পর্ব-১১ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (১১ ডিসেম্বর ১৯৭১)
![]() |
একাত্তরের ১১ ডিসেম্বরে মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশে ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছিল স্বাধীনতার রক্তিম সূর্য। সকাল হতেই প্রচণ্ড লড়াই শুরু হয়ে যায় ঢাকা বিজয়ের লক্ষ্যে। বাংলার বীর মুক্তি সেনারা ট্যাঙ্কসহ আধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এগিয়ে আসছিল চারিদিক থেকে। চারিদিকে শোভা পাচ্ছিল লাল-সবুজের বিজয় নিশান।
মুক্তিবাহিনীর ক্র্যাক প্লাটুন সকাল ১০টায় তোপখানা রোডের মার্কিন তথ্যকেন্দ্রে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটায়। ঢাকার প্রতিটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে গেরিলা যোদ্ধারা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার থেকে কমান্ডো নামানোর ব্যার্থচেষ্টা চালায়।
এদিন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক বার্তায় লে. জেনারেল নিয়াজিকে জানান, "মার্কিন সপ্তম নৌবহর বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। চীনও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।"
এদিকে, পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর ড. মালেকের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলি ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বরে জাতিসংঘের কাছে একটি বার্তা পাঠান। তিনি জাতিসংঘের কাছে পূর্ব পাকিস্তান থেকে সামরিক ও বেসামরিক পাকিস্তানিদের পশ্চিম পাকিস্তানে সরিয়ে নেয়ার জন্য সাহায্যের আবেদন জানান। কিন্তু জাতিসঙ্ঘে পাকিস্তানের স্থায়ী দূত আগাশাহী আবার জাতিসঙ্ঘকে অনুরোধ জানান সে বার্তা প্রত্যাখ্যান করার জন্য। তখন একদিকে পূর্ব পাকিস্তানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া পাকিস্তানি সৈন্যরা পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, আর অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তখনো শেষ চেষ্টা করে যাচ্ছিল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
১১ তারিখ বিকাল ৩টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঢাকাতে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর সাহায্যে ঢাকা থেকে ব্রিটিশ ও অন্য বিদেশী নাগরিকদের বেরিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন মুক্তিযোদ্ধারা। বিমান অবতরণের সুযোগ করে দেয়ার জন্য ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ে মেরামত করা হয়। তাই বাংলাদেশ বিমানবাহিনী ও মিত্রবাহিনী এদিন বিমানবন্দরে বিমান হামলা বন্ধ রাখে। এ রাতেই ঢাকার চারপাশের নির্দিষ্ট এলাকায় মিত্রবাহিনী ছত্রীসেনা অবতরণ করায়।
স্বাধীন যশোর জেলার টাউন হল ময়দানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এই দিনে একটি জনসভায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর মধ্যে উল্লখযোগ্য কয়েকটি সিদ্ধান্ত হলো—
(১) বাংলাদেশ সরকার ওয়ার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। এ ট্রাইব্যুনাল নরহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও নারী নির্যাতনের অভিযোগে যুদ্ধবন্দীদের বিচার করবে।
(২) ২৫ মার্চের আগে যিনি জমি, দোকানের মালিক ছিলেন তাদের সবকিছু ফিরিয়ে দেয়া হবে।
(৩) সব নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে।
(৪) জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পিডিপি, নেজামী ইসলামী নিষিদ্ধ করা হবে।
এসময় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ লাখো শহীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এই শিশু রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার দায়িত্ব এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের।
তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এদিন ওয়াশিংটনে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভোরেন্ডসভকে হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন, "১২ ডিসেম্বর মধ্যাহ্নের আগে ভারতকে অবশ্যই যুদ্ধ বিরতি মেনে নিতে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় যুক্তরাষ্ট্র নিজেই প্রয়োজনীয় সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।"
একাত্তরের ১১ ডিসেম্বরে অপর উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে ভারতীয় নৌবাহিনীর বিমান ও যুদ্ধ জাহাজ পাকিস্তানের শক্ত ঘাটি চট্টগ্রাম বিমানবন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামো, জাহাজ, নৌযান ইত্যাদি সম্পূর্ণ নিস্ক্রিয় করে দেয়ার জন্য এদিন ব্যাপক তৎপরতা চালায়। অবিরত বোমা ও রকেট হামলায় বিধ্বস্ত হয়ে যায় পাকবাহিনীর সকল জাহাজ ও বিমান ঘাটি। প্রচন্ড আক্রমণে দিশেহারা হয়ে বহু পাকসেনা নদী পথে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে সকল পথে মুক্তিযোদ্ধারা বসিয়ে দিয়েছে সতর্ক পাহারা। ফলে সাধারণ বেশে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে অসংখ্য পাকসেনা।
পাকিস্তানি বাহিনী এদিন হিলি সীমান্তে প্রচণ্ড প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর সাথে চলতে থাকে তুমুল লড়াই। কিন্তু সন্ধ্যায় যৌথবাহিনী বগুড়া-রংপুর মহাসড়কের মধ্যবর্তী স্থানে গোবিন্দগঞ্জে পাকিস্তানি ঘাঁটির ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। রাতভর প্রচন্ড যুদ্ধের পর ভোরের দিকে হানাদাররা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। এছাড়া জামালপুর গ্যারিসনের সেনারাও যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। জামালপুরের পূর্ব দিকে হালুয়াঘাট এলাকায় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর পাকবাহিনীর আরেকটি ব্রিগেড অস্ত্র গোলাবারুদ ফেলেই পালাতে থাকে দিকে। এসময় শত্রুসৈন্যরা ধ্বংস করে দিয়ে যায় রাস্তার সকল বড় বড় সেতু । অপরদিকে ময়মনসিংহের ব্রিগেডটিও শহর ত্যাগ করে এবং টাঙ্গাইলে পৌছে প্রতিরক্ষামূলক ঘাঁটিতে আশ্রয় নেয়। রাতের বেলায় বিনা প্রতিরোধে জামালপুর মুক্তিবাহিনীর দখলে আসে। একাত্তরের ১১ ডিসেম্বরে আরও শত্রুমুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ, আশুগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া, গাইবান্ধা, চন্ডীপুর, দুর্গাদিঘি, বিলগ্রাম , ফুলছড়িহাট, বাহাদুরাবাদ ঘাট, পিসপাড়া, দিনাজপুরের হিলিসহ বিভিন্ন এলাকা।
