ডাইনোসর বিলুপ্তিঃ কেন হাড়িয়ে গেল বিশালার এই প্রাণীগুলো?

হলিউডের মুভি গুলোর কল্যাণে আমরা সাধারন মানুষেরা ডাইনোসর সম্পর্কে ইতিমধ্যে অনেক কিছুই জেনে গিয়েছি। ৪৫০  কোটি বছর বয়সের এই পৃথিবীতে বহু প্রাণীকুলের আগমন ঘটেছে,  এবং সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন কারণে সেসব প্রাণী নিশ্চিহ্নও হয়ে গিয়েছে। এগুলোর কেউ ছিল স্তন্যপায়ী,  কেউ ডিম ফুটে বাচ্চা দিত,  কেউ ছিল মাংসাশী,  আবার কেউ শাকাহারী। পৃথিবীতে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত হওয়া গণবিলুপ্তির ফলশ্রুতিতে এগুলোর অধিকাংশই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল । এরই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে এক সময় সরীসৃপ প্রজাতির কিছু প্রাণী বসবাস করত। যারা আজকের দিনের সরীসৃপের পূর্বপুরুষ ছিল। কিন্তু আকার আয়তন ও দেখতে বর্তমানে থাকা সরীসৃপ গুলোর থেকে অনেক আলাদা ছিল। এরা পৃথিবীতে প্রায় ১৪ কোটি বছর পর্যন্ত রাজত্ব কায়েম করেছিল। বলছিলাম ডাইনোসরের কথা। কিন্তু এমন কী হয়েছিল যে ডাইনোসর নামের এই বৃহদাকার প্রাণীগুলোর এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো? এটা জানতে হলে আমাদের যেতে হবে আজ থেকে সাড়ে ছয় কোটি বছর আগের পৃথিবীতে। চলুন তাহলে যাওয়া যাক সময়ের ইতিহাসের অতীতে আর দেখে নেয়া যাক এমন কি হয়েছিল যে পৃথিবী থেকে বৃহৎ ডায়নাসোর গুলোর অস্তিত্ব একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। আজকে আমি, ডাইনোসর বিলুপ্তির দিকে এগোনোর পুরো প্রক্রিয়াটা আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার চেষ্টা করব। 

আজ থেকে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি বছর আগে।  পৃথিবীর আবহাওয়া ছিল খুবই মনোমুগ্ধকর। সবুজ পাতার বড় বড় গাছপালা,  উর্বর ঘাস,  সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাস এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেন। তখনো মানুষের সৃষ্টি হয়নি। শুধু বাস করত   বৃহৎ আকারের সরীসৃপ ডাইনোসরেরা। ডাইনোসর নামটি এসেছে গ্রিক ভাষার শব্দ ভয়ঙ্কর টিকটিকি অথবা ভয়ঙ্কর গিরগিটি  থেকে। কিন্তু ডাইনোসরেরা প্রকৃতপক্ষে গিরগিটি বা টিকটিকি জাতীয় কোন প্রাণী নয়।  তারা সরীসৃপ শ্রেণীর অন্তর্গত একটি আলাদা প্রজাতি। এরা ডিম দিত এবং ডিম থেকে বাচ্চা   বের হতো। পৃথিবীতে  ডাইনোসরের জীবাশ্ম প্রথম আবিষ্কৃত হয় উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। সে সময় আবিষ্কার হতে থাকে পর্বত  বা শিলায় আটকে পড়ে থাকা ডাইনোসরের কঙ্কালগুলো। 

পৃথিবীতে যখন ডাইনোসর বিস্তার লাভ করে তখন সেই সময়টাকে বলা হতো মেসোজোয়িক যুগ।  এই যুগটিকে আবার ট্রায়াসিক, জুরাসিক এবং ক্রিটেশিয়াস যুগও বলা হত।  তখন সারা পৃথিবীতে শুধুমাত্র একটি মহাদেশ ছিল।  জুরাসিক যুগে এসে ধীরে ধীরে এই মহাদেশ ভাঙতে শুরু করে এবং সেইসাথে ডাইনোসোরেরা পরস্পর থেকে আলাদা হতে থাকে।  বদলে যেতে থাকে আবহাওয়াও।কিন্তু সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল।  তারা তাদের মত করে একসাথে শান্তিতেই বসবাস করছিল। কিন্তু হঠাত সবার অজান্তেই মহাকাশ থেকে একটা ১২ কিলোমিটার চওড়া অ্যাস্ট্রয়েড বা গ্রহাণু পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছিল। মহাকর্ষীয়  বলের প্রভাবে যখনই গ্রহানুটি পৃথিবীর দিকে প্রবেশ করতে থাকে তখন এর গতিবেগ আরো বেড়ে যেতে থাকে। প্রত্যেক সেকেন্ড যাওয়ার সাথে সাথে এই গ্রহানুটি পৃথিবীর আরো কাছে চলে আসছিল। প্রায় ৭০ হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা বেগে এই গ্রহানুটি পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের মধ্যে প্রবেশ করে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করার সাথে সাথেই গ্রহানুটি বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে একটা আগুনের গোলায় পরিণত হয়। এটা এতোটাই উজ্জ্বল ছিল যে ৮০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকা সমস্ত জীব প্রজাতী অন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে যখন গ্রহানুটির পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তখন একটা ভয়ানক বিস্ফোরণের সৃষ্টি হয়। এই বিস্ফোরণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, পৃথিবীর সঙ্গে এটাক হওয়ার সাথে সাথেই পৃথিবী থেকে কয়েক লক্ষ মেট্রিক টন ধাতু মহাকাশে ছিটকে যায়। গ্রহাণুটি অ্যাটাক করেছিল  আজকের দিনের মেক্সিকো উপসাগর তীরবর্তী ইউকাটান উপদ্বীপ এলাকায়। সেখানে ১৮০ কিলোমিটার চওড়া এবং ২০ কিলোমিটার গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়।  এই গর্তের নিচে থাকা সমস্ত পদার্থ- যেমন সালফার ঘটিত অ্যারোসল,  ছাইসহ প্রচুর বিষাক্ত পদার্থ মেঘের সাথে মিশে গিয়ে বিষাক্ত মেঘে পরিণত করেছিল ।  আর গ্রহাণুর আঘাতে মাটির নিচে থাকা লাভার আগুন মহাকাশে ছিটকে বেরিয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর সেগুলো আবার পৃথিবীর মাটিতে পড়ে যেতে থাকে। সেই সাথে বড় বড় ভূমিকম্প সংঘটিত হতে থাকে।  ভূমিকম্প হওয়ার কারণে সমুদ্র থেকে বড় বড়  সুনামির সৃষ্টি হয়। সেসব সুনামির কারণে  উপকূলে ধাকা সকল প্রাণীদের মৃত্যু ঘটতে থাকে।  গ্রহাণু টির আঘাত এতই বিশাল ছিল যে এর চারপাশের প্রায় ৮০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সমস্ত প্রাণী ও গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। বিস্ফোরণের সময় কালে আলোর ঝলকানি এত বেশি ছিল যে ডাইনোসরের হাড়গোড়  একেবারে স্বচ্ছ দেখা যাচ্ছিল এবং এর ৯০ মিনিট পর পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা হয়ে গিয়েছিল প্রায় ১২৫ সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত। আর আমরা জানি যে এরকম তাপমাত্রায় কোন প্রানীর কয়েক সেকেন্ড পর্যন্ত বেচে থাকাও একেবারে অসম্ভব। সাময়িকভাবে পৃথিবীর অন্য   কোথাও এরা আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করলেও সত্যিকার অর্থে তাদের বেঁচে থাকার কোনো উপায় ছিল না। কারণ, বিস্ফোরণের ফলে পুরো পৃথিবী ধুলোর মেঘে ছেয়ে গিয়েছিল । বিশ হাজার কিলোমিটার প্রতি ঘন্টা  বেগে ধেয়ে আসা ধুলোর ঝড়টি কয়েক কিলোমিটার মোটা ছিল। যার ফলে পৃথিবীপৃষ্ঠ পর্যন্ত সূর্যের আলো পৌঁছানো একেবারে অসম্ভব হয়ে গেছিল। কয়েক বছর পর্যন্ত সূর্যের আলো পৃথিবীর পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌছাতে পারে নি। আর এর ফলে পৃথিবীতে সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়।  সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পৃথিবীর প্রায় সমস্ত গাছপালা ধ্বংস হয়ে যায়। আর আমরা এটা তো সবাই জানি যে, গাছপালা বেঁচে না থাকলে প্রাণীকুলেরও বেচে থাকা অসম্ভব।ইতিমধ্যে গুটিকয়েক ডাইনোসরেরা বেঁচে থাকলেও প্রকৃতির প্রতিকূল পরিবেশে তারাও বেশিদিন বাঁচতে পারেনি। এই বিপর্যয়ের পর অতিমাত্রায় রেডিয়েশন এর ফলে এদের মধ্যে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে । তাই নতুন কোনো ডাইনোসরের জীবন সৃষ্টির কোন উপায় ছিল না। আর এভাবেই ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে ডাইনোসর গোষ্ঠী একেবারের জন্য নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। 

এ সময় ডায়নাসোর সহ পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ  জীব প্রজাতি  একেবারের জন্য হারিয়ে যায়। এই ছিল পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্তির সবচেয়ে বেশি  আলোচিত ইতিহাস।  তবে অনেকে ডাইনোসর বিলুপ্তির কারণ হিসেবে আরও কিছু কারণ যুক্ত করেছেন। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন বিবর্তনের ধারায় তারা এখন অন্য কোন প্রাণীতে পরিণত হয়ে গিয়েছে । অনেকে মনে করেন এক সময় পৃথিবী বিষাক্ত গাছে ছেয়ে গিয়েছিল। উদ্ভিদভোজী ডায়নাসোর এসব গাছ খেয়ে মৃত্যুবরণ করার পর,  মাংসাশী ডাইনোসরগুলোও খাদ্যের অভাবে মৃত্যুবরণ করে। আবার অনেকে- অতিরিক্ত মাত্রায় আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত অথবা বরফ যুগের কারণকেই ডাইনোসর বিলুপ্তির কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। তবে কারণ যাই হোক ডাইনোসর এর মৃত্যু  নতুন এক প্রজাতির আবির্ভাব এর জন্য আশীর্বাদস্বরূপ ছিল।  আর সেই প্রজাতি হচ্ছে  আজকের দিনের স্তন্যপায়ী  প্রাণী। অর্থাৎ আমরা মানুষেরাসহ সকল ধরনের স্তন্যপায়ীদের কথাই বলছি। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব কাল এবং কিভাবে সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে আমরা এই গ্রহে রাজত্ব শুরু করেছিলাম তা আমাদের অনেকেরই অজানা।  পৃথিবীতে ডাইনোসর বিলুপ্তির পর পরই যে মানুষের আবির্ভাব ঘটে তা কিন্তু নয়। এর ভেতরে আরো অনেক স্তন্যপায়ী প্রাণীদের আবির্ভাব ঘটেছিল যেগুলো  মানুষ সৃষ্টির আগেই বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে।  এরকম একটি প্রাণী হচ্ছে  বিশাল আকার ম্যামথ