পর্ব-১৩ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (১৩ ডিসেম্বর ১৯৭১)


একাত্তরের ১৩ ডিসেম্বরে চারদিকে উড়তে থাকে বাঙালির বিজয় নিশান। বিজয় অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌছে গেছে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। এসময় পূর্ব ও উত্তর দিকে যৌথবাহিনী ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে অবস্থান করছিলো। চার দিক থেকে ঢাকাকে ঘিরে ফেলে যৌথবাহিনী, সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে হানাদাররা। 

পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য মরিয়া মার্কিন-চীনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও ব্যর্থ হয়ে যায় এদিন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তৃতীয়বারের মতো আমেরিকার যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো দেয় রাশিয়া। এক বক্তব্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম রজার্স এদিন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে শিগগিরই সামগ্রিক যুদ্ধ বেধে যেতে পারে। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধ চায় না, তবে যুদ্ধ বাধলে তারা তাতে জড়িয়েও পড়বে না। কিন্তু  একথা বলার পরও এদিনই ২৪ ঘণ্টা থেমে থাকার পর পুনরায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা শুরু করে। 


অন্যদিকে বাঙালি জাতিকে নেতৃত্ব ও মেধাশূন্য করতে পাকবাহিনী ঘৃণ্য ও বর্বর যে ষড়যন্ত্র করেছিল তা বাস্তবায়ন করতে থাকে। পূর্বেই প্রস্তুতকৃত তালিকা অনুযায়ী শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবীদের বেছে বেছে তাদের ওপর নিষ্ঠুর ও নির্মম ভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

যুদ্ধে জয় নিশ্চিত দেখে মিত্রবাহিনীর হাইকমান্ড যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে। তারা চাচ্ছিল জানমালের ক্ষতি কম করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য রাজী করাতে। তাদের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ঢাকা দখল করা । ঢাকার প্রায় ১৫ মাইলের মধ্যে পৌঁছে যৌথবাহিনী শক্তি বাড়াতে থাকে। পূর্বদিক থেকে ৫৭ নম্বর ডিভিশনের দুটো ব্রিগেড এগিয়ে আসে । উত্তরদিক থেকে জেনারেল নাগরার বাহিনী এবং টাঙ্গাইলে অবতরণ করা ছত্রীসেনারা আসে । ঢাকার পশ্চিমে ভারতীয় বাহিনীর ৪ নম্বর ডিভিশনও মধুমতি নদী পার হয়ে পৌঁছে যায় পদ্মার তীরে। মেজর জেনারেল নাগরা রাত নয়টায় টাঙ্গাইল আসেন। ওদিকে সন্ধ্যা থেকে টাঙ্গাইলে অবস্থান করছিলেন ব্রিগেডিয়ার ক্লের ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং । রাত সাড়ে নয়টার দিকে টাঙ্গাইলের ওয়াপদা রেস্ট হাউসে তারা সকলে মিলে আলোচনায় বসেন পরবর্তী যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে । এসময় মেজর জেনারেল নাগরা মুক্তিবাহিনীর উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। 


ভারতীয় বাহিনীর ৫৭ ডিভিশনের দুটি ব্রিগেড এদিন পূর্বদিক থেকে এগিয়ে আসে এবং উত্তরদিক থেকে স্বসৈন্যে জেনারেল নাগরা ও কাদের সিদ্দিকীর কমান্ডে মুক্তিযোদ্ধারা সন্ধ্যার দিকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত এসে পৌঁছায়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হালকা প্রতিরোধ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অন্যদিকে 'এস' ফোর্সের অধিনায়ক লে. কর্নেল শফিউল্লাহ ঢাকার উপকণ্ঠে ডেমরায় এসে পৌঁছায়। পালানোর কোন সুযোগ না থাকায় ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে। সৈয়দপুরে ৪৮ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধিনায়কসহ ১০৭ পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে এদিন। ৪র্থ বেঙ্গল রেজিমেন্ট চট্টগ্রামের দিকে এগোনোর সময় নাজিরহাটে পাকবাহিনীর ২৪তম ফ্রন্টিয়ার ফোর্সের তিন কোম্পানি এবং বেশকিছু ইপিসিএএফ সৈন্য তাদের বাধা দেয়। প্রচন্ড যুদ্ধের পর পালিয়ে যায় হানাদাররা। অন্যদিকে শীতলক্ষ্যার পূর্বপাড়ে মুরাপাড়ায় পৌঁছায় বাংলাদেশের নিয়মিত বাহিনীর সর্বপ্রথম ইউনিট বিশ ইবি। খুলনা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে পাক কমান্ডাররা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বিভিন্ন অঞ্চলে দলে দলে আত্মসমর্পণ শুরু করে পাকিস্তানি সৈন্যরা । এদিন শুধুমাত্র কুমিল্লার ময়নামতিতেই ১১১৪ জন পাকসেনা আত্মসমর্পণ করে। 


বিস্তীর্ন এলাকা হানাদারমুক্ত হওয়ায় নিজ নিজ বাড়িতে ফিরতে শুরু করেন বাড়িঘর ছেড়ে দূরদূরান্তে আশ্রয় নেয়া মানুষেরা। ভারতীয় বিমানবাহিনী পুনরায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে ঢাকায়। এ হামলায় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় কুর্মিটোলা বিমানবন্দর ও বঙ্গভবন (তৎকালীন গর্ভনর হাউজ) । এদিন আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ঢাকায় আটকে পড়া পাকবাহিনী । আজকের এই দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় সেনাপ্রধান আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি তার সহকর্মীদের নিয়ে আত্মসমর্পণের বিষয়ে আলোচনায় বসেন। নিকটে আসতে থাকে বাঙালীর মুক্তির ক্ষণ।