মানব সৃষ্টির ইতিহাসঃ পৃথিবীতে কিভাবে মানুষের সূচনা ঘটে?
আমরা মানুষ। এই আধুনিক সময়ে এসে আমরা কতটা না উন্নত হয়েছি। ছাড়িয়ে গিয়েছি পৃথিবীর মহাসীমা।হারিয়ে গিয়েছি সমুদ্রের অতল গহ্বরে। এখন আমাদের কাছে বিজ্ঞান আছে। এই বিজ্ঞানের সাহায্যে দিনকে দিন আমরা আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছি। সেদিন খুব বেশি দূরে নেই যে আমরা একদিন আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাবো। মহাশূন্যের হাজারো, লাখো আলোকবর্ষ দূরের বিষয়বস্তুকে আরো কাছে থেকে দেখবো। কিন্তু আমরা এই মানুষ। কিভাবে আমরা এতো বুদ্ধিমান? আর কিভাবেই বা আমরা এই মানবীয় মর্যাদার অধিকারী? কিভাবে আমরা এই পৃথিবীতে এলাম? আর কিভাবেই বা আমাদের সৃষ্টি হলো?
এই পৃথিবীতে কোটি বছর ধরে হাজারো লাখো প্রজাতি বসবাস করে আসছে। তাদের মধ্যে বিজ্ঞান মাত্র ১৫% প্রজাতি সম্পর্কে জানতে বা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ আমরা অনুমান করছি আরো ৮৫ শতাংশ জীব প্রজাতি পৃথিবীতে বিদ্যমান। বিজ্ঞানের সাহায্যে আমরা এটাও অনুমান করেছি যে, এই পৃথিবীতে মাত্র ২ লক্ষ বছর আগে মানুষ নামের প্রজাতীর উদ্ভব হয়। এখন আমাদের সবার মনের মধ্যেই একটা প্রশ্নের উদয় হয় যে, কোথা থেকে এবং কিভাবে উদ্ভব হয় মানুষ নামের এই ইন্টেলিজেন্ট প্রজাতীর। মানুষ আগমনের শুরুটা সম্পর্কে বিজ্ঞান অনেক আগেই কিছুটা অনুমান করেছিল এবং আধুনিক বিজ্ঞান এটা নিয়ে এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও আমি আজ বৈজ্ঞানিক সেই থিওরীর মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টির ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবো।
মানুষ সৃষ্টির সূচনা সম্পর্কে জানতে আমাদের একটু অতীতে ফিরে যেতে হবে। অর্থাৎ আজ থেকে ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে । ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে কি হয়েছিল সেটা আমাদের কমবেশি সবারই জানা। আপনি যদি জিওটেল বাংলার নিয়মিত দর্শক হয়ে থাকেন তাহলে বিগত ভিডিওতে আপনি জেনেছেন যে ৬৫ মিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই পৃথিবী থেকে বিশাল আকার ডাইনোসর প্রজাতির বিনাশ ঘটেছিল। আর সেই ডাইনোসর প্রজাতির বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল পৃথিবীতে একটি বৃহৎ আকার এস্ট্রয়েড বা গ্রহাণুর আঘাত। ওই গ্রহাণুর আঘাত এ পৃথিবী থেকে ডাইনোসর সহ ৭৫ শতাংশের বেশি জীব প্রজাতি পৃথিবী থেকে একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। বেঁচে ছিল শুধু মাত্র ২৫% এর ও কম সংখ্যক জীবন । এই ২৫% জীবনের মধ্যে এমন একটি প্রাণী ছিল যারা কিনা গর্ত করে মাটির নিচে বসবাস করত। আর এই প্রাণীটি ছিল এক ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী। মাটির নিচে বসবাস করার কারণে তারা নিজেদেরকে ওই গ্রহাণুর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে পেরেছিল। গ্রহানুর আঘাতে যখন পুরো পৃথিবী ছাই হয়ে গিয়েছিল তখন এর তাপমাত্রা বেড়ে গিয়েছিল ১২৫ সেন্টিগ্রেডেরও বেশি। অত্যন্ত তাপমাত্রা থেকে বাঁচার জন্য এই প্রানীরা মাটির নিচে থাকতে শুরু করে। আর বেঁচে থাকার জন্য সব কিছুকেই এরা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে। মহাপ্রলয়ের কয়েক লক্ষ বছর পর যখন পৃথিবীর সম্পূর্ণরূপে ডাইনোসর থেকে মুক্ত হয়ে গেছে তখন পৃথিবীতে একটি নতুন জীবন গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। ডাইনোসরমুক্ত নতুন পৃথিবীতে আমাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষেরা আস্তে আস্তে বিকশিত হচ্ছিল। অর্থাৎ গর্তের ওই প্রাণীগুলো আকারে আগের তুলনায় বেশ বড় হচ্ছিল। কিন্তু তখনও এদের দেখতে মোটেও আমাদের মত লাগছে না। কারণ এদেরকে আরো বিভিন্ন প্রজাতিতে বিকশিত হতে হবে। আজ থেকে প্রায় ১৭ কোটি বছর আগে পৃথিবীর পরিবেশ আজকের বর্তমান পৃথিবীর মতোই হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ পৃথিবী তখন বিভিন্ন প্রাণীকুলের জন্য বাসযোগ্য হয়ে গিয়েছিল। তখন পৃথিবীর তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর প্রায় ২৪ ঘন্টায় একদিনের সূচনা ঘটল। আস্তে আস্তে পৃথিবীকে দেখতে বর্তমানের মতো দেখতে হয়ে গিয়েছে। এর মধ্যে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেট নড়াচড়া করতে শুরু করে যা পৃথিবীর বড় বড় দুটি দ্বীপকে একে অপরের কাছে নিয়ে আসছিল। এটা সেই ভূখণ্ড যেখানে বর্তমানে আমি আপনি বসবাস করছি। অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশ। বর্তমানের ভারতীয় উপমাদেশটি খুব দ্রুতই এশিয়ার দিকে এগিয়ে আসছিল। এভাবে এগোতে এগোতে যখন দ্বীপটি এশিয়া মহাদেশের সাথে ধাক্কা খায়, তখন একে অপরের আঘাতের কারনে তৈরি হয় নতুন এক পর্বতমালার। আর এটা হল পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতমালা হিমালয়। কিন্তু তখনো পৃথিবীতে কিছু একটার অভাব ছিল। আর সেটা হল মানুষ।
আজ থেকে প্রায় চল্লিশ লক্ষ বছর পূর্বে আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আরেকটি নতুন পর্বতশৃঙ্গের সৃষ্টি হয়।এই পর্বতটি এখানে আগত মৌসুমী বাতাসের আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। একারণে এখানকার জঙ্গলে বৃষ্টি হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। আর এই জঙ্গলেই থাকতো শিম্পাঞ্জীর একটি প্রজাতি। এরা সাধারণত গাছের উপরে থাকত এবং সেখানে তাদের খাবারের কোনপ্রকার অভাব ছিল না। যার কারণে তাদের গাছ থেকে নামারও তেমন কোনো প্রয়োজন হতো না। কিন্তু এখানে সময়ের সাথে সাথে খড়া পড়তে শুরু করে এবং বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সম্পূর্ণ জঙ্গল ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। তাই এদের খাবারের সংকট দেখা দেয়। খাবারের খোঁজে তারা এরপর গাছ থেকে নামার সিদ্ধান্ত নেয়। আর তারপর এদের নাম হয় এডিপেথিকাস রেমিটাস। বিবর্তনবাদের থিওরী অনুযায়ী এরাই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষ যারা একটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়।এদের ব্রেইন ছিল সাইজে একটি আপেলের মতো এবং উচ্চতায় ছিল ৪ ফুটের মতো লম্বা।এভাবে কয়েক হাজার বছর যাওয়ার পর এরা আস্তে আস্তে দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে চলতে শুরু করে। এতে শারীরিক শক্তির অপচয় কম হতো এবং হাঁটাচলা করার মাঝেই এরা খেতে পারতো। আর তাদের ব্রেন সময়ের সাথে সাথে দ্রুতগতিতে বিকশিত হচ্ছিল। একসময় তারা পাথর দিয়ে হাতিয়ার তৈরি করা শিখে ফেলে। যার ফলে তাদের পক্ষে শিকার করা আরও সহজ হয়ে যায়। এভাবে চলতে চলতে একসময় এরা আগুনের ব্যবহারও শিখে যায়। আগুনের আবিষ্কার ছিল পৃথিবীর মাটিতে মানুষের প্রথম কোন বৃহৎ আবিষ্কার। এই আগুন এদেরকে আলো আর অন্ধকারে সুরক্ষা প্রদানে সাহায্য করতো। সুরক্ষা ও বসবাসের সুবিধার্থে আস্তে আস্তে এরা সামাজিকভাবে বসবাস করতে শুরু করে। আর এই কারনেই ধীরে ধীরে তৈরী হতে থাকে পরিবার ও সমাজ। এরপর থেকে তারা একসাথে থাকতে শুরু করে যার ফলে যেকোন বিপদ থেকে আরো অধিক সুরক্ষিত থাকতো। আগুন আবিষ্কারের পর থেকে এরা মাংস পুড়িয়ে খেত এবং এর অতিরিক্ত এনার্জি তাদের ব্রেনের বিকাশে সাহায্য করত। ধীরে ধীরে এরা বেশ বড় হয়ে যায় এবং নামকরণ করে নতুন প্রজাতি হোমো ইরেক্টাস নামে। এদের ব্রেন ধীরে ধীরে আরো বড় হতে থাকে এবং তখনকার পৃথিবীতে এরাই ছিল অন্যসব পশুদের চেয়ে অধিক বুদ্ধিমান। আর একসাথে মিলেমিশে থাকা প্রথম কোন প্রাণী। ধীরে ধীরে এরা মনের ভাব প্রকাশের জন্য আলাদা আলাদা উচ্চারণ করতে থাকে যার থেকে এই ভাষার সৃষ্টি হয়। আর এটাই ছিল হমো ইরেক্টাসের সর্বশেষ উপলব্ধি।
এরপর ধীরে ধীরে বিকশিত হতে হতে সৃষ্টি হয় এক নতুন প্রজাতীর। আর তা হচ্ছে হমো সেপিয়েন্স। অর্থাৎ আমরা আধুনিক মানুষেরা। এর পরেও মানুষ বিকশিত হতে থাকে। আজ থেকে প্রায় ২ লক্ষ বছর আগে কয়েক বছরের বিকাশক্রমের পর আমাদের অস্তিত্বের শুরু হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং পরিণত প্রাণী হিসেবে যাত্রা শুরু হয় হমোসেপিয়েন্স বা মানুষ জাতির।
মানবজাতি সৃষ্টির ইতিহাস নিয়ে এটাই ছিল এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানের একমাত্র অনুমান যা চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদ তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত। এই এভুলুশন থিওরী বা বিবর্তনবাদ বিজ্ঞানের অংশ হলেও আধুনিক বিজ্ঞান ও অনেক বিজ্ঞানী আছেন যারা ডারউইনের এই থিওরীর সাথে ভিন্নমত পোষণ করেন। তবে যাই হোক, এই থিওরীটি এখনো প্রতিষ্ঠিত কোন তত্ত্ব নয়। কারণ তথ্য, তত্ত্ব, ধারনা, অনুমান, প্রমাণ এবং পর্যবেক্ষণ এই বিষয়গুলোর কোন একটির অভাব থাকলে সেই বৈজ্ঞানিক পরিক্ষণটি তখনো অপেক্ষমান অবস্থায় থাকে। যেটি আমরা এভুলুশন থিওরীর ক্ষেত্রে দেখতে পাই।
আমরা যদি একটু লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে, বিবর্তনবাদের থিওরীতে ডারউইন তার নিজস্ব চিন্তাতেই উপসংহার টেনেছেন এবং তার এই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে তিনিও সন্দিহান প্রকাশ করেছিলেন। তবুও বিবর্তনবাদ আজো আলোচিত একটি সাব্জেক্ট। এর বহু কারণ রয়েছে… সেটা নিয়ে আজ আর আলোচনা নয়।
আমরা বিজ্ঞানকে জানি এবং জানতে ভালোবাসি। কারণ, এটি আমাদের রোমাঞ্চিত করে। কিন্তু এই বিজ্ঞান সবসময়ের জন্যই পরিবর্তনশীল। নতুন কোন আবিষ্কার পুরোনো কোন তত্ত্বকে এক নিমিষেই ধ্বংস করে দিতে পারে। একদিকে, থিওরী ছাড়া যেমন বিজ্ঞানের প্রমাণ অসম্ভব তেমনিভাবে প্রমাণ ছাড়া কোন থিওরী বা তত্ত্ব ততটাই মূল্যহীন। অর্থাৎ সেই থিওরীকে কোনভাবে কোনকিছুর মানদন্ড হিসেবে দাড় করানো যায় না। পৃথিবীর সবকিছুই বিবর্তিত হয়। তেমনি আমরাও প্রতিদিন বিবর্তিত হচ্ছি। তবে একমুষ্ঠি সময়ের ব্যবধানে এই পরিবর্তনকে অনুভব করা যেমন আমাদের সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব, তেমনি কঠিন বিজ্ঞানের কাছেও। কারণ, বিবর্তন কখনো একদিনে হয়ে যেতে পারে না। এর জন্য অপেক্ষা করতে হয় বিলিয়ন বিলিয়ন বছরেরও বেশি সময়। তারপরেও ততটুকুই বিবর্তিত হবে যতটুকু তার জিনের মধ্যে জেনেটিক কোড দ্বারা এনকোড করা থাকবে। তাই বিজ্ঞানের পক্ষে এটার সঠিক অনুমান লাগানো খুবই কষ্টকর যে, আমরা কোথা থেকে এবং কিভাবে এসেছি। আর অনুমান করে থাকলেও সেটা শুধু অনুমানই, কোন প্রমান নয়।
