পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশঃ জিল্যান্ডিয়া
আচ্ছা, আমি যদি আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন রাখি যে, পৃথিবীতে মহাদেশের সংখ্যা ঠিক
কয়টি? আমি জানি এ প্রশ্নের উত্তরে সবাই নির্দিধায় বলে দিবেন যে, পৃথিবীতে মহাদেশ
রয়েছে ৭টি। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা , ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া
এবং এন্টার্কটিকা। মহাদেশ বলতে তো আমরা এগুলোর নামই শুনে আসছি, তাই না? কিন্তু আজ
আমি আলোচনা করব পৃথিবীর অষ্টম মহাদেশ সম্পর্কে। হ্যাঁ, নতুন আবিষ্কৃত হওয়া পৃথিবীর
অষ্টম মহাদেশ জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে। বিজ্ঞানীদের সকল বিষয়বস্তুর মধ্যে পৃথিবীর
অষ্টম মহাদেশ জিলান্ডিয়া নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। প্রথম দিকে এই মহাদেশ নিয়ে
অনেকেই দ্বিধা দ্বন্দ্বে ছিলেন এই ভেবে যে, সত্যিই কি আবিষ্কার হতে চলেছে কোটি কোটি
বছর ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে শুয়ে থাকা নতুন এক মহাদেশ? কিন্তু অবশেষে এ মহাদেশ
সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্যই জানতে সক্ষম হয় বিজ্ঞানীরা। নতুন এই মহাদেশটি কোথায়
অবস্থিত? কবে এবং কীভাবে এর জন্ম হয় আর আয়তনে কতবড় এর আকার? কী জন্যই বা বিজ্ঞানীরা
এতটা উঠেপড়ে লেগেছে একে মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য?
সমুদ্রের তলায় লুকিয়ে আছে কত ঐশ্বর্য
আর কতই না রহস্য! আর এইসব সমুদ্রের নিচের রহস্যের অনুসন্ধান করতে গিয়েই বিজ্ঞানীরা
অনেক সময় চরম বিস্ময়ের খোঁজ পান। এরকমই একটি বিস্ময় ছিল জিল্যান্ডিয়া নামক
ভূখন্ডটি।
বছরটি ছিল ১৯৬০ সাল। সমুদ্রের নিচে তেলের খনি অনুসন্ধানের সময় একটি
মহাদেশীয় ভূখন্ডের অস্তিত্ব খুঁজে পান একদল ভূবিজ্ঞানী। যেটি ছিল অস্ট্রেলিয়া
মহাদেশের প্রতিবেশী এবং নিউ জিল্যান্ডকে আচ্ছাদিত একটি ভূখন্ড। ১৯৯৫ সালে সর্বপ্রথম
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ব্রুস লুয়েন্ডিক, এই
ভূখন্ডটির নাম দেন ‘জিল্যান্ডিয়া’। এরপর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিস্তৃত এক
গবেষণার পর বিজ্ঞানীদের হাতে এমন কিছু তথ্য আসে যার উপর ভিত্তি করে তারা
জিল্যান্ডিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। জিল্যান্ডিয়া একটি নিমজ্জিতপ্রায় মহাদেশীয়
ভূ-খণ্ড। এটি অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের পার্শবর্তী রাষ্ট্র নিউজিল্যান্ডকে ঘিরে
অবস্থিত। অর্থাৎ বর্তমানে আমরা যে নিউজিল্যান্ডকে দেখি এটি জিল্যান্ডিয়া মহাদেশেরই
জেগে থাকা একটি অংশ। অর্থাৎ জিল্যান্ডিয়ার পর্বতচূড়াও বলতে পারেন। দক্ষিণ-পশ্চিম
প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে এক বিশাল অঞ্চল এই জিল্যান্ডিয়া, এটি মহাদেশ হিসেবে
স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য বলেই দাবি বিজ্ঞানীদের। জিল্যান্ডিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলই পানির
নিচে নিমজ্জিত। এই মহাদেশটির ৯৪ শতাংশই প্রশান্ত মহাসাগরের জলের তলায় ডুবে রয়েছে।
খুবই সম্পদশালী এই মহাদেশটি সমুদ্র তলদেশ থেকে প্রায় ১২,২১৭ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।
এর সমুদ্রের নিচে রয়েছে বিপুল পরিমাণের জীবাশ্ম জ্বালানি, যা পৃথিবীর ভবিষ্যতের
দীর্ঘ সময়ের জ্বালানির চাহিদা মেটাতে সক্ষম এবং এই জ্বালানীর মূল্য আনুমানিক বিলিয়ন
ডলারেরও বেশি। বিজ্ঞানীদের দেয়া তথ্য মতে, ভূতাত্ত্বিক দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া এবং
অ্যান্টার্কটিকার চেয়ে একেবারেই আলাদা এই জিল্যান্ডিয়া মহাদেশ। জিল্যান্ডিয়া ও
অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ ৮.৫ থেকে ১৩ কোটি বছর আগে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল অ্যান্টার্কটিকা
থেকে। আর ৬ থেকে ৮.৫ কোটি বছর আগে জিল্যান্ডিয়া বিচ্ছিন্ন হয় অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ
থেকেও। প্রায় ২৩ কোটি বছর আগে সম্ভবত মহাদেশটি সম্পূর্ণ নিমজ্জিত ছিল এবং বর্তমানেও
মহাদেশটির সিংহভাগ প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে ডুবে রয়েছে। বর্তমানে, এটি পৃথিবীর
বৃহত্তম মহাদেশীয় ভূখন্ডাংশ বা অণুমহাদেশ ধরা হয় যার আয়তন ৪৯,২০,০০০ কি.মি.। যা
দ্বিতীয় বৃহত্তম অণুমহাদেশের আয়তনের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি এবং অস্ট্রেলিয়া
মহাদেশের অর্ধেকের বেশি। অপরদিকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সমান এবং ইউরোপের অর্ধেক।
এই সব কারণ ছাড়াও অন্যান্য ভূতাত্ত্বিক কারণে, যেমন: ভূপৃষ্ঠের পুরুত্ব ও ঘনত্ব
বিচার করে, জিল্যান্ডিয়াকে অনেক সময় একটি পূর্ণ মহাদেশ হিসেবেও গণ্য করা হয়।
মহাদেশটি দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পানির নিচে অবস্থিত, তাই নিউজিল্যান্ড
এবং ইন্ডিয়া এ দুটি দেশের নাম মিলিয়ে মহাদেশটির নাম রাখা হয় জিল্যান্ডিয়া। একদল
গবেষক যুক্তি দেখান যে, আপাতদৃষ্টিতে জিল্যান্ডিয়াকে বৃহৎ এবং সমন্বিত এলাকা
হিসেবে বিবেচনা করা যায় না অর্থাৎ, জিল্যান্ডিয়াকে একটি মহাদেশ হিসেবে দাবি করা যায়
না। কিন্তু ২০০২ সালে ব্যাথিমেট্রিক মানচিত্র প্রণয়নের মাধ্যমে গবেষকরা অনেকটাই
এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং সমুদ্রেপৃষ্ঠের
মাধ্যাকর্ষণ মানচিত্রের মাধ্যমে তাঁরা সফলভাবে প্রমাণ করে দিয়েছেন যে জিল্যান্ডিয়া
একটি বিশাল অঞ্চলজুড়ে ব্যাপ্ত, সমন্বিত ভূখণ্ডও বটে।
সমুদ্রের প্রায় ৩,২৮০ ফুট নিচে
নতুন এই মহাদেশটির সীমারেখা দেখতে পাওয়ার পর থেকেই তার উপর ভিত্তি করে
ভূতাত্ত্বিকগণ জিল্যান্ডিয়াকে মহাদেশ হিসেবে মেনে নেয়া যায় বলে জোরালো অভিমত
ব্যক্ত করেন। অনেকেরই মনে হতে পারে, যেহেতু জিল্যান্ডিয়ার সিংহভাগ অংশই পানির নিচে
নিমজ্জিত, তাই এটির মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কোনো যোগ্যতা নেই। কেননা পানির
উপরে অবস্থিত হওয়া; মহাদেশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সেটি আসলে ভুল ধারণা। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো বিশাল ভূখণ্ডকে মহাদেশ হিসেবে
স্বীকৃতি পাবার জন্য মূলত চারটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজনঃ ভূখন্ডটি আশেপাশের অন্যন্য
অঞ্চল থেকে উঁচু হতে হবে। সুস্পষ্ট কিছু ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। ভূ-স্তর
সমূদ্র তলদেশের চেয়েও পুরু থাকতে হবে। একটি সুনির্দিষ্ট সীমারেখা থাকতে হবে।
বিজ্ঞানীরা এটা প্রমাণ পেয়েছেন যে, জিল্যান্ডিয়ার মধ্যে মহাদেশের যোগ্যতা লাভের
জন্য এই সবগুলো গুণই বিদ্যমান। জিল্যান্ডিয়ার কিছু মাটি ও পাথরের নমুনা নিয়ে
বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেন যে, মাটির সাথে মহাদেশ ভিত্তিক যে ভূখণ্ড রয়েছে তার
আশ্চর্যজনক মিল রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রের তলদেশের গঠনের সাথে এই মাটির কোনো মিল খুঁজে
পাওয়া যায় না। তাই জিল্যান্ডিয়াকে কোনভাবেই সমুদ্রের তলদেশ বলা যাবে না।
এই
মহাদেশের জেগে থাকা অংশের মধ্যে আরো কিছু স্থান রয়েছে। যেমন- নিউ ক্যালেডোনিয়া,
নরফক আইল্যান্ড, লর্ড হোয়ে আইল্যান্ড এবং এলিজাবেথ ও মিডলটন প্রবালপ্রাচীর।
জিল্যান্ডিয়া নিয়ে ভূবিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। তবে এটিকে
নিয়ে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয় ২০১৭ সালে, যখন 'জিওলজিক্যাল সোসাইটি অভ আমেরিকা'য়
প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়, জিল্যান্ডিয়ার আয়তন প্রায় পঞ্চাশ লক্ষ
বর্গকিলোমিটারের কাছাকাছি, যা পার্শ্ববর্তী অস্ট্রেলিয়ার প্রায় দুই তৃতীয়াংশের
সমান, এবং ভারতীয় উপমহাদেশেরও প্রায় সমান। ৮৫ মিলিয়ন বছর আগে সম্ভবত গন্ডওয়ানা থেকে
বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল এটি। গন্ডোয়ানা ছিল নিউজিল্যান্ডের আদি নাম। তখনই সৃষ্টি হয়
জিল্যান্ডিয়ার। তবে এর আলাদা হবার ঘটনাটি অদ্ভুত, এটি বিচ্ছিন্ন হবার পর পুরোপুরি
ভেঙে না গিয়ে নিজ ক্ষেত্রে একটু প্রসারিত হয়ে যায়।
বৈজ্ঞানিকভাবে না হয় প্রমাণ করা
গেছে যে জিল্যান্ডিয়া একটি মহাদেশ, কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে কি এটিকে একটি পৃথক মহাদেশ
হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে? না, এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী খুব কম দেশের পাঠ্যপুস্তকেই
মহাদেশ হিসেবে জিল্যান্ডিয়ার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেকে ভাবতে পারেন, হয়তো
পাঠ্যপুস্তক রচয়িতারা কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবার জন্য অপেক্ষা করে আছেন।
কিন্তু বাস্তবে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ভূখণ্ডকে মহাদেশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য
কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম বা সংস্থার অস্তিত্ব নেই। তাই জিল্যান্ডিয়া পৃথিবীর অষ্টম
মহাদেশ কি না, সেটি কোনো ফোরামের ঘোষণার উপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটিকে সময়ের উপরই
ছেড়ে দিতে হবে এবং জিল্যান্ডিয়া যে একটি মহাদেশ এটি যখন সার্বজনীন জ্ঞানে পরিণত
হবে, তখন হয়তো জিল্যান্ডিয়ার নামও উঠে আসবে পাঠ্যপুস্তকের পাতায়।
