ব্ল্যাক হোলঃ মহাবিশ্বের এক রহস্যময় দানব
বিস্ময়কর পৃথিবীর মায়াজালের বাইরে, যারা এই মহাবিশ্বকে নিয়ে ভাবেন তারা সবাই হয়তো ব্ল্যাকহোল নামটির সাথে পরিচিত হয়ে থাকবেন। মহাজাগতিক বিষয়গুলোর মধ্যে এক অপার রহস্যের নাম এই ব্ল্যাক হোল। ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর মহাবিশ্বের এমন একটি বস্তু, যা এত ঘন সন্নিবিষ্ট বা অতিক্ষুদ্র আয়তনের যে এর মহাকর্ষীয় শক্তি কোন কিছুকে এর ভেতর থেকে বের হতে দেয় না। অর্থাৎ এখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতই প্রখর যে এর হাত থেকে কোন কিছুই - পালাতে পারে না, এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুততম সত্তা আলোক রশ্মিও। তবে কি এই ব্ল্যাক হোল? কিভাবে এর সৃষ্টি হয়? আর কি’বা আছে মহাজাগতিক এই দানবের ভেতর?
ব্ল্যাক মানে কালো, আর হোল শব্দটির অর্থ গর্ত। তবে ব্ল্যাকহোল বলতে এখানে কোন কালো গর্তকে বুঝানো হয়নি। ব্ল্যাক হোল মহাবিশ্বের এমন একটি স্থান যেখানে খুবই অল্প জায়গায় অনেক বেশি পরিমাণে ভর ঘনীভূত হয়ে আছে।
আচ্ছা, সহজে বোঝার জন্য একটা উদাহরণের আশ্রয় নেয়া যাক।
চলুন, আমরা আমাদের এই মহাবিশ্বকে একটি সমতল পৃষ্ঠের মতো করে চিন্তা করি, অর্থাৎ পুরো মহাবিশ্বকে একটা কাপড়ের টুকরোর মতো করে কল্পনা করি। এবার যদি সেই কাপরের টুকরোর উপর ভারী কোন বস্তু রাখি তাহলে কি দেখবেন? দেখা যাবে যে, যেখানে ভারি বস্তু রয়েছে কাপরের সেই স্থান একটু নিচু হয়ে গিয়েছে। এই একই বাপার ঘটে মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে। যেসব স্থানে ভর অত্যাধিক পরিমাণ বেশি রয়েছে সেইসব স্থানে গর্ত হয়ে আছে। এই অসামাণ্য পরিমাণ ভর এক স্থানে কুন্ডলিত হয়ে স্থান-কাল বক্রতার সৃষ্টি করে। মহাবিশ্বের এই অস্বাভাবিক জায়গাগুলোই হচ্ছে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর। প্রতিটি গালাক্সির স্থানে স্থানে কম-বেশি সব জায়গায় ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্বের কথা জানা যায়। সাধারণত বেশীরভাগ গ্যালাক্সিই তার মধ্যবর্তী ব্ল্যাকহোলকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে।
তবে মহাবিশ্বের স্থানে স্থানে বিভিন্ন গ্যালাক্সীর বিভিন্ন জায়গায় এই ব্ল্যাকহোল গুলো কেন তৈরী হয়েছে অর্থাৎ এতো ভরবিশিষ্ট বস্তুগুলো কোথা থেকে আসলো যে স্থান, কাল এমনকি সময়কে পর্যন্ত বাকিয়ে দেয়?
আমরা প্রথমেই জেনেছি যে, ব্ল্যাক হোল মানে কালো গর্ত। আর এর এই নামকরণের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এর দিকে ছুটে আসা সকল বস্তুই এটি গলাধকরণ করে এমনকি আলোক রশ্মিও এই অবস্থা থেকে রেহাই পায় না। আর একবার ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কোনকিছু ঢুকে গেলে তা আর কখনো বের হয়ে আসে না।
চলুন এবার তাহলে জানা যাক ব্ল্যাক হোলে ঘূর্ণায়মান বিন্দুগুলোর ভর এতো বেশি হয় কেন?
ব্ল্যাক হোলে থাকা বিন্দুগুলো আসলে কোন সাধারণ বিন্দু নয়। প্রত্যেকটি বিন্দুই এক একটি গ্রহ নক্ষত্রের সমপরিমাণ ভরযুক্ত। আর এই বিন্দুগুলোই বিভিন্ন নক্ষত্রের চুপসে যাওয়া সারাংশ।
ধরুন, আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহ তার নিজের কক্ষপথ থেকে ছিটকে কোন ব্ল্যাক হোলের পাশে গিয়ে পড়ল। ব্ল্যাক হোলের ঘটনা দিগন্তের সীমানা পেরোতেই পৃথিবীর সাথে ঘটবে এক ভয়াবহ ঘটনা। ঘটনা দিগন্ত কি সেটা একটু পরে আলোচনা করছি।
ব্ল্যাক হোলের দিকে এগুতে থাকায় পৃথিবীর এক অংশ প্রবল মাত্রায় আকর্ষণ অনুভব করবে। আকর্ষণের টানে গোলাকার পৃথিবী চুইং গামের মত হয়ে যাবে। তারপর একসময় পৃথিবীকে দেখতে নুডুলসের মতো দেখতে লাগবে। অবশেষে একটা সময় পুরো পৃথিবী সংকুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলের একটি বিন্দুতে পতিত হবে। আর সেটাই হবে পৃথিবীর ব্ল্যাক হোল। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে যে, পৃথিবীর ভর একটুও কমবে না। পৃথিবী শুধু ব্ল্যাক হোলের একটি বিন্দুতে পরিণত হয়ে যাবে!
আশা করি ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছেন যে, এই বিন্দুগুলো কেন এতো ভরযুক্ত হয়। এরকম অসংখ্য নক্ষত্রের অস্তিত্ব রয়েছে ব্ল্যাক হোলের প্রতিটি বিন্দুতে। এবার প্রশ্ন আসতে পারে যে, যেহেতু কেউ ব্ল্যাকহোলের আশেপাশে যেতেই পারল না তাহলে বিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারে কিভাবে জানতে পারল?
শুরুতেই বলেছি, ব্ল্যাকহোলের আকর্ষণ এতই বেশি যে, এর থেকে দৃশ্যমান আলো, এক্স-রে, অবলোহিত রশ্মি কিছুই রক্ষা পায় না। এজন্যই ব্ল্যাক হোল আমাদের কাছে অদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা তাই ব্ল্যাকহোল নিয়ে গবেষণা করার সময় খেয়াল করেন ব্ল্যাক হোল তার আশপাশকে কিভাবে প্রভাবিত করছে।
আর খুশির খবর হচ্ছে যে, ব্ল্যাক হোল কোন বস্তুর সাথে বা কোন গ্রহ নক্ষত্রকে কিভাবে প্রভাবিত করছে, তা জানার জন্যে আপনার ওখানে যাওয়ার দরকার নেই। বিজ্ঞানীদের বহু বছরের পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ দূরত্ব থেকেই এটা জানা সম্ভব।
যেহেতু ব্ল্যাকহোল থেকে কোন আলো আমাদের চোখে এসে পৌছায় না, তাই ব্ল্যাকহোলকে কখনো চোখে দেখাও সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের নামে যেটিকে দেখেছে সেটি হচ্ছে, ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত। এটি ব্ল্যাক হোলের সীমানাকে নির্দেশ করে। এই সীমানার ভেতরে কিছু প্রবেশ করলে প্রবল মহাকর্ষ বলের কারণে তা এর অতল গহ্বরে হাড়িয়ে যায়। এমনকি, ঘটনা দিগন্তের ভেতর থেকে নিক্ষিপ্ত আলো এর বাইরের পর্যবেক্ষকের কাছে পৌঁছুতে পারে না। একইভাবে, এর বাইরে থেকে আসা কণার গতিও ধীর হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয় এবং ভেতরে প্রবেশের পর সেই কণাগুলোও অদৃশ্য হয়ে যায়।
ব্ল্যাক হোলের ভেতর কোন বস্তু পতিত হলে সেই বস্তু থেকে সংকুচিত হওয়া বিন্দুটি দেখতে কেমন দেখায় এবং ব্ল্যাক হোলের ভেতরটাই বা দেখতে কেমন, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে যথেষ্ঠ বিতর্ক রয়েছে। মহাকর্ষ থিওরী আমাদেরকে বলছে যে, এটি কেন্দ্রে সংকুচিত হয়ে সিঙ্গুলারিটি বা এককত্ব অর্জন করে এবং কেউ জানে না যে এটি সেখানে দেখতে কেমন দেখায়। তবে বিখ্যাত পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়ের থিওরী হলো- যেহেতু ব্ল্যাক হোল ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়, তাই এটির ভেতর থেকে কিছু না কিছু বের হয়ে আসতে পারে। কিন্তু প্রচলিত মহাকর্ষ তত্ত্বের সঙ্গে তার এ ধারণা সাংঘর্ষিক। হকিং এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে আমৃত্যু গবেষণা করে গেছেন।
আপনি কি এটা জানেন যে, জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে সূর্যের জ্বলে থাকার ক্ষমতাও একসময় শেষ হয়ে যাবে। সূর্যের চেয়ে কমপক্ষে দশগুণ বড় নক্ষত্রদের জ্বালানী শেষ হয়ে গেলে এরা সঙ্কুচিত হতে হতে অতি খুদ্র অন্ধকার বিন্দুতে পরিণত হয়। এধরণের বিন্দুর ব্ল্যাক হোলকে বলা হয় স্টেলার মাস (Stellar Mass) ব্ল্যাকহোল। বেশীরভাগ ব্ল্যাক হোলই এধরণের হয়ে থাকে। কিন্তু নক্ষত্রের সঙ্কুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিণত হওয়ার পরও ব্ল্যাক হোলে নক্ষত্রের সমান ভর ও অভিকর্ষ টান থাকে। আমাদের গ্যালাক্সিতে সম্ভবত ১০০ মিলিয়ন ব্ল্যাক হোল রয়েছে। আর প্রতি সেকেন্ডে একটি করে নতুন ব্ল্যাক হোল সৃষ্টি হচ্ছে।
আরেক ধরণের ব্ল্যাক হোল হচ্ছে সুপার মেসিভ (Super massive) ব্ল্যাক হোল। তাদের এক মিলিয়ন তারার ভর এমনকি এক বিলিয়ন তারার ভরও থাকতে পারে। সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা কোনো গ্যালাক্সির মিলিয়ন বা বিলিয়ন তারাকে একত্রে ধরে রাখে। আমাদের গ্যালাক্সিতেও কিন্তু একটি সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোল আছে যেটি ৪৪ বছর আগে আবিষ্কৃত হয়েছিলো।
কিছু কিছু ব্ল্যাক হোল আছে এতই বড় যে তাদেরকে ‘আলট্রা মেসিভ’ (Ultra massive) ব্ল্যাকহোল নামে ডাকা হয়। এধরণের ব্ল্যাক হোল সূর্যের তুলনায় ১০ বা ৪০ বিলিয়ন গুণ বেশি ভর ধারণ করে থাকে। বিজ্ঞানীদের ধারনা এরা বিলিয়ন বছর আগে তৈরি হয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে ভর অর্জন করে এত বৃহৎ ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে।
বড় ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সৃষ্টি হয়েছে, এটিই একমাত্র রহস্য নয় ! এই ব্ল্যাক হোলরা কিভাবে সহস্র বিলিয়ন তারা ধরে রাখে তাও বিশাল রহস্য। সুপার মেসিভ ব্ল্যাক হোলরা আগে সৃষ্টি হয়েছে নাকি গ্যালাক্সির গুচ্ছ বা ক্লাস্টার আগে সৃষ্টি হয়েছে, তা আজও অজানা।
যদি পৃথিবী থেকে কোন ব্ল্যাকহোলকে দেখতে হয় তাহলে পৃথিবীর সমান বড় কোন টেলিস্কোপ বানাতে হবে। তবুও ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো আমরা মেসিয়ে ৮৭ ছায়াপথের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি অতিভারী ব্ল্যাকহোলকে দেখতে সক্ষম হয়েছি। এই মূহুর্তে স্ক্রিনে যে ছবিটি দেখতে পাচ্ছেন, এটা কম্পিউটার এনিমেশনে করা কোন ব্ল্যাক হোলের ছবি নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত ৮টি বৃহৎ টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত উপাত্তের সংকলন, যাকে সমষ্টিগতভাবে ইভেন্ট হরাইজোন টেলিস্কোপ বলে। এটি হলো প্রথম প্রমাণ যা ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে পূর্বের তত্ত্বকে সমর্থন অথবা প্রত্যাখ্যান করে দিতে পারে। এটি নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। ছবিটির উজ্জ্বল আংটিগুলো হলো অ্যাক্রিশন ডিস্ক অর্থাৎ ঘটনা দিগন্তের ঠিক আগে গ্যাসের কক্ষপথীয় ঘনত্ব। মধ্যখানের কালো স্থানটি হলো ব্ল্যাক হোলের ছায়া। এ ছবিটি বিজ্ঞানীদেরকে ব্ল্যাক হোল সম্পর্কে বিস্তরভাবে গবেষণার দুয়ার খুলে দেয়। হয়তবা এর মাধ্যমেই, মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর তালিকা থেকে ব্ল্যাক হোলের নাম উঠে যাবে একদিন।
এতকিছুর পরেও আমাদের মনে একটা প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যায়, আর সেটা হলো কখনো কি ব্ল্যাকহোল পৃথিবীকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে?
এর সোজাসাপ্টা উত্তর হবে- না।কারণ, পৃথিবী নিজেই কোন দিন ব্ল্যাকহোলে গিয়ে পতিত হবে না। কোন ব্ল্যাকহোলই কিন্তু পৃথিবীর সৌরজগতের এতটা কাছাকাছি নয়। বর্তমানে আমাদের এই গ্যালাক্সীতে যেখানে সূর্য রয়েছে, সূর্যের সমান ভরের একটি ব্ল্যাকহোল যদি ঐ জায়গাতেই প্রতিস্থাপিত হয়, তবুও নয়। আর ব্ল্যাকহোল মোটেও স্পেস বা মহাশুন্যের এতটা কাছে নেই যে, তা কোন তারকা, চাঁদ বা গ্রহ কে তার শিকার বানাতে পারে। সুতরাং আশা করা যায়, ব্ল্যাকহোল আমাদের জন্য অদূর ভবিষ্যতে কোন হুমকির সংবাদ নিয়ে আসছে না।
ব্ল্যাক হোল অর্থাৎ কৃষ্ণগহ্বর এ মহাবিশ্বের অতি রহস্যময় একটি ব্যাপার! আর বিজ্ঞানীরা আঠার মতো লেগে আছে এই রহস্যের পেছনে। হয়তবা একদিন রহস্যের জাল থেকে বেড়িয়ে আসবে এই রহস্যময় ব্ল্যাক হোল। তখন অনেক কিছুই হয়ত ব্যাখ্যা করা যাবে যা এখনো আমরা খুঁজে বেড়াচ্ছি।
