পর্ব-৪ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৪ ডিসেম্বর ১৯৭১)

পর্ব-৪ | বিজয়ের দিনপঞ্জী (৪ ডিসেম্বর ১৯৭১)

একাত্তরের ৪ ডিসেম্বর ভিন্ন মাত্রা পায় মুক্তিযুদ্ধ। বর্ষা, শরত আর হেমন্তকাল পেরিয়ে শীত নামে গ্রাম-বাংলাজুড়ে ।ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর আক্রমনে এদিন বিপর্যস্ত হয়ে পরে হানাদার বাহিনী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে থাকে মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের খবর। মুক্তিযোদ্ধারা এদিন মুক্ত করে গাইবান্ধার ফুলছড়ি, দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, জীবননগর, বকশীগঞ্জ, দামুড়হুদা,  লক্ষ্মীপুরসহ আরও কিছু অঞ্চল। বিজয়ের খবর বিদ্যুৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে বাংলার আকাশে, বাতাসে- সর্বত্র। এই বার্তায় বীর যোদ্ধারা হয়ে ওঠে আরো দুর্বার, অপ্রতিরোধ্য।

৪ ডিসেম্বর ভারতীয় স্থলবাহিনী চারটি অঞ্চল থেকে সম্মুখ অভিযান শুরু করে।  
(১) পূর্ব দিক থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের তিনটি ডিভিশনের সমন্বয়ে গঠিত ৪র্থ কোর সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা এবং নোয়াখালী অভিমুখে অভিযান চালায়।
(২) উত্তরাঞ্চলে দুই ডিভিশন সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত ৩৩তম কোর অভিযান চালায় রংপুর, দিনাজপুর ও বগুড়া অভিমুখে।
(৩) পশ্চিম অঞ্চল থেকে দুই ডিভিশন সৈন্যের সমন্বয়ে গঠিত ২য় কোর এগিয়ে আসে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুরের দিকে। এবং -
(৪) মেঘালয়ের তুরা থেকে এক ডিভিশনের কিছু কম সৈন্যের একটি বাহিনী প্রেরিত হয় জামালপুর ও ময়মনসিংহ অভিমুখে।


আন্তর্জাতিক রাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশের জন্য দিনটি ছিল উদ্বেগের। এদিন জাতিসংঘে বাংলাদেশকে ঘিরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনিয়র জর্জ বুশ পাকিস্তানের পক্ষে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির জন্য এক প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে যে, 'এই মূহুর্তে ভারত ও পাকিস্তান কে নিজ নিজ সীমান্তের ভেতর সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে হবে।' এর পূর্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পাক-ভারতের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে দেখানোর জন্য পাকিস্তান ৩ ডিসেম্বরে ভারতের কয়েকটি স্থানে বিমানহামলা চালায়। ফলে ৩ ডিসেম্বর রাতের বেলা ভারতও পাকিস্তানের উপর হামলা করে। যার কারনে ৪ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র এই প্রস্তাব উত্থাপনের সুযোগ পেয়ে যায়।

কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন এই প্রস্তাবে ভেটো প্রদান করে প্রস্তাবটি নিরাপত্তা পরিষদে ভেস্তে দেয়। এছাড়া পোল্যান্ড এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়। ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে ভোট দেয়া থেকে বিরত থাকে। এই প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট হেরে যায় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন করা সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।
এদিন এরকম নাজুক সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে লিখিত একটি পত্র প্রেরণ করে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের আহবান জানান।


৩নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা এদিন প্রচন্ড আক্রমণ চালিয়ে আখাউড়া রেলস্টেশন এবং শমশেরনগর বিমান বন্দর দখল করে নেন। ৮নং সেক্টরের অকুতোভয় যোদ্ধারা মেহেরপুর শত্রুমুক্ত করেন। এছাড়া ১১নং সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের উপর্যুপরি আক্রমণে কামালপুরে পাকবাহিনী পরাজিত হয়ে পালাতে বাধ্য হয়। যৌথবাহিনী প্রবল আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানিরা সীমান্তবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলো থেকে পিছু হটতে থাকে। পতন হতে থাকে একের পর এক পাকিস্তানি ঘাঁটির । অল্প কিছু জায়গাকে কেন্দ্র করে পাকবাহিনী সামরিক শক্তি জড় করে যৌথবাহিনীকে আটকানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু যৌথবাহিনী তাদেরকে অত্যন্ত সুকৌশলে এড়িয়ে যায় এবং দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে থাকে ঢাকা অভিমুখে।