টাইম ট্রাভেল কি সম্ভব? (২য় পর্ব)
টাইম ট্রাভেল। নামটি শুনলেই চোখের সামনে কাল্পনিক জগতের একটি গোল টাইম মেশিন ভেসে ওঠে। যেখানে প্রবেশ করলেই মানুষ চলে যায় ভবিষ্যতে কিংবা অতীতে।
যেহেতু অতীত ও ভবিষ্যতের কথা উঠলো তাহলে একটু সময়ের ব্যাপারে আলোচনা করা যাক। আমরা অনেকেই বলে থাকি সময় নদীর স্রোতের মতো সামনে এগিয়ে চলে কিন্তু আমাদের এটাও জানার কথা যে সময় একটি স্কেলার রাশি যার কোন দিক নেই। যদি সহজ ভাষায় বলি তাহলে সময় আসলে একটা চলন্ত ট্রেনের মতো যেটার প্রথম বগিকে বলা যায় বিগ ব্যাং যেখান থেকে এই মহাবিশ্বের যাত্রা শুরু এবং শেষ বগিকে বলা যায় এই ইউনিভার্সের শেষ সময়। এবং আপনি যে ই বগিতে বসে আছেন সেটা আপনার সময়. অর্থাৎ সময় কোন নির্দিষ্ট দিকে চলছেনা... বরং সময় ইউনিভার্সের শুরু থেকে এ পর্যন্ত চলন্ত একটা ট্রেনের মতো শেকলে আবদ্ধ, যার প্রতিটি বগি সময়ের এক একটা ধাপ। আপনার বগি থেকে যদি সামনের বগিতে এগিয়ে যান তাহলে ওই বগির মানুষদের কাছে যেটা বর্তমান আপনার কাছে সেটা ভবিষ্যত বলে মনে হবে একই ভাবে পেছনের বগিতে থাকা মানুষগুলো আপনার জন্য অতীত ,আর এটা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে।
অভিকর্ষের জন্য যেভাবে টাইম ডায়ালেশন ঘটে থাকে সেভাবে গতির জন্যেও টাইম ডায়ালেশন হয়। আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি অনুযায়ী যদি কোন ব্যাক্তি কোন মাধ্যমে দ্রুত গতিতে যাত্রা করে তাহলে তিনি সময়কে ধীর গতির মনে করবেন তার তুলনায় যিনি ধীর গতিতে চলছেন। এই ব্যাপারটি আমাদের ইউনিভার্সের সাথে দৃঢ়ভাবে যুক্ত। এরকমই কিছু ব্যাপার আছে যেগুলোর উপর ভিত্তি করে টাইম ট্রাভেলের ধারনাটি বিজ্ঞানীদের মাথায় এসছে।
টাইম ট্রাভেল আসলে সময় ভ্রমন। সময়ের অক্ষ বরাবর ভ্রমণ। এই সময়ের অক্ষ বরাবর ভ্রমনকে বা স্থান পরিবর্তনকে বলা হয় কালমাত্রিক সরণ। এক সময় থেকে আরেক সময়ে পরিভ্রমণকে আমরা সময় ভ্রমণ বলে থাকি। এটি হতে পারে অতীতে ভ্রমণ, আবার এ ভ্রমন হতে পারে ভবিষ্যতের দিকেও। ইতিহাসে বহুবার টাইম ট্রাভেলের মত রহস্যজনক ঘটনার দেখা পাওয়া যায় এবং সেটার কিছু অংশ আমি আগের আলোচনায় (১ম পর্বে) দেখানোর চেষ্টা করেছি। সেখানে আমরা জেনেছি যে, কিভাবে পদার্থবিদ্যা ও কোয়ান্টামতত্ত্ব দাবি করে যে টাইম ট্রাভেলিং সম্ভব।
তাত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বলে যে টাইম ট্রাভেলিংয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যতে পারি দেওয়া সম্ভব কিন্তু অতীতে ভ্রমন সম্ভব নাও হতে পারে। কিন্তু কেন? তার আগে বলে নিচ্ছি টাইম ট্রাভেলের মাধ্যমে কিভাবে ভবিষ্যতে ভ্রমন সম্ভব হতে পারে।
অস্ট্রিয়ার প্রখ্যাত গণিতবিদ কুর্ট গডেল গণিতের মাধ্যমেই দেখিয়েছেন যে আমাদের এই ব্রহ্মাণ্ডে কিছু Closed Timelike Curve থাকা সম্ভব যা নির্দেশ করে সময়ভ্রমণও সম্ভব। আবার অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুসারেও সময় ভ্রমণ সম্ভব। আপেক্ষিকতা অনুসারে কোনো বস্তু যখন আলোর গতিতে চলবে তখন তা হয়ে যাবে ভরশূন্য। আর যদি আলোর গতিতে চলে যায় তবে সময় স্থির হবে, মানে টাইম ট্রাভেল হবে। ধরুন, আপনাকে আলোর গতিতে ছুটে চলতে পারে এমন কোনো একটি মহাকাশযানে উঠিয়ে দেয়া হল এবং আপনি ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন মহাজগতের এপার থেকে ওপার। কিন্তু পৃথিবীতে এসে দেখবেন অনেক বছর সময় কেটে গেছে যেখানে আপনার কাছে মনে হবে মাত্র অল্প কিছু সময়।
আবার, আপনি যদি কোনো মহাকাশযান নিয়ে ব্ল্যাকহোলের আশপাশে ভ্রমণ করতে থাকেন আর অন্য একটি মহাকাশযান যদি পৃথিবীর চারদিকে ভ্রমণ করতে থাকে তবে ব্ল্যাকহোল ভ্রমণকারীর বয়স, পৃথিবীর চারপাশে ঘোরা ব্যক্তির বয়সের অর্ধেক হয়ে যাবে।
এবার আসুন ওয়ার্মহোলের সাহায্যে টাইম ট্রাভের একটা পরিক্ষা হয়ে যাক। ধরুন, আপনি সৌরজগৎ থেকে আলফা সেন্টরাইতে যাবেন, আলোর গতিতে গেলে লাগবে ৪.৩ বছর। আবার আপনি ভরযুক্ত হওয়ায় আপনার পক্ষে আলোর গতিতে ভ্রমণ সম্ভব নয়। কিন্তু ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে সংক্ষিপ্ত পথ তৈরি করে আপনি সহজেই আলফা সেন্টরাইতে প্রবেশ করতে পারবেন, আবার নিজের সৌরজগতেও ফিরে আসতে পারবেন। তার মানে আপনি ভবিষ্যতেও যেতে পারবেন আবার অতীতেও ফিরে আসতে পারবেন।
একটু আগে আমি বলেছিলাম কোন মহাকাশ্যানের সাহায্যে ব্ল্যাকহোলের চারপাশের ঘুরতে ঘুরতে টাইম ট্রাভেলিং করা সম্ভব। কিন্তু সেটা কেন ব্ল্যাকহোলের চারপাশেই ঘোরার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে? ব্ল্যাক হোলের ভেতরে প্রবেশ করা করা যাবে না কেন? এর সোজাসাপ্টা উত্তর, ব্ল্যাকহোলে ঢুকলে আপনি আর বের হতে পারবেন না। সেখানে মহাকর্ষ বল অত্যধিক যেটা বিজ্ঞানী স্টিফেম হকিং মানতে নারাজ। তিনি মনে করেন, ব্ল্যাকহোলে পতিত কোনো বস্তু একেবারেই হারিয়ে যায় না, এটি কণিকারূপে ব্ল্যাকহোল থেকে নির্গত হয়। হকিং-বিকিরণ তত্ত্বানুযায়ী এই কণিকা যে পথে নির্গত হয়, সে পথটিই হলো ওয়ার্মহোল। আর এই কণিকাগুলো ওয়ার্মহোল দিয়ে নির্গত হয়ে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে লক্ষকোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো জগতে পৌঁছে যাবে। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ে যে স্থান-কালে পৌঁছতে ওই বস্তুর কোটি কোটি বছর লাগত তাকে আমরা ওয়ার্মহোল ব্যবহারে খুব কম সময়ে এ দূরত্বটুকু অতিক্রম করিয়ে অন্য জগতে প্রবেশ করাতে পারবো। তবে হোয়াইট হোল ও ওয়ার্ম হোল এখনও বাস্তবে খুজে পাওয়া যায় নি। কিন্তু বিজ্ঞানী স্টিফন হকিং ও কিপ থর্নের মতে ওয়ার্মহোল বাস্তবে পাওয়া সম্ভব, আর এটা দিয়েই টাইম ট্রাভেল সবচেয়ে সম্ভাবনাময় হবে।
এবার চলুন দেখা যাক টাইম ট্রাভেলিং সম্পর্কে কোয়ান্টাম তত্ব কি বলে। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বানু্যায়ী যে বিশেষ ক্ষেত্রসমূহ দ্বারা টাইম ট্রাভেল সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে, তা কোয়ান্টাম তত্ত্ব দ্বারা স্বীকৃত নয়। তবে আশার আলো হচ্ছে যে, মহাকর্ষের সামগ্রিক কোয়ান্টাম তত্ত্ব আজো আমাদের অজানা, তাই সময় ভ্রমণের সম্ভাবনাহীনতার ব্যাখ্যা বা অনুমান, কোনটিই আপাতত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত নয়। পদার্থবিদ রোনাল্ড ম্যাল ও মনে করেন একটি বলয় লেসারের সাহায্যে ঘূর্ণায়মান ব্ল্যাকহোলের অনুরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে সময় ভ্রমণকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তবে অতীতে ভ্রমন নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো বিরাট সন্দেহ বিরাজ করছে। কিন্তু কেন এ সন্দিহান? এ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ৩য় পর্বে। ৩য় পর্বের আলোচনা দেখতে পারেন এখান থেকে। ধন্যবাদ।
