সেক্সোমনিয়াঃ ঘুমের মধ্যে যৌনমিলন
স্লীপ ওয়াকিং বা ঘুমের মধ্যে হাটা, এটা আমাদের জন্য খুবই পুরোনো একটি শব্দ। অনেকেই হয়ত কখনো এরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীনও হয়েছেন। এর মাঝে ঘুমের ঘোরে কথা বলার অভ্যাসও আমাদের অনেকের আছে। কিন্তু সম্প্রতি একটি গবেষণা বলছে, ঘুমের ঘোরে শুধু হাঁটা কিংবা কথা বলাই নয়, কিছু মানুষ যৌনমিলনেও লিপ্ত হচ্ছেন। যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় সেক্সোমনিয়া অর্থাৎ স্লীপ সেক্স ডিজিজ। জিওটেল বাংলার আজকের এই পর্বে আমরা বিরল রোগ সেক্সোমনিয়ার আদ্যোপান্ত জানার চেষ্টা করবো।
সেক্সসোমনিয়া একটি বিরল ব্যাধি যা আমাদের ঘুমের অস্বাভাবিক অভ্যাসের কারণে হয়ে থাকে। ইনসোমনিয়া যেখানে ঘুমের সমস্যা, সেক্সোমনিয়া সেখানে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকে বোঝায়। অনেকে হয়ত এটাকে স্বপ্নদোষ বা এরকম কিছু ভেবে ভুল করতে পারেন। তবে সেক্সোমনিয়া ও স্বপ্নদোষ সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়। সেক্সোমনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত ঘুমের মধ্যে সম্পূর্ণরূপে মাস্টারবেশন কিংবা পার্টনারের সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হয়। কিন্তু ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর, ঘুমের মধ্যে কি ঘটেছিল সে সম্পর্কে তারা কিছুই মনে করতে পারে না। আপনি যদি একজন মেয়ে হয়ে থাকেন তাহলে একটু কল্পনা করে দেখুন তো- হঠাৎ একদিন বুঝতে পারলেন যে আপনি আপনার কুমারীত্ব হারিয়েছেন কিন্তু এ ব্যাপারে আপনি কিছুই জানেন না।
গবেষকদের মতে, এই সেক্সোমনিয়ায় আক্রান্তরা ঘুমের মধ্যে হাটা ও কথা বলা এমনকি হেটে হেটে বাইরে গিয়ে অন্য কোথাও যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার মত ভয়াবহ কান্ড ঘটাতে সক্ষম।
ঘুমের মধ্যে এমন যৌনকর্ম ক্ষতিকর হোক কিংবা আনন্দদায়ক হোক, বাস্তবিক অর্থে এর ফলস্বরূপ একজনের পরিণতি কিন্তু মারাত্মক হতে পারে।
আসুন, প্রথমে জানা যাক অদ্ভুত এই ঘটনার পেছনের বিজ্ঞান সম্পর্কে।
সেক্সোমনিয়া হচ্ছে এক ধরনের প্যারাসোমনিয়া। প্যরাসোমনিয়া বলতে আমাদের ঘুমের মধ্যে ঘটে যাওয়া সকল অস্বাভাবিক কার্যকলাপকে বোঝায়।
স্লিপওয়াকিং এবং স্লিপ টকিং আমাদের কাছে খুবই সাধারণ এবং পরিচিত। কিন্তু দেখা যায় এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে আমরা অনেক সময় অনেক ধরনের কান্ড ঘটিয়ে ফেলি। যেমন ঘুমের মধ্যে খাওয়া, বিভান্তিকর উত্তেজনা অনুভব করা, কথা বলা- অনেক সময় নোংরা অকথ্য ভাষা ব্যবহার করা, কল্পিত দানবের সাথে লড়াই কিংবা তাদের হাত থেকে পালানোর চেষ্টা ইত্যাদি।
এক এক ধরনের প্যারাসোমনিয়া ঘুমের এক এক স্লীপ সাইকেলে হয়ে থাকে।
বিছানায় শোয়ার কয়েক মিনিট পরেই আমরা ঘুমের লাইট স্লিপ পর্যায়ে চলে যাই। যাকে হালকা ঘুম বলা হয়। এটা হল ঘুমের প্রথম ধাপ। এর পরেই আমরা এর ২য় স্তরে প্রবেশ করি। আর ঘুমের এই পর্যায়টিকে লাইট স্টেইজ বলা হয়ে থাকে এবং এটি সংক্ষিপ্ত ঘুমের জন্য আদর্শ পর্যায়। অবশেষে ৩য় ও ৪র্থ পর্যায়ে আমরা ঘুমের গভীর স্তরে প্রবেশ করি। এ পর্যায়কে নন REM পর্যায়ও বলা হয়ে থাকে। ঘুমের এ পর্যায়ে এসে আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, শক্তি বৃদ্ধি ও আমাদের শরীরের টিস্যু মেরামতের প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এরপর আমরা ৯০ মিনিটের জন্য Rapid Eye Movement বা ঘুমের REM পর্যায়ে চলে যাই। এ পর্যায়ে এসে আমাদের মস্তিষ্ক আরো একটিভ হয়ে ওঠে এবং ঘুমের এ স্তরেই আমরা স্বপ্ন দেখে থাকি।
কিন্তু সেক্সোমনিয়ার ঘটনা ঘটে থাকে ঘুমের নন REM পর্যায়ে অর্থাৎ ঘুমের ৩য় ও ৪র্থ স্তরে। যেহেতু এটি ঘুমের গভীরতম পর্যায় তাই স্বাভাবিকভাবেই এখানে মন একটু অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকে।
নন REM পর্যায়ে- মস্তিষ্কের যে অংশগুলো দৃষ্টি, গতি এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রন করে সেগুলো বরাবরই একটিভ থাকে কিন্তু স্মৃতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং যৌক্তিকতা নিয়ন্ত্রনকারী অঙ্গগুলো ঘুমিয়ে থাকে। বেশিরভাগ ধরনের প্যারাসোমনিয়া নন REM ঘুমের সময় ঘটে থাকে, যার মধ্যে রয়েছে ঘুমের মধ্যে হাটা, কথা বলা ইত্যাদি। কিন্তু এছাড়াও কিছু ব্যাধি রয়েছে যেগুলো ঘুমের REM পর্যায়েও ঘটতে পারে। এর একটি বড় উদাহরণ হচ্ছে বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস। এক্ষেত্রে, ঘুম ভাঙ্গার পর আপনার মনে হবে যে, পুরো শরীর অসাড় হয়ে গেছে। হাত পা নাড়ানোর মতো অবস্থায় নেই। মুখ দিয়েও কোন আওয়াজ করতে পারছেন না। চিকিতসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি হলো গভীর ঘুম ও জাগরণের মাঝামাঝি একটি স্নায়ুজনিত সমস্যা। যাই হোক, স্লিপ প্যারালাইসিস নিয়ে না হয় অন্য কোন দিন আলোচনা করা যাবে।
সেক্সোমনিয়া ঘটে থাকে সাধারণত গভীর ঘুমের সময়। তাই যখন আমরা জেগে উঠি তখন তা আর মনে করতে পারি না। সুতরাং এ ব্যাপারে কোন ক্লু খুজে বের করাও কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।
তবে ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর ভারী ভারী শ্বাস প্রশ্বাস নেওয়া, ঘাম হওয়া, প্রচণ্ড উত্তেজনা অনুভব করা, হার্টবীট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি লক্ষণ থেকে সেক্সোমনিয়ার ঘটনা সম্পর্কে আন্দাজ করা সম্ভব।
এতোক্ষনে যদিও আমরা সেক্সোমনিয়া সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনে গেছি তবুও এ বিষয়টা এখনো অনেকখানি অস্পষ্ট। এর কারন কি? এটা কতবার হয়? আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না।
স্বাভাবিকভাবেই, বিজ্ঞানীদের জন্য সেক্সসোমনিয়া নিয়ে গবেষণা করা বেশ চ্যালেঞ্জিং একটি ব্যাপার। আপনি বারবার এই আশায় ২জন মানুষকে ঘুম পাড়াতে পারবেন না যে, তারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যৌনকর্ম সম্পন্ন করবে। আর আপনি তা বসে বসে মনিটর করবেন। তারপর আবার শত শত দম্পতির ওপর আবার ঐ একই পরীক্ষাটি চালাতে হবে । কারণ এসব ক্ষেত্রে যেকোন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য একটি বড় আকারের নমুনা প্রয়োজন। তাই, কাজটি খুবই কষ্টসাধ্য একটি ব্যাপার। সুতরাং মনে হচ্ছে, আমরা হয়তবা এ ব্যাপারে অনেকদিন পর্যন্ত অন্ধকারেই থেকে যাবো।
তবে সেক্সোমনিয়া সম্পর্কে যে একেবারে কিছুই জানা যায় নি তা কিন্তু নয়। এ ব্যাপারে বেশ কিছু থিওরিও আছে। অনেক গবেষক মনে করেন ব্যস্তময় জীবনের প্রাত্যহিক ক্লান্তি, অ্যালকোহল, মাদক দ্রব্য, উদ্বেগ এবং অস্বাভাবিক ঘুম ইত্যাদি বিষয়গুলো সেক্সোমনিয়ার কারণ। এছাড়া অনেকে এটাও মনে করেন যে, অবৈধ শারীরিক সম্পর্কের কারণেও একজন সেক্সোমনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন। তাই, যে কোন ধরনের মাদক গ্রহণ করা, ভোর পর্যন্ত পার্টি করা, কিংবা অবৈধ যৌনক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়া কখনো জীবনকে উপভোগের বিষয়বস্তু হতে পারে না। না হতে পারে বিষন্নতা থেকেও মুক্তির উপায়।
সেক্সোমনিয়া একজনের জীবনকে যে মারাত্মকভাবে দূর্বীষহ করে তুলতে পারে তার উদাহরণ আপনি ধীরে ধীরে বাস্তবিকভাবেই পেয়ে যাবেন।
যদিও এটা নিয়ে গবেষণা করা খুবই কঠিন একটি ব্যাপার, তবে এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। সেক্সসোমনিয়ার প্রথম ঘটনা রিপোর্ট করা হয় ১৯৮৬ সালে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মানে এই ২০২০ সাল পর্যন্ত মাত্র ১৯৪টি ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। তার মধ্যে এদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ২০১৭ সালে বব নামের এক ব্যক্তির সাথে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সফলভাবে নির্ণয় করা সম্ভব হয়েছে।
ঘটনাটি হচ্ছেঃ
বব একদিন রাতে স্বাভাবিকভাবেই তার বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে যায়। ঘটনাক্রমে, সেই রাতে সে সেখানেই থেকে যায়। তাদের সাথে একটি বাচ্চাও ছিল। বব ঘুম থেকে উঠে দেখে তার বান্ধবী প্রচন্ডভাবে চিৎকার করছে এবং ববকে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে।
এটা শুনে সে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল এবং সেই সাথে ভীত ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, সে এরকম কিছুই করে নি।
কিছু বুঝে উঠতে না পেরে সে অতি দ্রুত তার বাড়ি থেকে চলে আসে।
কিন্তু, বব এখনো বুঝে উঠতে পারছে না যে তার সাথে এটা কি হয়েছিল।
বব একজন ভদ্র ও চিন্তাশীল মানুষ ছিলেন। তার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব এটা কেউ বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এটা সে করেছিল এবং একটি নয়, এই ঘটনার পরেও পর পর একাধিকবার।
এক পর্যায়ে এসে, বব একজন চিকিৎসকের অধীনস্থ হয় যিনি তার ব্যাধিকে বিরল রোগ সেক্সোমনিয়া বলে ইঙ্গিত করেন। অবশেষে সে পুরো ব্যাপারটি বুঝতে সক্ষম হয়। আক্ষরিক অর্থে আসলে পুরো ঘটনা জুড়েই সে তখন ঘুমাচ্ছিল। ব্যাপারটি সত্যিই সেক্সোমনিয়া কিনা তা যাচাই করার জন্য তাকে লন্ডনের একটি স্লিপ ক্লিনিকে পাঠানো হয়। তারা তার ব্রেইনকে মনিটর করলো এবং কিছু বিস্ময়কর ফলাফল দেখতে পেল। সকল পরীক্ষা নিরীক্ষার পর অবশেষে তাকে সেক্সোমনিয়ায় আক্রান্ত রোগী হিসেবেই চিহ্নিত করল। একটু কষ্ট করে গুগল করলে আপনি এরকম আরো কিছু ঘটনার হদিস পেয়ে যাবেন। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতি ১০জনে ১জন এই রোগে আক্রান্ত। ব্যাপারটি গোপনীয় হওয়ায় এ ব্যাপারে সবাই আলোচনা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। আপনিও কি কোনভাবে এই রোগে আক্রান্ত? মিলিয়ে নিন।
