পর্ব-৩ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)
![]() |
৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। এই দিনে মুক্ত হয়েছিল বরগুনা, ঠাকুরগাঁও ও গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া। ভারতে পাকিস্তানী বাহিনীর হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিলো ত্রিমুখী যুদ্ধ। এদিন শুরু হওয়া যুদ্ধই ছিল স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত যুদ্ধ।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরে বরগুনার বুকাবুনিয়া সাব-সেক্টরে আবদুস সাত্তার খানের নেতৃত্বে মাত্র ২১ জন মুক্তিযোদ্ধা জীবন বাজি রেখে আক্রমণ করেন পাক বাহিনীর ওপর।ফলে পাকহানাদার ও তাদের দোসররা বাধ্য হয় পালিয়ে যেতে । বরগুনা ও কোটালীপাড়ায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হলে স্বাধীনতাকামী মানুষ আনন্দে ফেটে পড়ে।
কোটালীপাড়ার বীর হেমায়েত উদ্দিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশে পালিয়ে আসেন পাকিস্তান থেকে । তারপর গড়ে তোলেন বিখ্যাত হেমায়েত বাহিনী,তার সাথে যোগ দেয় সাড়ে ৩ হাজার মুক্তিযোদ্ধা। তিনি কোটালীপাড়ায় একটি একটি ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে তুলে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করেন । এদিন কোটালীপাড়ায় বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা এবং আহত হন ২৪ জন। মুক্তিবাহিনীর প্রচন্ড আক্রমণে পতন ঘটে কোটালীপাড়া থানা, মসজিদ ও গোডাউনে অবস্থান নেয়া পাকিস্তানী সেনাদের ।১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর বিকালবেলা ভারতে বিমান হামলা চালায় পাকিস্তান। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আদায় করা। মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবে দেখিয়ে জাতিসংঘের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আদায় করতে চেয়েছিলো পাকিস্তানি শাসকরা।যুদ্ধবিরতি ঘোষনা হলে পাকিস্তানি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করার সুযোগ পেয়ে যেত ।
৩রা ডিসেম্বর বিকালে কোলকাতার ব্রিগেড প্যারেড ময়দানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এক বিশাল জনসভায় ভাষন দিচ্ছিলেন। ঠিক এসময় ভারতের বিভিন্ন বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তান বিমান হামলা শুরু করে। ইন্দিরা গান্ধী অবিলম্বে দিল্লী প্রত্যাবর্তন করেন। বিকেল ৫ টায় রেডিও পাকিস্তানের এক বিশেষ সংবাদে বলা হয়, ‘ভারত পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তজুড়ে আক্রমণ শুরু করেছে। বিস্তারিত খবর এখনো আসছে।’ ৫টা ৯ মিনিটে পেশোয়ার বিমানবন্দর থেকে কাশ্মীরের শ্রীনগর ও অনন্তের উদ্দেশ্যে ১২টি যুদ্ধবিমান উড়ে যায়। ৮টি মিরেজ বিমান সারগোদা বিমানঘাঁটি থেকে অমৃতসর ও পাঠানকোর্টের দিকে উড়ে যায় ।বিশেষ দুটি যুদ্ধবিমান আগ্রায় আঘাত করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এই আক্রমণে অংশ নেয় মোট ৩২টি যুদ্ধবিমান । এঘটনার পর ভারতীয় বাহিনী রাত সাড়ে ১১টায় পাকিস্তানের ওপর পাল্টা হামলা চালায়।
ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভার সাথে জরুরি বৈঠক করে মধ্যরাত্রির কিছু পরে একটি বেতার বক্তৃতার মাধ্যমে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ‘এতোদিন ধরে বাংলাদেশে যে যুদ্ধ চলে আসছিল তা ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।’ ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তানের হামলা প্রতিহত করে।
১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বরে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের ঘোষণা দিলে ভারতীয় কমান্ডের অধীনে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নিরাপত্তার স্বার্থে পাকসেনারা আগেভাগেই বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের অবস্থান থেকে পিছু হটে।মুক্তিযোদ্ধারা সেসব স্থানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং এসব অঞ্চলকে ‘মুক্তাঞ্চল’ হিসাবে ঘোষণা করে।
এদিনের অপর একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাংলাদেশের পক্ষে বিবৃতি প্রদান। তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলা হলে তার বিরুদ্ধে তারা ভেটো দেয়ার সিদ্ধান্ত জানায়।
