পর্ব-২ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (২ ডিসেম্বর ১৯৭১)
![]() |
বাংলার দিগন্তে নতুন সূর্যোদয়ের ইতিহাস একাত্তরের প্রতিটা দিনই ছিল অত্যন্ত ঘটনা বহুল এবং গৌরবমণ্ডিত। ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক ২ ডিসেম্বর দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। এটি হচ্ছে সেই দিন যেদিন বাংলার বীর যোদ্ধারা বিজয় সুনিশ্চিত করার অভিযানের সূত্রপাত করেন।
এদিনে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা বহুগুনে বেড়ে যায়।মুক্তিযোদ্ধারা অসাধারণ শৌর্যের পরিচয় দিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ে।প্রচন্ড আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে হানাদার বাহিনী। এদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান পরাজয়ের ভয়ে ভীত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠান। সাধারন জনগনও রাজপথে নেমে আসেন এবং যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। তাই এদিন থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় আমাদের চূড়ান্ত বিজয়।
নরসিংদীর ঘোড়াশালে মুক্তিযোদ্ধারা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পাকিস্তানী বাহিনীকে এবং তুমুল হামলা চালিয়ে হত্যা করে ২৭ পাকসেনাকে। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে কিছু গোলাবারুদ।
এদিন আজমপুর রেল স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আসে। কিন্তু পাকবাহিনী নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে।পরবর্তীতে পাকসেনাদের পিছু হটিয়ে দিয়ে পুনরায় রেলস্টেশন দখল করে মুক্তিসেনারা।
চট্টগ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা ফটিকছড়ি,রাউজান এবং আনোয়ারার বেশিরভাগ স্থান দখল করে নেয়। এদিন পাক কমান্ডার মোছলেহ উদ্দিন একদল সৈন্য ও রাজাকার বাহিনী নিয়ে কাঁঠালী গ্রামে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনীর সেকশন কমান্ডার আবদুল ওয়াহেদ এক অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে ৩ হানাদার সৈন্য এবং ৭ রাজাকার কে হত্যা করেন। পাকবাহিনী লাশ নিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
নেত্রকোনার বিরিশিরির বিজয়পুরে পাক বাহিনীর ওপর আকস্মিক এক গেরিলা আক্রমন চালায় মুক্তিযোদ্ধারা। ফলে ৫ হানাদার সেনা নিহত হয় এবং রাইফেলসহ বন্দী হয় ২১ জন রাজাকার।
সীমান্ত-সংঘাত আরো তীব্র হয়ে ওঠে। সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধারা নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালিয়ে পাকবাহিনী কে পর্যুদস্ত করতে থাকে। পাকিস্তান অভিযোগ করে যে, ৭টি স্থানে ভারত যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলেছে এবং তাদের ওপর আঘাত হেনেছে।
তৎকালীন দৈনিক পূর্বদেশ ও পাকিস্তান পত্রিকায় প্রকাশ হওয়া খবর থেকে জানা যায় এ দিন একজন সরকারি মুখপাত্র জানান, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতিসংঘের মহাসচিব উথান্টের কাছে পূর্ব পাকিস্তানে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক মোতায়েনের প্রস্তাব করে যে পত্র দিয়েছে তা নিরাপত্তা পরিষদে বিবেচনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। একই দিন আমেরিকায় নিযুক্ত পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত আগাশাহী নিউইয়র্কে একটি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেন। তিনি বলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানী সৈন্য সরিয়ে নেয়ার ভারতীয় দাবিটি অদ্ভুত । এ ছাড়া এদিন জুলফিকার আলী ভুট্টো পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) একটি বৈঠক ডাকেন। এ বৈঠকে ভুট্টো সভাপতিত্ব করেন। বৈঠকে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানানো হয়।
দিনব্যাপি বেতারে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, চরমপত্র প্রচার হতে থাকে। ক্লান্ত যোদ্ধারা প্রস্তুতি নিতে থাকে চুড়ান্ত বিজয়ের।
