পর্ব-৬ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৬ ডিসেম্বর ১৯৭১)
![]() |
মহান স্বাধীনতার মাস ডিসেম্বরের ৬ তারিখ দিনটি ছিল একাত্তর সালের সোমবার। স্বাধীনতাকামী জনতার জন্য এদিনটি ছিলো অত্যন্ত সুখের দিন। বিভিন্ন স্থানে পর্যুদস্ত হয়ে পিছু হটতে থাকে পাক হানাদার বাহিনী। বেশ কিছু জনপদ এদিন দখলমুক্ত হয়। ঢাকা বিমানবন্দর ভারতীয় বিমানবাহিনীর বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর বিমানগুলি তৃতীয় দেশের সাহায্যে বাংলাদেশ ত্যাগ করে।
এদিনের বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ভূটান ও ভারত কতৃক বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান। ভুটানের তৎকালীন রাজা মি. জিগমে ওয়ানচুক বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নেন এবং বাংলাদেশ সরকারকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তুমুল করতালির মধ্যে ভারতীয় পার্লামেন্টে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশাল বাধার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বীকৃতি দেয়ার পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয়।
১) বাংলাদেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম শুরু হওয়ার ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
২) প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের আশা-আকাংখা কে প্রতিফলিত করেছে।তাছাড়া এই সরকার জনগণের সমর্থনের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
৩) ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার কারণে ভারত ও বাংলাদেশের জনগণ একই শত্রুর আঘাতের শিকার হয়েছে এবং যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।
তৎকালীন দৈনিক আজাদ ও দৈনিক পাকিস্তানে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এদিন ইন্দিরা গান্ধী মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলামকে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশ সরকারকে বৈধ সরকার বলে ঘোষণা দেন।
বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার কারনে পাকিস্তান ভারতের সাথে সকল কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পাকিস্তানের নির্বাচন কমিশন পূর্ব পাকিস্তানে ৭ ডিসেম্বর থেকে অনুষ্ঠেয় উপ-নির্বাচন টি পাক-ভারত যুদ্ধের কারনে স্থগিত ঘোষণা করে। পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির (পিডিপি) প্রধান নূরুল আমিন বলেন, ভারত ‘অস্তিত্বহীন বাংলাদেশ’ নিয়ে পাকিস্তান ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে নেমেছে।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম জাতির উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দেন। তিনি ভারতের জওয়ানদেরকে অভিনন্দন জানান এবং বলেন, “ভারতের সৈন্যবাহিনীর জওয়ানরা আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে হানাদার শত্রুদের নির্মূল করার জন্য আজ যুদ্ধ করে চলেছে।”
এদিকে এদিন নিয়াজীর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে পাকবাহিনী বেসামাল হয়ে পড়ে। সামনে এগোনো অসম্ভব, আবার পিছু হটা তার থেকেও বেশি অসম্ভব। তাই জামালপুর, হিলি,ময়নামতি এবং চট্টগ্রামের পাকসেনারা তাদের অবস্থানেই রয়ে গেলো। কিন্তু যশোর এবং সিলেটের সৈন্যরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হল। যৌথবাহিনী চেষ্টা করছিল যেন পাকবাহিনী কোথাও একত্রিত না হতে পারে।
অপরদিকে আমেরিকা এদিন উত্তর ভিয়েতনামে যুদ্ধরত ও দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থানরত মার্কিন নৌবাহিনীর সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করার নির্দেশ দেয়। ৬ ডিসেম্বর ‘নিউজউইক’ পত্রিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিস্তারিত একটি নিবন্ধ প্রকাশ করে যেখানে বলা হয়, বৃহৎ শক্তিগুলো এই যুদ্ধ ঠেকাতে কোন তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ নিচ্ছেনা। উল্লেখ্য, ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানী বিমান বাহিনী ভারতের ওপর আক্রমণ করায় পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। এই হামলার ফলেই পাক-ভারত যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে বিভিন্ন শহর ও এলাকা দ্রুত দখল করে নিতে থাকে।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এদিন ঢাকাতে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমাদের বাহিনী বর্তমান পরিস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তান ধরে রাখতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। শত্রুকে নিজেদের পছন্দমত জায়গায় এনে আক্রমণ করাই আমাদের লক্ষ্য। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী এলাকা দখল করেছে এ দাবি শুধু ভিত্তিহীনই নয়, হাস্যকরও বটে। বরং শত্রুকে ঢুকতে দেয়া আমাদের যুদ্ধকৌশলেরই একটা অংশ।”
মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় মুক্ত করে সেদিন বীরগঞ্জ ও খানসামার পাকিস্তানী সৈন্যদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে চলছিল। মেজর জলিলের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা সাতক্ষীরা মুক্ত করে তখন অগ্রসর হচ্ছিলেন খুলনার দিকে। শেরপুরের পানিহাতা, বাওরামারী , নালিতাবাড়ী এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। কোম্পানী কমান্ডার মো. রহমতুল্লাহ ঝিনাইগাতীর আহম্মদনগরে পাকবাহিনীর ঘাঁটি আক্রমণ করলে খবর পেয়ে আগে ভাগেই হানাদার বাহিনী ঘাঁটি ছেড়ে পলায়ন করে। পশ্চিমে ৮নং সেক্টরে ৪ ও ৫ ডিসেম্বর টানা দুই দিন যৌথ বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণ প্রতিরোধ করলেও ৬ ডিসেম্বর জেনারেল আনসারীর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানী নবম ডিভিশন যশোর ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়। যৌথবাহিনী যশোর থেকে পায়ে হেঁটে এদিন ঝিনাইদহে পৌঁছায় এবং শহরটি শত্রুমুক্ত করে। লে. জেনারেল নিয়াজী পাকবাহিনীকে ঝিনাইদহ থেকে সরে এসে ঢাকা রক্ষা করার নির্দেশ দেন। কিন্তু ততক্ষণে ঢাকা-যশোর সড়ক মিত্রবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি । মিত্রবাহিনী দুটি দলে ভাগ হয়ে একটি দল খুলনার দিকে এবং অপরটি কুষ্টিয়ার দিকে অগ্রাভিযান অব্যাহত রাখে।
মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান রিচার্ড হেলমস এদিন এক সমীক্ষা প্রকাশ করেন যেখানে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী দশ দিনের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে সক্ষম হবে। পরাজয় ঠেকাতে পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকেরা যুদ্ধের মাঠে এবং কূটনৈতিক পর্যায়ে তখনও সর্বশক্তি দিয়ে লড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই তাদের ক্রমাগত পরাজয় হচ্ছিল। এদিন মস্কোতে সোভিয়েত সরকারের একজন মুখপাত্র বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতীয় উপমহাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে উদাসীন থাকতে পারে না। কারণ, এখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থ জড়িত রয়েছে।
পাকবাহিনীর কবল থেকে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পথে এদিনের যুদ্ধে আরো মুক্ত হয় চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, যশোরের চৌগাছা, মৌলবীবাজারের কুলাউড়া, সুনামগঞ্জ, লালমনিরহাটসহ বেশ কিছু অঞ্চল। যৌথ বাহিনীর হামলায় খুলনা, মংলা ও চট্টগ্রামের নৌবন্দর গুলিতে অবস্থানরত পাকবাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ৬ ডিসেম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পর্যুদস্ত হয়ে পাকবাহিনী ঢাকা অভিমুখে পালাতে থাকে। এভাবেই ধীরে ধীরে নতুন ভোরের আলো নিয়ে বাংলার পূর্ব দিগন্তে ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকে আমাদের চরম আকাংখিত ‘স্বাধীনতা’ নামক সূর্যটি।
