কাঞ্চনজঙ্ঘাঃ পৃথিবীর ৩য় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ!


উচ্চতার দিক থেকে মাউন্ট এভারেস্ট এবং কে-টু এর পরে যে পর্বত শৃঙ্গটি রয়েছে সেটি হচ্ছে অনুপম সৌন্দর্যের গিরিস্তুপ “কাঞ্চনজঙ্ঘা”। এটি পৃথিবীর ৩য় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ। ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য এবং টাইগার হিলের চিত্তাকর্ষক সূর্যোদয় দেখার জন্য প্রতিবছর হাজারো পর্যটক এখানে আসা যাওয়া করেন। এছাড়াও বরফে ঢাকা মোহনীয় কাঞ্চনজঙ্ঘার রয়েছে চমকপ্রদ ইতিহাস ও নানান উপকথা।

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বরফের মজুদ আছে উত্তর মেরু এবং দক্ষিণ মেরুতে। এই  দুই মেরুর কথা যদি বাদ দেই তাহলে সবচেয়ে বেশি বরফ ধারণ করে রেখেছে হিমালয় পর্বতমালা। আর এই হিমালয়ের সবচেয়ে বড় পর্বতশৃঙ্গ হচ্ছে মাউন্ট এভারেস্ট। আর “মাউন্ট এভারেস্টের” পরেই যে শৃঙ্গটির নাম আসবে সেটি হচ্ছে “কাঞ্চনজঙ্ঘা”। এটিও হিমালয় পর্বতমালার একটি পর্বতশৃঙ্গ। তাই হিমালয় পর্বতমালায় ২য় এবং পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ হচ্ছে এটি। কাঞ্চনজঙ্ঘার উচ্চতা প্রায় ২৮,১৬৯ ফুট  বা ৮,৫৮৬ মিটার। এটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। হিমালয় পৰ্বতের এই অংশটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমল বলা হয়। এর পশ্চিমে তামূর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী ও জংসং লা শৃঙ্গ, এবং পূর্বদিকে তিস্তা নদী অবস্থিত।

কাঞ্চনজঙ্ঘা মাউন্ট এভারেস্টের ১২৫ কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এর ৫টি শৃঙ্গ রয়েছে যেগুলো হচ্ছে- kanchenjungha main, Kangchenjunga West, Kangchenjunga Central, Kangchenjunga South, এবং K áng bǎ chén (কে আং বা চেন)। এর মধ্যে কাঞ্চনজঙ্ঘা মেইন, সেন্ট্রাল এবং সাউথ শৃঙ্গগুলো অবস্থিত ভারতের সিকিম জেলা ও নেপাল সীমান্তে আর বাকী দুটি শৃঙ্গ অবস্থিত নেপালের তাপ্লেজুং জেলায়। আর Kanchenjungha main হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় শৃঙ্গ। পাঁচটি পর্বতচূড়া হওয়ার কারণে একে “তুষারের পাঁচটি ঐশ্বৰ্য” বলা হয় এবং সিক্কিম ও দার্জিলিংয়ের স্থানীয় লোকেরা একে পবিত্র মনে করে পূজা অর্চনা করে থাকে। 

কাঞ্চনজঙ্ঘা নামটি এসেছে স্থানীয় শব্দ "কাং চেং জেং গা" থেকে যার অর্থ " তুষারের পাঁচ ধনদৌলত "। এই ধনদৌলত ঈশ্বরের পাঁচ ভান্ডার স্বর্ণ, রূপা, রত্ন, শস্য, এবং পবিত্র পুস্তক এর প্রতিনিধিত্ব করে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, ১৮৫২ সালের আগে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে পৃথিবীর সৰ্বোচ্চ শৃঙ্গ বলে ধারণা করা হত। কিন্তু পরবর্তীতে ভারতের বৃহৎ ত্রিকোণমিত্রিক জরীপে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল যে PEAK XV নামে পরিচিত মাউন্ট এভারেস্টই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ।
জয়ী ব্রাউন এবং জর্জ ব্যান্ড নামে দুইজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহী সর্ব প্রথম ১৯৫৫ সালের ২৫ মে কাঞ্চনজংগা সামিট করেন। আরো কিছু পুনঃনিরীক্ষণ করার পর ১৮৫৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ।

কাঞ্চনজঙ্ঘার মোহনীয় রূপ যে কাউকে সত্যিই মোহিত করতে বাধ্য। কারন, সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাতে থাকে এর রূপ। প্রথমে টুকটুকে লাল, হঠাৎ সেই লাল পাল্টে হয়ে যায় কমলা রঙ, তারপর হলুদ, সবশেষে সাদা। এভাবে চলতেই থাকে। 

কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য মোহনীয় ও মনোমুগ্ধকর হলেও এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু মিথ। বলা হয়ে থাকে এর আশেপাশের অঞ্চলটি একটি পর্বত দেবতার বাসস্থান। যাকে বলা হয় “কাঞ্চনজঙ্ঘা ডেমন” যেটি এক প্রকার ইয়েতি বা রাক্ষস। ১৯২৫ সালের একটি ব্রিটিশ ভূতাত্ত্বিক অভিযানে অদ্ভুত এক দু-পায়ী প্রাণীর দেখা পাওয়া যায়। স্থানীয়দের এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তারা একে “কাঞ্চনজঙ্ঘা রাক্ষস” বলে অভিহিত করে। অনেকে এটাও মনে করেন যে, অমরত্বের রহস্যও নাকি এর শ্বেতশুভ্র শৃঙ্গের নীচে লুকানো আছে। 

কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করতে হলে আপনাকে যেতে হবে নেপাল কিংবা ভারতের সিকিম। ভারতের দার্জিলিং থেকে শুরু হয় এক্সপিডিশন। আপনি যদি কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় আরোহন করতে চান সে ক্ষেত্রে আপনাকে প্রায় ২০০০০-২৫০০০ ডলারের উপরে খরচ করতে হবে যা বাংলাদেশি টাকায় দ্বারায় ২১ লক্ষ টাকার উপরে।
এছাড়াও আপনি যদি দূর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান তাহলে চলে যেতে পারেন দার্জিলিং এর টাইগার হিল এ যেখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ৮ হাজার ৪৮২ ফুট বা ২ হাজার ৫৯০ মিটার। 
তবে আশাব্যঞ্জক কথা হচ্ছে এটা যে, কাঞ্চনজঙ্ঘাকে দেখতে আপনাকে দেশ না ছাড়লেও হবে। প্রতিবছর অক্টোবর থেকে নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের সীমান্তে বাংলাবান্ধা থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। অর্থাৎ আকাশে যখন মেঘ থাকেনা, আবার কুয়াশা পড়াও শুরু হয়নি, ঠিক সেই সময়ে।
বন্ধুরা, কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরুপ সৌন্দর্যকে ধারন করতে অক্টোবর কিংবা নভেম্বরের যেকোন দিন চলে যেতে পারেন পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া উপজেলায়। আর ইতিমধ্যে যদি গিয়ে থাকে তাহলে আপনার অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করতে পারেন।