পর্ব-৫ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৫ ডিসেম্বর ১৯৭১)


৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমনে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। গোলা বর্ষন করে বিধ্বস্ত করে দেয়া হয় বিমান বন্দরগুলো। এছাড়া পাকিস্তানি বাহিনীর অধিকাংশ বিমানও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পাক বাহিনীর কনভয়ের ওপর জঙ্গি বিমান হামলায় ধ্বংস হয় ৯০টি গাড়ি । কয়েকটি লঞ্চ হানাদার সৈন্য বোঝাই অবস্থায়ই ধ্বংস হয়।

এদিন নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ড বঙ্গোপসাগরে  সফল আক্রমণ চালিয়ে ধ্বংস করে দেয় পাকিস্তানি সাবমেরিন 'গাজী'। এই বিশেষ সাবমেরিনটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ধার দিয়েছিল।  এদিন নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ডের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে অবস্থানরত সকল নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জাহাজগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয় বন্দর ত্যাগ করার জন্য । বন্দরগুলো এবং শত্রু জাহাজ গুলোতে প্রচন্ড আক্রমনের প্রস্তুতি নিতে থাকলো নৌবাহিনীর যৌথ কমান্ড। 


এদিকে স্থলভূমিতে এদিন বীরদর্পে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছিল মিত্রবাহিনী। যৌথ বাহিনী প্রধান সড়কগুলোতে অবরোধ সৃষ্টি করে। ফলে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম,কুমিল্লা এবং রংপুর আর যশোরের সাথে রাজশাহী ও নাটোরের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ভেঙে পরে পাক-বাহিনীর যোগাযোগ ব্যাবস্থা। আখাউড়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকবাহিনীর যুদ্ধ শুরু হলে ভারতের ৫৭ মাউন্টেন ডিভিশন আখাউড়ার দক্ষিণ এবং পশ্চিমাংশ দিয়ে পাকবাহিনীকে অবরোধ করে। ফলে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এদিনের আখাউড়ার যুদ্ধে সিপাহী আমীর হোসেন, সুবেদার আশরাফ আলী খান, সিপাহী রুহুল আমীন, লেফটেন্যান্ট বদিউজ্জামান, সিপাহী সাহাব উদ্দীন ও সিপাহী মুস্তাফিজুর রহমান শহীদ হন। নিহত হয় ১৬০ পাকসেনা । 

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাত্তরের ৫ ডিসেম্বর ছিল পূর্বের থেকেও বেশি উত্তপ্ত। এদিন নিরাপত্তা পরিষদে আবারও অধিবেশন বসে। এই অধিবেশনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এক প্রস্তাবে উত্থাপন করে যেখানে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানে একটি ‘রাজনৈতিক নিষ্পত্তি’ প্রয়োজন যার ফলে বর্তমান সংঘর্ষের অবসান ঘটবে এবং পাক বাহিনীর সহিংসতাও অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।এই প্রস্তাবে সমর্থন করে শুধু পোল্যান্ড। চীন বিপক্ষে ভোট দেয়। অন্যান্য সদস্য দেশগুলি ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। একই অধিবেশনে আটটি দেশের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ও সৈন্য প্রত্যাহারের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদে আরেকটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবটিতে দ্বিতীয়বারের মতো ভেটো দিয়ে ভেস্তে দেয়। সোভিয়েত সরকার বার্তা সংস্থা ‘তাস’ এ প্রদান করা এক বিবৃতিতে  ‘পূর্ব বাংলার জনগণের আইনসঙ্গত অধিকার ও স্বার্থের স্বীকৃতির ভিত্তিতে’ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান করার দাবি জানায়। 
জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি এদিন বলেন, কোনো শর্ত ছাড়াই ভারতকে পাকিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। চীনের প্রধানমন্ত্রী চউএন লাই পাকিস্তানকে সর্বাত্মক সহায়তা দেয়ার ঘোষনা দেন। এদিনও ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়ায় চিন্তিত হয়ে পড়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে।
এদিন মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানী জাতির উদ্দেশে বেতারে এক উদ্দীপনাময়ী ভাষণ দেন। অপরদিকে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ এর গভর্নর ডা. মালিক ভারতীয় আক্রমণ প্রতিহত করতে দেশবাসীর কাছে সাহায্যের আবেদন জানান। 

এদিন বকশীগঞ্জে যৌথবাহিনী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পচাগড়, বোদা, ফুলবাড়ী, পীরগঞ্জ, হাতীবান্ধা, বীরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জ শত্রু মুক্ত হয়। জীবননগর, দর্শনা ও কোটচাঁদপুরে প্রচন্ড যুদ্ধে পাক-বাহিনী পরাজিত হয় এবং মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। যশোর সেনানিবাসে মিত্র ও মুক্তি বাহিনীর দু’দিক থেকে আক্রমণে পালাতে বাধ্য হয় হানাদাররা। যশোরের বিভিন্ন স্থানে প্রচন্ড যু্দ্ধে পাক-বাহিনী পরাজয় বরণ করে। এসব যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর। এ যুদ্ধ গুলিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়া মুক্তিযোদ্ধারা জানান, জগন্নাথপুর আম বাগান এলাকায় একটি যুদ্ধে দুই বাহিনীর প্রচণ্ড গোলাগুলির এক পর্যায়ে উভয় পক্ষের রসদ শেষ হয়ে যায়। অতঃপর খালি হাতেই বীর মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েন পাক সেনাদের উপরে । ছিনিয়ে আনেন বিজয়।

এদিন থেকেই পৃথিবীর বুকে একটু একটু করে জেগে উঠতে শুরু করে নতুন একটি মানচিত্র।