পর্ব-১০ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (১০ ডিসেম্বর ১৯৭১)


১০ ডিসেম্বর ১৯৭১। এদিন ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ শত্রুমুক্ত হয়। নরসিংদীর রায়পুরায় যৌথবাহিনীর ছত্রীসেনারা অবতরণ করে।এদিন যৌথবাহিনীর তৎপরতায় রংপুর, দিনাজপুর ও সৈয়দপুরের হানাদার বাহিনী একদল থেকে অন্যদল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এছাড়া ১০ ডিসেম্বরে স্বাধীন হয় নড়াইল, ময়মনসিংহ, মাদারীপুর এবং ভোলা জেলা।

পাক সেনারা নড়াইলে পৌছায় ১৯৭১ সালের ১৩ এপ্রিলে। এরপর শুরু করে পাইকারী হারে গণহত্যা । মুক্তিযোদ্ধারা নড়াইল জেলা অস্ত্রাগারের তালা ভেঙ্গে অস্ত্র সংগ্রহ করে এবং হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু করে । ধীরে ধীরে পাকবাহিনীকে সকল ঘাটি থেকে উৎখাত করতে থাকে মুক্তিযোদ্ধা রা। একাত্তরের এইদিনে মুক্তিযোদ্ধারা পাকসেনাদের সর্বশেষ অবস্থানস্থল তৎকালীন পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়ে গেরিলা আক্রমণ চালায়। এই হামলায় পরাজিত হয় পাকবাহিনী এবং স্বাধীন হয় নড়াইল জেলা।


মাদারীপুর পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে আগেই। ৮ ডিসেম্বরেই তারা পালাতে থাকে মাদারীপুর ছেড়ে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা বিস্ফোরক দিয়ে তাদের যাত্রাপথের ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়। ফলে আটকা পড়ে হানাদার সেনারা। অতঃপর ৩ দিন ধরে প্রচন্ড যুদ্ধের পর কোনঠাসা হয়ে পরে পাকবাহিনী।  মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় তারা। এই যুদ্ধে শহীদ হন মাদারীপুর জেলার সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ১৪ বছর বয়সী সারোয়ার হোসেন বাচ্চু। এদিন পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত যাওয়ার পূর্বেই শত্রুমুক্ত হয় মাদারীপুর জেলা।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ২৭ মার্চে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ময়মনসিংহের মুক্তিযোদ্ধারা। ২৭ মার্চে ইপিআর, পুলিশ এবং আনসার-মুজাহিদ বাহিনীর বাঙ্গালী সদস্যরা ময়মনসিংহের খাগডহর এলাকায় অবস্থিত ইপিআর ক্যাম্প দখল করে নেয়। মুক্তিবাহিনী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত ময়মনসিংহ অঞ্চল দখলে রাখতে সমর্থ হয়।কিন্তু তারপর নিয়ন্ত্রণ চলে যায় পাকসেনাদের হাতে। এরপর যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে চলতে থাকে খণ্ডযুদ্ধ। কিন্তু ডিসেম্বর মাস শুরু হতেই ৩ ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে । ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে চুড়ান্ত ভাবে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার দিকে পালিয়ে যায়।


১২ এপ্রিল ১৯৭১ এ ভোলাতে পা রাখার পর থেকেই ধ্বংসের সয়লাব বইয়ে দেয় হানাদার বাহিনী। তাদেরকে সার্বিক সহযোগিতা করে এদেশীয় দোসররা। দীর্ঘ ৮ মাস ব্যাপি ছোট বড় বিভিন্ন যুদ্ধের পর এদিন ভোলা জেলা সম্পূর্ণ রুপে শত্রুমুক্ত হয়। ফলে উল্লাসে মেতে ওঠে ভোলার সর্বস্তরের মানুষ, ওড়ানো হয় লাল-সবুজ নিশান।
কাত্তরের এদিনে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর ও  ঢাকা বেতারকেন্দ্রের ওপর বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে মিত্রবাহিনীর জঙ্গী বিমান। আতঙ্ক গেড়ে বসে শক্তিশালী সেনাবাহিনী বলে অহমিকায় ভুগতে থাকা পাকিস্তানি বাহিনীর অন্তরে। এটি এমনই এক সময় যখন ‘মুক্তি’ শব্দটি শুনলেই আতঙ্কিত হয়ে উঠতো যেকোন পাকসেনা। পরাজয়ের ভয়ে ভীত হয়ে লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি পালানোরও চেষ্টা করেন। কিন্তু বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে ফাঁস হয়ে যায় যায় এই কাপুরুষতা। ব্যার্থ হয় তার পালানোর প্রচেষ্টা। 


যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত দেখে পাকবাহিনী যে ঘৃন্য ষড়যন্ত্র শুরু করে তার কিছু কিছু এদিন থেকে বাস্তবায়ন করতে থাকে। পাক কুচক্রী মহল পরিকল্পনা করে এদেশের কৃতী সন্তানদের চিরতরে মুছে দেয়ার। ১০ ডিসেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকের তৎকালীন কার্যনির্বাহী সম্পাদক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে তার ঢাকার শান্তিনগরের চামেলীবাগের নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় রাজাকারেরা । না কখনো পাওয়া গেছে তার খোজ, আর না পাওয়া গেছে তার লাশ। তার মাধ্যমেই শুরু হয়ে যায় ইতিহাসের নৃশংসতম ঘৃণ্যতম ও পরিকল্পিত এক গণহত্যার নতুন অধ্যায়।