতি বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করতে পেরেছেন এবং এর ৪০ ভাগই ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু গত ১০ বছরে আবিষ্কৃত জলজ প্রাণীর মাঝে বিলুপ্ত হয়েছে ১৫টি প্রজাতি। জলজ প্রজাতির বিলুপ্তির হার দেখে কিছুটা স্বস্তি অনুভব করলেও এখন আর সেটা করারও কোন উপায় নেই। কারণ ব্যাপকমাত্রায় প্লাস্টিক দূষণ, আর রাসায়নিকের কারণে এই শতকেই পৃথিবীর জলভাগ থেকে বিদায় নিতে পারে সাতশোরও বেশি প্রজাতির প্রাণী। জাতিসংঘের ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, পৃথিবীর ৮ মিলিয়ন প্রজাতির মধ্যে বর্তমানে ১ মিলিয়ন প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্তির পথে রয়েছে। “ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার” এর তথ্যমতে- ২৬,৫০০ প্রজাতির প্রাণী অতি দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ২৫ শতাংশ স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৪ শতাংশ পাখি, ৩৩ শতাংশ প্রবাল প্রজাতি এবং ৪০শতাংশ উভচর প্রাণী।
পৃথিবীতে বর্তমানে চিতাবাঘের সংখ্যা রয়েছে ৭০০০ এর মতো। কিন্তু এর সংখ্যা কোনভাবেই স্থায়ি নয়! অতি দ্রুতগতিতে এর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ১৯৯৩ সালের পর থেকে আফ্রিকান সিংহের পরিমান কমে গেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। রাশিয়া ও চীনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল এ বাস করা আমুর চিতাবাঘের মাত্র একশটি বেঁচে আছে বর্তমানে। প্রতিবছর পৃথিবীর মোট কীটপতঙ্গের আড়াই শতাংশ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং খুব দ্রুতই এক-তৃতীয়াংশ কীটপতঙ্গ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেবে। বিজ্ঞানীদের ধারণা আগামী কয়েক শ' বছরের মাঝেই পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে বর্তমানে বেঁচে থাকা ৭৫ শতাংশ প্রাণী। তাহলে কি দুনিয়ায় শুধুমাত্র মানুষই বেঁচে থাকবে?
না। গণবিলুপ্তি সংঘটিত হলে মানুষ বাস্তুসংস্থান ও তাদের খাদ্য শৃংখল থেকে বঞ্চিত হবে। পৃথিবীর সকল বাস্তুসংস্থান গুলো উৎপাদক শূন্য হয়ে পড়বে। প্রকৃতিতে ভারসাম্য রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে মানুষও একদিন বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাবে।
সামুদ্রিক প্রাণীদের শতকরা ২৫ ভাগ প্রাণীর বসবাস পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত প্রবাল প্রাচীর গুলোতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে যে পৃথিবীর মোট প্রবাল প্রাচীরের ৫০ শতাংশই ইতিমধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে গিয়েছে। এবং ২০৫০ সালের মধ্যে বাকী ৫০ ভাগ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। এভাবে সকল প্রাণী ধ্বংস হয়ে গেলে পৃথিবীতে মানুষের শস্যদানা উৎপাদন করা সম্ভব হবে না। কারন মানুষ যেসব শস্যদানা আর ফলমূল খেয়ে থাকে সেগুলো প্রাকৃতিক পরাগায়নের জন্য কীটপতঙ্গের উপরেই নির্ভর করে। প্রত্যেক প্রাণীসমূহের জীবন চক্র ব্যাহত হলে, ইকোসিস্টেম ধ্বংস হবে, খাদ্য শৃংখল ভেঙে যাবে, যার ফলে মানুষ খাদ্য উৎপাদনে ব্যর্থ হবে, খাদ্য উৎপাদনে ব্যর্থ হয়ে সর্বশেষে মানুষও একদিন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
বন্ধুরা, আমরা কেউ চাই না অদূর ভবিষ্যতে কখনো, আমরা পৃথিবীর সকল জীব বৈচিত্রের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়াই এবং সেইসাথে নিজেদেরও ধ্বংসের মুখে ফেলে দেই। তাই এখন থেকেই আমরা যদি আমাদের এই পৃথিবীকে সকল প্রাণী দের জন্য নিরাপদ করে তুলতে না পারি, দূষণ কমিয়ে আনতে সক্ষম না হই, কার্বন নিঃসরণ কমানো, প্রাণীর বৈচিত্রের জন্য নিজস্ব অঞ্চল তৈরী করা এবং প্লাস্টিক বর্জ্য কমিয়ে আনা, ইত্যাদি পদক্ষেপগুলো গ্রহন না করি তাহলে প্রাণীবৈচিত্র্য রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে। ইকোসিস্টেম হুমকির মধ্যে পড়লে আমাদের বেঁচে থাকাটাও কেবলই ইতিহাস হয়ে থাকবে।
